সত্যকথন। মুসলিমা খাতুন
মায়ের দুধই শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার
মালিহার বয়স এক বছর। সুস্বাস্থ ও চটপটে মালিহা পরিবারের সবার কাছে অত্যন্ত আদরের। জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত হালকা ঠা-া, কাশি ছাড়া তেমন কোনো অসুখ-বিসুখ নেই। খাওয়া-দাওয়া নিয়েও বেশি ঝামেলা করতে হয় না মাকে। প্রথম ছয়মাস মালিহা শুধু মায়ের বুকের দুধই খেয়েছে। ছ’মাসের পর থেকে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার হিসাবে ঘরে তৈরি সুজি ও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি, ডিম, মাছ, মাংস ও ফলমূল দেয়া হচ্ছে। শিশু যাতে জন্মের পর পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ পায় এ জন্য পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাওয়া-দাবারের প্রতি খেয়াল রেখেছে। এছাড়া তারা গর্ভবতী মাকে উৎসাহিত করেছে আগত সন্তানকে সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে।
শিশু জন্মের পর মায়ের বুকে প্রথম যে দুধ আসে তাকে শাল দুধ বলে। শালদুধ শিশুর জন্য সর্বোত্তম টিকা বা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। তাই জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে প্রত্যেক মায়ের যে কোনো মূল্যে তার শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। শালদুধ পরিমাণে কম হলেও তা নবজাতকের জন্য যথেষ্ট। এন্টিবডিতে পূর্ণ শালদুধ প্রতিটি শিশুর সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্মগত অধিকার। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই যে মাতৃদুগ্ধ পায় তা তার জীবনীশক্তির জন্য অপরিহার্য। কেবল শিশু নয়, মায়ের জন্যও তা পরম আনন্দের ও গর্বের। মাতৃদুগ্ধ পানের মধ্য দিয়ে শিশু যে তৃপ্তি পায়, পৃথিবীর অন্য কোনো কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। শিশুর প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধই তার জন্য একমাত্র পূর্ণাঙ্গ খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। শিশু তার প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ মায়ের দুধ থেকে পায়। মায়ের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়। সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করতে জন্মের পর থেকেই শিশু যাতে শুধু মায়ের দুধ পান করতে পারে সে লক্ষ্যে সারাবিশ্বেই নানা উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, ময়ের দুধে প্রায় একশত ধরনের খাদ্য উপাদান রয়েছে যার প্রতিটি উপাদানই শিশুর জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। এসব উপাদান শিশুকে একদিকে বুদ্ধিদীপ্ত করে অন্যদিকে তার শরীরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য রোগ-জীবাণু প্রবেশ করতে বাধা দেয়। যেসব শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয় তাদের তুলনায় বুকের দুধ না খাওয়া শিশুর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ বেশি থাকে। আর কৌটার দুধ অথবা অন্যান্য তরল দুধ খাওয়ানো শিশুরা ডায়রিয়া, আমাশয়, রক্তস্বল্পতা, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, অন্ধত্বসহ মারাত্মক সব রোগে বেশি ভুগে থাকে।
শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দৈহিক গঠনে মায়ের দুধের অপরিহার্যতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণের মতে, যে কোনো বিকল্প দুধের চেয়ে মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ বহুলাংশে বেশি। পরিমিত প্রোটিন, ভিটামিন ও রোগ প্রতিরোধ উপাদানের সংমিশ্রণে বুকের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে আদর্শ খাবার। শিশুর সুস্থতা ও স্বাভাবিক বিকাশের লক্ষ্যে মাতৃদুগ্ধ পান করাতে মায়েদের উদ্বুদ্ধ করা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নে জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী কোম্পানি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে বাজারজাত শিশু খাদ্যকে উৎসাহিত করছে। ওইসব খাদ্য শিশুর ওজন, উচ্চতা ও মস্তিষ্ক গঠনে সহায়ক বলে প্রচার করা হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক মা শিশুদের মুখে বিকল্প খাবার তুলে দিচ্ছেন। এগুলোতে ব্যবহৃত উপাদান শিশু স্বাস্থ্যের উপযোগী নয়। কৌটার দুধে অতিরিক্ত লবণ শিশুর শরীরে চর্বি ও পানি জমতে সাহায্য করে। এসব খাবার খেয়ে শিশু স্বাস্থ্যবান হলেও তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সঠিক হয় না।
বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্য বিক্রয় ও বিপনন নিয়ে সুষ্পষ্ট আইন থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন খুব একটা হয় না। রাজধানী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পাওয়া যায় মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্য, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্রান্ডের গুঁড়া দুধ বা ফর্মুলা ফুড হিসেবে পরিচিত খাবার। শিশু বিশেষজ্ঞগণ এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হওয়ার জন্য মায়েদের পরামর্শ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে এখনই সচেতন হতে হবে কারণ মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই।
বর্তমান সরকার গত কয়েক বছর মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বেতনসহ ছয় মাসে উন্নীত করেছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে কর্মজীবী মায়েদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। মাতৃদুগ্ধ পান ও ঘরের তৈরি পরিপূরক খাবার কার্যক্রমকে জোরদার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দেরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও এর ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপনন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, হাসপাতাল, শপিংমল ও বিমানবন্দরের মতো জনাকীর্ণ স্থানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে।
এ সকল পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। নবজাত শিশুর মৃত্যু হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষকদের মতে, জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ালে নবজাতক শিশুর মৃত্যুহার ৩১ শতাংশ পর্যন্ত রোধ করা সম্ভব। ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে একটানা শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে একদিকে যেমন শিশু সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকে, অন্যদিকে পরিবারে অনেক অর্থ সাশ্রয় হয়। শুধু মায়ের দুধেই শিশুর বুদ্ধি বিকাশের একমাত্র জীবন্ত উপাদান আছে, যা অন্য কোনো গুঁড়া দুধে নেই।
শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করালে মা ও শিশু উভয়েই উপকৃত হয়। জন্মের পরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের শরীর থেকে অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়। যা জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের স্তন ক্যান্সারের আশঙ্কা ২৫ শতাংশ কমে আর জরায়ু ক্যান্সারের আশঙ্কা ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে যায়।
আমাদের শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার স্বার্থে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সকল শিশুকে ছয়মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো দরকার। পাশাপাশি বাড়িতে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানো এবং গুঁড়াদুধ ও কৌটাজাত শিশুখাদ্যের ব্যবহারকে কমিয়ে আনতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমে গুড়া দুধের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা তৈরিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মায়ের দুধই শ্রেষ্ঠ- এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সকলের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
লেখক : কলামিস্ট


