রোজার ছয় পরামর্শ

রোজার ছয় পরামর্শ

রোজা জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুরক্ষাকবচ

রোজার ছয় পরামর্শ

ইশতিয়াক আহমাদ : মহিমান্বিত রমজানের আগমনে আমরা প্রত্যেকেই নব উদ্যমে ইবাদত বন্দেগীতে তৎপর হয়েছি। সারাদিনে প্রায় ষোল ঘণ্টা আহার্য পানাহার আর স্ত্রী সঙ্গম থেকে বিরত থেকে আমরা নিয়মিত সিয়াম সাধনা করছি। প্রচণ্ডরোদ্রের দাবদাহে গলা শুকিয়ে কাঠ টুকরো হবার উপক্রম, তবু মালিকের আদেশ পালনার্থে, মালিকের রেজা তুষ্টি অর্জনের দীপ্ত নেশায় সব কষ্ট মেনে রোজা রাখছি। মালিকের সুস্পষ্ট ঘোষণা আমাদের এ আগ্রহকে আরও তরান্বিত করেছে। হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হচ্ছে, রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই তার প্রতিদান দিব।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষনীয়, সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে আমরা যে নেক সাধনারত, তা পরিশুদ্ধ হচ্ছেতো? কোথাও কোন বিষয় তার পরিশুদ্ধতার দেয়ালে ত্রুটির চিহ্ন একেঁ দিচ্ছে না তো? নবীজী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেন, যে মিথ্যা কথা বলা এবং তার উপর চলা থেকে বেঁচে থাকে না, তার আহার্য ও পানাহার থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোন প্রয়জোন নেই।(বুখারী শরিফ)

হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারছি, রোজা রাখলেই কেবল আমরা রোজার পূর্ণ ফজিলত প্রাপ্ত হবো না, বরং আমাদের রোজাকে পরিশুদ্ধভাবে আদায় করতে হবে, আর হাদীসে কুদসিতেই এসেছে, রোজা হলো ঢাল স্বরূপ। সুতরাং আমাদের উচিৎ আমাদের রোজা নামক ঢালকে বিনষ্ট না করে বরং তার কার্যকারিতা যথার্থ রাখার নিমিত্তে তাকে পূর্ণ হিফাজত করা, যাতে তা আমাদের জাহান্নামের অগ্নি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

সিয়াম সাধনাকে পরিশুদ্ধ করতে ইসলামিক স্কলারগণ কিছু টিপস বা পরামর্শ প্রদান করেছেন, আশা করছি সেগুলো ফলো করে চললে আমাদের সিয়াম সাধনা হবে মালিকের নৈকট্য অর্জনের সোপান।

১. চোখের হেফাজত : চোখের দৃষ্টি পাপের প্রথম ধাপ। বলা চলে কুদৃষ্টি পাপের মূলপথ। হাদিসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, কুদৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহ থেকে একটি তীর। (কানজুল উম্মাল-১৩০৬৮) এ তীর সরাসরি অন্তরে আঘাত করে। ফলে অন্তরে তাকওয়ার প্রদীপ জ্বলে না। অতএব, রোজাকে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করতে রমজান মাসে নাচ-গান, ফিল্ম, সিনেমা ও গায়রে মাহরাম নারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২. জবানের হেফাজত : জবানের হেফাজত সর্বাস্থায় জরুরি। তবে রোজা অবস্থায় এর গুরুত্ব আরও বেশি। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাদারকে অশ্লীল বাক্যালাপ, গালি-গালাজ, মিথ্যা, গিবত ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। কতক আলেমের মতে রোজা অবস্থায় মিথ্যা ও গিবত করার দ্বারা রোজা নষ্ট হয়ে যায়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় মিথ্যা বললো কিংবা গালা-গালি করলো তার রোজার ব্যাপারে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (নাসায়ি-৩২৪৭)

৩. কানের হেফাজত : যে সমস্ত কথা মুখে উচ্চারণ করা নাজায়েজ, তা শ্রবণ করাও নাজায়েজ। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গিবত যে করে এবং যে শোনে উভয়ে সমান পাপী। সুতরাং রোজা অবস্থায় গান-বাজনা, গিবত-পরনিন্দা, ইত্যাদি শ্রবণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. সকল অঙ্গের হেফাজত : আল্লাহর দেয়া প্রতিটি অঙ্গই মানুষের জন্যে অমূল্য নেয়ামত। তিনি মানুষকে তা দান করেছেন সঠিকপথে ব্যবহার করার জন্যে। যদি অঙ্গ দিয়ে আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, তবে রোজ কেয়ামতে সে অঙ্গ ওই ব্যক্তির বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, চক্ষু ও ত্বক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। (সূরা হা-মীম সেজদা-২০)

৫. অতি ভোজন না করা : কারণ, অতিভোজনের ফলে কামভাব ও পশু প্রবৃত্তি দমিত হয় না। অথচ রোজার উদ্দেশ্য পশু প্রবৃত্তি দমন করা। বুযুর্গানেদ্বীন প্রবৃত্তির সাথে মুজাহাদার জন্যে কম খাওয়ার কথা বলে থাকেন। বর্তমানে ডাক্তারগণ দেহের সুস্থতার জন্যে কম খাওয়ার পরামর্শ দেন। জনৈক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষকের মতে রমজান মাসে বেশি খেলে লাভের চেয়ে শারীরিকভাবে ক্ষতিই বেশি হয়।

৬. অন্তরে আল্লাহর ভয় ও আশা জাগ্রত রাখা : যে কোনো ইবাদত আদায় করে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হওয়ার আশা রাখা এবং ভয় করা উচিত। রোজাদারের দিন কাটবে আল্লাহর আজাবের ভয় এবং রহমতের আশার মধ্য দিয়ে। আর রাত কাটবে নামাজ, দোআ ও কান্নাকাটির মধ্য দিয়ে। তাহলে রমজানের সওয়াব, বরকত ও রহমত পূর্ণভাবে পাওয়া যাবে।

আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : তরুণ আলেম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *