২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

‘যুদ্ধশিশু’ । ড. শিল্পী ভদ্র

‘যুদ্ধশিশু’ । ড. শিল্পী ভদ্র

বীরাঙ্গনা মায়েরা যেমন হারিয়ে গেছে আমাদের সমাজের অতল অন্ধকারে, যুদ্ধশিশুরাও তেমনি হারিয়ে গেছে এই বিশাল পৃথিবীর সুবিশাল ব্যাপ্তিতে। কেউ মনে রাখেনি তাদের কথা-ফরিদ আহমেদ (মুক্তমনার মডারেটর)। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরাঙ্গনা নারীদের গর্ভে যেসব শিশুসন্তান জন্মেছে, তাদেরই নাম ‘যুদ্ধশিশু’। মুক্তিযুদ্ধে প্রায় তিনলক্ষ মতান্তরে চার বা সাড়ে চার লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হন বর্বর পাকহানাদার, তাদের দোসর আলবদর-আলশামস-রাজাকারদের দ্বারা। এই যুদ্ধশিশুরা অক্টোবর ১৯৭১ থেকে সেপ্টেম্বর ১৯৭২-এর মাঝের সময়ে জন্মগ্রহণ করে। তাদের মায়েরা সমাজ পরিবারের ভয়ে ও লজ্জায় অনন্যেপায় হয়ে জন্মের পরই অনেকেই শিশুদের পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন। অনেকে শিশুকে জন্ম দিয়েই আত্মগোপন করেন, কেউ আত্মহত্যা করেন; কেউবা আবার অসুস্থ হয়ে ধুঁকে-ধুঁকে মারা যান। পরিচয়হীন এই যুদ্ধশিশুদের অধিকাংশেরই স্থান হয় কোনো মাতৃসদনে, রাজধানীর মাদার তেরেসা আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা কোনো অনাথ আশ্রম ও সেবাকেন্দ্রে।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এনবিসি টেলিভিশনের ধর্ষিতা নারীদের উপর করা একটি ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, পাকিস্তান আর্মি পরিকল্পিতভাবেই বাঙালি নারী এবং মেয়েদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে; তার প্রমাণও পাওয়া যায় ২০০২ সালের মার্চ মাসের বাইশ তারিখে ‘ডন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি আর্টিকেল থেকে। যেখানে কোট করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে সরাসরি বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পাকিস্তান আর্মিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যশোরে ছোট্ট একদল সাংবাদিকের সাথে কথা বলার সময়, তিনি এয়ারপোর্টের কাছে জড়ো হওয়া একদল বাঙালির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন, ‘আগে এদেরকে মুসলমান বানাও’। এই উক্তির তাৎপর্য সীমাহীন। কারণ, উচ্চপর্যায়ের সামরিক অফিসারদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, বাঙালিরা খাঁটি মুসলমান নয়। এই ধারণার সাথে আরো দুটো স্টেরিওটাইপ ধারণাও যুক্ত ছিল- বাঙালিরা দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি নয় এবং তারা হিন্দু ভারতের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ।

ইয়াহিয়া খানের এই উক্তিতে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তান আর্মি, বাঙালি মেয়েদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে সাচ্চা মুসলমান বাচ্চা পয়দা করাতে মেতে ওঠে। পাকিস্তানি সৈন্য এবং তার এদেশীয় দোসররা শুধু যত্রতত্র ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, জোর করে মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে গিয়েছে ক্যাম্পে। দিনের পর দিন আটকে রেখে হররোজ ধর্ষণ করেছে। যাতে পালাতে না পারে, এ জন্য শাড়ী খুলে নগ্ন করে রাখা হতো তাদেরকে। সিলিং-এ ঝুলে আত্মহত্যা রোধে তাদের চুল কেটে দেয়া হতো। ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা এক তরুণীর কি করুণ দশা হয়েছিল, তা ভিডিওতে দেখানো হয়েছে। পাকিস্তান আর্মির দোসর রাজাকার এবং আলবদরেরা জনগণকে বিশেষ করে, হিন্দু সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে দেশছাড়া করে, তাদের সম্পত্তি এবং জমিজমা দখলের জন্য ধর্ষণকে বেছে নিয়েছিল তারা।

পাকিস্তান আর্মির উচ্চপদস্থ অফিসাররা ব্যাপকহারে ধর্ষণের ব্যাপারে জানতেন এবং তাদের প্রচ্ছন্ন সম্মতির ব্যাপারে জানা যায় নিয়াজীর এক মন্তব্য থেকে। নিয়াজী একাত্তরে সংগঠিত ধর্ষণের ঘটনা স্বীকার করার সাথে সাথে একটি অসংলগ্ন উক্তি করেছিলেন-‘এমন আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মৃত্যুবরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর শারীরবৃত্তীয় চাহিদা নিবৃত্ত করতে যাবে ঝিলামে!’

কতজন যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। গুণী, মেধাবী এবং প-িত ব্যক্তি ড. বীণা ডি’কস্টা তার ‘Bangladesh’s erase past’ প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী একাত্তরে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল দুই লক্ষ নারীকে। একটি ইটালিয়ান মেডিক্যাল সার্ভেতে ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা বলা হয়েছে চল্লিশ হাজার। লন্ডন ভিত্তিক International Planned Parenthood Federation (IPPF) এই সংখ্যাকে বলেছে দুই লাখ। অন্যদিকে যুদ্ধশিশুদের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সমাজকর্মী ড. জিওফ্রে ডেভিসের মতে, এই সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। সুজান ব্রাউনমিলার ধর্ষিতার সংখ্যা চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন। কোনোকোনো সূত্রমতে সংখ্যাটা প্রায় সাড়ে চার লক্ষের কাছাকাছি হতে পারে।

সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ তার ‘সেইসব বীরাঙ্গনা ও তাদের না-পাক শরীর’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন : ‘১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার কাজের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৎকালীন দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার মতে, সরকার উদ্যোগ নেওয়ার আগেই ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার নারীর ভ্রুণ স্থানীয় দাই, ক্লিনিকসহ যার যার পরিবার যেভাবে পেরেছে, সেভাবে ‘নষ্ট’ করেছে।’

ড. এম এ হাসানের প্রবন্ধ ‘The Rape of 1971: The Dark Phase of History’-তে বলেন, সারাদেশের গর্ভপাত কেন্দ্র এবং হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দশ শতাংশের চেয়েও কমসংখ্যক ধর্ষিতা সেগুলোতে ভর্তি হয়েছিলেন। বেশিরভাগেরই ঘরেই গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে এবং সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তা গোপন রাখা হয়েছে। এছাড়া, যে সমস্ত নারীরা সেপ্টেম্বরের পরে গর্ভবতী হয়েছেন বা যাদের গর্ভাবস্থা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল তারা কেউই গর্ভপাত কেন্দ্র বা হাসপাতালে যাননি।

বিখ্যাত ফেমিনিস্ট লেখক Susan Brownmiller-র Against Our Will: Men, Women and Rape বইতে আছে- During the nine-month terror, terminated by two-week armed intervention of India, a possible three million persons lost their lives, ten million fled across the border to India, and 200,000, 300,000 or possibly 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. (মিলার, ১৯৯৩: ৮০)

বইটিতে উল্লেখ আছে : Accurate statistics on the number of raped women who found themselves with child were difficult to determine but 25,000 is the generally accepted figure. (মিলার, ১৯৯৩: ৮৪)

সুসান ব্রাউনমিলারের লেখাটা পাকিদের ভয়াবহ বর্বরতার প্রামাণ্য দলিল : Khadiga was regularly abused by two men a day; others, she said, had to serve seven to ten men daily. (Some accounts have mentioned, as many as eighty assaults in a single night, a bodily abuse that is beyond my ability to fully comprehend, even as I write these words).(মিলার, ১৯৯৩: ৮৩)

তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্পের অধীনে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে সংগৃহীত ও প্রকাশিত হয় আট খ-ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দলিলপত্র। এটিই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র আনুষ্ঠানিক তথ্যকোষ, যাতে এই নারীদের বিবৃতি আছে। মোট ২২৭ জনের মৌখিক জবানবন্দির মধ্যে ২৩ জন নারী। তাঁদের মাত্র ১১ জন তাদের যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। এসব দলিলে একাত্তরে মেয়েদের ওপর ধর্ষণের নৃশংসতার কিছুটা আভাস আছে, কিন্তু তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না।

সুসান ব্রাউনমিলারের অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন, উইমেন অ্যান্ড রেপ, সিরাজুল ইসলাম ও মিয়া শাজাহান সম্পাদিত বাংলাপিডিয়া : বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ ও অন্যান্য দলিলপত্রের ভিত্তিতে ধর্ষিত নারীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে আড়াই লাখ, গর্ভপাতের সংখ্যা ২৩ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং যুদ্ধশিশুর সংখ্যা ৪০০ থেকে ১০ হাজার। এ সংশ্লিষ্ট সংখ্যা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে আসতে না পারায় বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়।

ধর্ষিতা মহিলাদের গর্ভপাতের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকায় পৌঁছান ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং অষ্ট্রেলিয়ান ডাক্তাররা। তখন ‘সেবাসদন নামে’ বেশ কিছু গর্ভপাত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা বাংলাদেশি ডাক্তারদের সহযোগিতায় গর্ভপাত করান। সেই সময়কার সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ যেমন বিচারপতি কে এম সোবহান, মিশনারিজ অব চ্যারিটির সুপারভাইজার মার্গারেট মেরি, ড. জিওফ্রে ডেভিসের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ঢাকার বিভিন্ন ক্লিনিকে দুই হাজার তিনশ’ গর্ভপাত করানো হয়েছিল। দেশব্যাপী বাইশটি সেবাসদনে প্রতিদিন তিনশ’ থেকে চারশ’ শিশু জন্ম নিতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ধর্ষিতা নারীদেরকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তাদেরকে নিজের মেয়ে হিসেবে উল্লেখ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত অনুরোধে জেনেভা ভিত্তিক International Social Service (ISS/AB) এর ইউএস ব্রাঞ্চ সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সরকারকে, যুদ্ধশিশুদের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। সরকারি দু’টি সংগঠন Central-Organization for Women Ges Rehabilitation and Family Planning Association  কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে থাকে ISS এর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের পুরো পর্যায় জুড়ে।

তছাড়া, বিদেশি নাগরিকদের সহজে যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে পারার জন্য ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রজ্ঞাপিত হয় The Bangladesh Abandoned Children (Special Provisions) Order। বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেওয়ার ব্যাপারে সর্বপ্রথম আগ্রহ দেখায় ‘ক্যানাডা’। মাদার তেরেসা এবং তার সহকর্মীদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের শ্রম এবং সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় দু’টো ক্যানাডিয়ান সংগঠন দত্তক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এর মধ্যে একটি ছিল মন্ট্রিয়ল ভিত্তিক অলাভজনক আন্তঃদেশীয় দত্তক প্রতিষ্ঠান Families for Children এবং অন্যটি ছিল একদল উৎসাহী ক্যানাডিয়ানের গড়া টরন্টোভিত্তিক অলাভজনক দত্তক প্রতিষ্ঠান Kuan-Yin Foundation। কানাডা ছাড়াও যেসব দেশ যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে এগিয়ে এসেছিল তারা হচ্ছে – যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, সুইডেন এবং অষ্ট্রেলিয়া। এছাড়া, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাও এগিয়ে এসেছিল সেই সময়। যুদ্ধশিশুদের প্রথম ব্যাচ ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ক্যানাডায় পৌঁছলে তা মিডিয়ার ব্যাপক মনযোগ আকর্ষণ করে।

এভাবেই আমাদের সন্তানেরা মাতৃদুগ্ধ পান করার বয়সে মাতৃকোল ছেড়ে চলে যেতে থাকে অজানা দেশে, অচেনা মানুষজনের কাছে। সেসময় সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, যুদ্ধবিদ্ধস্ত নাজুক অর্থনীতির দেশটিতে, এই চরম অমানবিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত, সবল কোনো মানবিক শক্তি তখন আমাদের ছিল না।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com