৮ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

রমজানের হেকমত ও দর্শন

আব্দুল্লাহ মাসরূর আকুনী : একটুখানি নজর ফেলি চৌদ্দশত বছর পূর্বের পৃথিবীর প্রতি। মানবতা যেন এক মরদেহ। সারশূন্য ক্ষয়িষ্ণু কংকাল। স্পন্দনহীন নিষ্প্রাণ শবযাত্রী। বনী আদমের এ রুক্ষ জনপদে সুহৃদ মানুষ দৃষ্টিগোচর হতো না। সহমর্মী যে কয়জন লোক ছিল তাঁরাও আত্মগোপন করেছে গহীন অরণ্যে। অথবা নিশুতি রাতে নিঃসঙ্গ বাস করছে গিরি গুহায়, পর্বত চূড়ায়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভ আবির্ভাবে সহসাই মানবতার হিমশীতল দেহে উষ্ণখুনের এক তরঙ্গ বয়ে গেল। তিনি বিশ্ববাসীকে সুকোমল প্রেম-প্রণয় ও মানবিকতার পয়গাম শুনিয়েছেন যা তাদেরকে আন্দোলিত ও আলোড়িত করেছে। তাঁর সুনির্মল আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে, যারা ছিল রাহযান তারা হয়ে গেলো রাহবার, যারা ছিল যাযাবর তারা পেয়ে গেল আদর্শের ঘর। সবকিছুর নেপত্যে মূল নিয়ামক শক্তি হল তাকওয়া ও তাযকিয়া। রমজানের মর্ম দর্শন ও তত্ত্বকথা হলো ‘লা’ল্লাকুম তাত্ত্বাকুন’।

রহমতসিক্ত নির্মলসলিলা মাস রমজান। দীর্ঘদিনের খরাগ্রস্ত পৃথিবীতে প্রবল বর্ষণের কারণে মরা নদী যে ভাবে নাব্যতা ফিরে পায় ঠিক তেমনি রোযা মানুষের জীবনে প্রভূত কল্যাণের রেণু সৃষ্টি করে। আমলের খরস্রোতা নদীতে রহমতের জোয়ার বয়ে যায়। রহমতের বারি বিন্দু সিন্ধুতে বদলে দেয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ হচ্ছে রমজান মাস। রহমত স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রজনীতে সখিত্ব করার জন্য জান্নাতের অপ্সরিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।

বরকত মাগফিরাত, সাম্য-মৈত্রী ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাজসিক আয়োজন চলছে এ মাসের প্রতিটি প্রহরে প্রহরে। যে দিকে তাকাই সে দিকেই দেখি চোঁখের অন্তসীমা পর্যন্ত খায়ের বরকতের জোনাকি জ্বলে। রমজানের মন মাতালকরা রহমতের সুরভিতে নেশা হয়ে আজ এ বসুমতি নামক বনের গা অতি মাত্রায় সুরভিত ও সুপ্রসন্ন।

এ মাসের প্রথম রজনীতে ‘মুছীরা’ নামক মৃদু বাতাস বয়ে যায়। যার আবহে জান্নাতি সখা সখি পুলকিত হয়। হৃদয়গ্রাহী মিউজিক শুনে শুনে প্রেম মদিরা পানে মক্ত থাকে আনত নয়না আয়ত লোচনা হুর গিলমানরা। রহমতের তরঙ্গে কল্লোলিত মানব মানবী রহমতের সরোবরে অবগাহন করে চলছে অনন্ত পানে।
সৃষ্টি জগতের মধ্যে মানুষ আল্লাহর রহস্যময় ও বিচিত্র সৃষ্টি। দুটি বিপরীতমুখী স্বভাব চরিত্র নিয়ে মানুষ পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘ও হাদাইনা হোননাজদাইন” আর আমি তাকে দুটি পথ।’ (ভালো ও মন্দ) দেখিয়েছি। (সূরা বালাদ ১০)

একদিকে সে পাশবিকতার কঠিন ক্লেদে আবদ্ধ, অপর দিকে সে ‘ছিবাগাতুল্লাহ’ আল্লাহর গুণাবলীর অনন্য প্রতিবিম্ব। দেহ ও আত্মার সমন্বিত সত্তাকে মানুষ বলে। দেহের সম্পর্ক মরজগতের সাথে পক্ষান্তরে আত্মার সম্পর্ক ‘রূহ’ বা উর্ধ্বলোকের সাথে। দেহ জাগতিক খাবার গ্রহণ করে পুষ্টি ও সমৃদ্ধি লাভ করে তবে ‘রূহ’ জৈবিক চাহিদার বন্ধনমুক্ত হয়ে আত্মিক খোরাক সংগ্রহের জন্য ব্যাকুল ও উন্মুখ হয়ে থাকে।

মানুষের উপর যখন রিপু বা কুপ্রবৃত্তির প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সে ভোগ-সম্ভোগে ডুবে যায়। নৈতিক মূল্যবোধ পাশবিকতার সর্বনাশা স্রোতে তৃণখণ্ডের ন্যায় ভেসে যায়। অবাধ উচ্ছৃংখলতা, লাগামহীন পাপ-পঙ্কিলতার নেশায় উন্মাতাল হাতির ন্যায় ছুটে চলে। মনুষ্যত্বের ও সুকুমার বৃত্তির নির্মম অপমৃত্যু ঘটে। সোনার মানুষ তখন পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর যারা অবিশ্বাসী (কাফের) তারা ভোগ- সম্ভোগে নিমগ্ন থাকে, এবং জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় উদর পূর্তি করে, তাদের নিবাস জাহান্নামে।’ ( সূরা মুহাম্মদ : ১২)

আরও ইরশাদ হচ্ছে, আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি ; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তদ্দারা তারা উপলদ্ধি করতে পারেনা, তাদের চক্ষু আছে তদ্দারা দেখেনা এবং তাদের কর্ণ আছে তদ্দারা শ্রবণ করেনা; এরা পশুর ন্যায়, বরং ওরা অধিক পথভ্রষ্ট। ওরা গাফিল। (আ’রাফ/১৭৯)

রোযা মানুষকে পাশবিক পঙ্কিলতা ও গুনাহের আবিলতা থেকে মুক্ত করে। রিপুর তাড়না ও কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে রোযা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সে লাভ করে চিত্তের পরিশুদ্ধতা, আধ্যাত্মিক সজীবতা ও আত্মিক দৃঢ়তা। সায়িম ব্যক্তির দেহ মন ও আত্মার মধ্যে সৃষ্টি হয় কল্যাণকর্মের স্পৃহা ও আল্লাহ্ কে পাওয়ার উপচেপড়া উদ্দীপনা। সর্বোপরি সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ ‘সিবগাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর গুণাবলীর প্রতিবিম্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং প্রেমময় আল্লাহর সাথে গড়ে তুলতে পারে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক।

ইমাম গাযালী রহ. বলেন, মানুষকে আখলাকে ইলাহী বা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করাই হল সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য। ফেরেশতাগণ যেমন জৈবিক চাহিদা থেকে মুক্ত থেকে আল্লাহর কাছে সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকেন তেমনি সায়িম সিয়াম পালনের মাধ্যমে প্রেমময় রাব্বুল আলামীনের নিকট মহীয়ান মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। এমনকি কখনও কখনও তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদা ফেরেশতাদের উর্ধ্বে হয়ে থাকে।

বিদগ্ধ গবেষক আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম রহ. বলেন, সিয়ামের লক্ষ্য হল মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে নিস্কৃতি দেওয়া, যৌবনের মৌবনকে স্বাভাবিক ও সুনিয়ন্ত্রিত করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ পৌঁছে যায় পারলৌকিক সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে। ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে তার জৈবিক চাহিদা ও পাশবিক প্রবৃত্তিসমূহ দুর্বল হয়ে যায়, তার মনুষ্যত্ব সজীব ও সতেজ হয়ে ওঠে। তখন ক্ষুধাকাতর অভুক্ত মানুষের অনাহারক্লিষ্ট মুখ তার হৃদয়ে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত করে। বস্ত্তত সিয়াম এমন এক দুর্ভেদ্য ঢাল যা রোযাদারকে তাগুতের সকল আক্রমণ থেকে সুরক্ষা করে। রোযা ‘মানুষের আত্মিক সংশোধন ও উৎকর্ষতার বিকাস ঘটিয়ে বান্দাকে আল্লাহমুখী করে, তার অন্তরে সৃষ্টি করে আত্মিক স্হিরতা ও অনাবিল প্রশান্তি।

কুরআন চমৎকার প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাবে রোযার তাৎপর্য ও সিয়াম সাধনার বিধান উল্লেখ করেছে ‘হে ঈমানদারগণ ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা আল্লাহভীরু (মুত্তাকী) হতে পার, নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য, আর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূর্ণ করবে। আর যাদের জন্য তা পালনকরা দুঃসাধ্য (অতি কষ্টদায়ক, অতিবার্ধক্য বা চিররোগ ইত্যাদি) তাদের কর্তব্য হল ‘ফিদয়া’ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য প্রদান করা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যদি কেউ সৎকাজ করে তবে তা তার জন্য অধিক কল্যাণকর। যদি তোমরা উপলদ্ধি করতে তাহলে বুঝতে সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ।

রমযান মাস, তাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। আর কেউ অসুস্থ থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করতে হবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তা চান না। এই জন্য যে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে এবং তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করবে যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। (সূরা আল – বাকারা /১৮৩-১৮৫)

সিয়ামের বিধান সম্বলিত আলোচ্য আয়াতগুলো, অতীব হৃদয়গ্রাহী ও হৃদয় ছোঁয়া। আয়াতসমূহে আমাদের ঈমান-বিশ্বাস, বিবেক-বুদ্ধি এবং হৃদয়-মন, অনুভব অনুভূতি জাগ্রত ও প্রাণবন্ত করার ব্যাপক চেষ্টা করা হয়েছে। যেন মানুষ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ভক্তি গদ গদ চিত্তে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান পালনে ব্যাকুল ও উন্মুখ হয়। আল্লাহ্ তাদের প্রথমে এ ভাবে সম্বোধন করেছেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ’ প্রেমময়ের প্রেমময়ী এ আহ্বানের মাধ্যমে অতি সূক্ষ্মভাবে ঈমানদারদেরকে আল্লাহ্ কর্তৃক আরোপিত সকল বিধিমালা অম্লানবদনে মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রিয়ার হুকুম তামিল করার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রকৃত প্রেমিক মনের স্বাদ ও প্রশান্তি। প্রিয়তম রাব্বুল আলামীনের বিধান কঠিন ও কষ্টসাধ্য হলেও সানন্দে তা পালন করা অকৃত্রিম ভালোবাসার পরিচয়। মুমিন বান্দার হৃদয় মেখলার কোমল মাটিতে অংকুরিত, পল্লবিত ভালোবাসা ও ঈমানের দাবী এটাই। অজ্ঞাত অপরিচিত, না জানা, না দেখা বিধান পালন করা কঠিন হয়ে থাকে।

পক্ষান্তরে তা যদি আবহমান কাল থেকে চলে আসা আমল বা বিধান হয় তবে তা দ্বিধাহীন চিত্তে পালন করা যায়। রোযা ভুঁইফোড়ে, কল্পিত ভিত্তিহীন কোন বিধান নয়। বিগত সকল জাতি ও ধর্মানুসারীদের উপরও এ বিধান আরোপ করা হয়েছিল। সিয়াম সাধনার প্রতি বান্দাকে উদ্ধোদ্ধ, উদ্যমি ও দৃঢ়পদ রাখার জন্য ইরশাদ করেছেন, ‘সিয়ামের এ বিধান নতুন ও অভিনব কোন বিধান নয় । এ ভাবেই আল্লাহ্ মানব মানষে সহজসাধ্য রূপে তুলে ধরেছেন। আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘মাহে রমযানকে এত দীর্ঘ ভাবার কি কারণ আছে? গোটা বছর ধরে রোযা পালন করা লাগবেনা। হাতে গোনা কয়েকটি দিনই তো ‘আইয়ামান মা’দুদাত’। (বাকারা/১৮৪)

তা দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যায়। প্রেম-প্রণয়ের উত্তাল তরঙ্গ সাগর তীরে পৌঁছার পূর্বেই প্রেম অভিসার শেষ হয়ে গেল। গোটা বছরের সুখ-সম্ভোগ, ভোগবিলাসের মোকাবিলায় এই একটি মাত্র মাসের সংযম ও কৃচ্ছ্র কি খুব বেশি কিছু ? যা কেবল দিনের আলোতেই সীমাবদ্ধ রাতে সব কিছুই স্বাভাবিক বৈধ। অসুস্থ, মুসাফির ও সিয়াম পালনে একেবারে অক্ষম অতিবৃদ্ধকে পর্যায়ক্রমে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। এবার আরোপিত সিয়াম বিধান কষ্টসাধ্য হলেও সে তা প্রফুল্ল মনে পালন করে, সে তা পালন করতে মানসিক স্বস্তি ও শক্তি সঞ্চয় করে, তার মধ্যে মনোবল ও উদ্যমতা সৃষ্টি হয়। রোযাদার ব্যক্তি প্রচণ্ড ক্ষুধা ও বুকফাটা তৃষ্ণা সত্ত্বেও সে শীতল সুপেয় পানীয় ও সুস্বাদু খাদ্য উপেক্ষা করে থাকে। এটাই হল ‘লাআল্লাকুম তাত্তাকুন’ এর সারমর্ম।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
masrurakuni0@gmail.com

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com