২৩শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

লকডাউন ও আমাদের কর্তব্য

ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন

মাসখানেক আগে থেকে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ঙ্করদর্শন নিয়ে আমাদের মাঝে হানা দিয়েছে। এর সংক্রমণ বিপর্যয় রোধে সরকার কয়েক দফা লকডাউন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে লকডাউন যেন এদেশের মানুষের কাছে তার ‘অর্থ’ হারিয়ে ফেলেছে। তাই ‘লকডাউন’ হাতে-কলমে চললেও জনগণ চলেছে নিজগতিতে। এখন এর মাশুল দিতে হচ্ছে কড়ায়-গন্ডায়। আগাম বিপদেরগন্ধ পেয়েও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যায়নি। ফলে যা হবার তাই হলো, সংক্রমণ আর মৃত্যুর হার বেড়েছে অকল্পিতভাবে। কোভিড চিকিৎসাকেন্দ্র সহ স্বাস্থ্য-মন্ত্রণালয়ের নতুন নতুন হাসপাতাল বেড এবং অক্সিজেন ও আইসিইউ চালু করেও চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। ইতোমধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে।

সরকার ৪ এপ্রিল থেকে সীমিত আকারে লকডাউন জারি করে। কিন্তু তাতে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা না দেখে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য কঠোর লকডাউন কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু তারপরও বিপনি-বিতান, দোকানপাট, হাটবাজার, ছোট ছোট যানবাহন আর মানুষের সমাগম রোধ করা যায়নি। মূল সড়কেও ব্যক্তিগত যানবাহন নানা অজুহাতে চলাচল করেছে। যেগুলো এখনো সকলের মাঝে বিদ্যমান।

এর থেকে বোঝা যায়, লকডাউনের নির্দেশনা মানতে সাধারণ মানুষের কত অনীহা! এর পেছনে অবশ্য দু’ধরনের বাস্তবতাই কাজ করে। শ্রমজীবী অনেক মানুষ আছে, যাদের পক্ষে কাজ না করে থাকা সম্ভব নয়। যেহেতু আয়-উপার্জন ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পরিবার নিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে দিনযাপন করছে। আরেক পক্ষ হলো এমন, যারা নিছক বিলাসিতা কিংবা স্বল্পপ্রয়োজনেই ঘরের বাইরে থাকছে। যাদের খোড়া-অজুহাতের শেষ নেই।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যেভাবে তান্ডলীলা চালিয়েছে, যেভাবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তাতে আমাদের আরো আগে সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। এ অবস্থায় ধরণটি যে দ্রুত শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে তাও মোটামুটি অনিবার্য ছিল। এ ক্ষেত্রে সংকট আসছে জেনেও আমাদের দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনার অভাব থাকার বিষয়টি বিস্ময়কর বটে!

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নত দেশগুলোর মতো এতো শক্তিশালী নয় যে টানা তিন-চার সপ্তাহ লকডাউন দেওয়া যাবে। আমাদের দেশের একটি বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠী শ্রমজীবী মানুষ। যারা গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনা মহামারীর সঙ্গে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই করছে। অনেকেই সেই লড়াইতে হেরে পথে বসেছে। এর মধ্যে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট সুনামির মতো মারাত্মক আঘাত হেনে অনেককেই বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত করে ফেলেছে।

ছোট-মাঝারি দোকান, বিতান এবং নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য কর্মচারী আয়-উপার্জন থেকে ছিটকে গিয়ে চরম অসহায় ও দুর্দশায় নিপতিত হয়েছে। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা এখন তাদের অনেকের দূরাবস্থা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করতে পারছি এবং এনিয়ে হামেশা আফসোস করছি। কিন্তু একটু ভাবলে দেখা যাবে যে, পরোক্ষভাবে এই কষ্টের পেছনে আমরাই দায়ী৷ কেননা আমরা সবাই মিলে যদি মাত্র একটি সপ্তাহ লকডাউন ও এর বিধি-নিষেধ পালন করতে পারতাম তাহলে হয়তো অসহায় মানুষেরা কষ্টের মুখে পড়ত না। তাদের অসহায়ত্ব দেখতে হতো না। এই লকডাউন না মানার কারণে প্রতিনিয়ত আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাউকে না কাউকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্বে আমরা যদি লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলতাম, মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং টিকা গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে পালন করতাম, তাহলে আমাদের দেশে দ্বিতীয় পর্বের সংক্রমণ এভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সুযোগ পেত না। এতোটা বিপর্যয়ের মুখেও আমাদের পড়তে হত না। এই লকডাউনে সরকারের যতটুকু না লাভ-লোকসান, তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ আমাদের নিজেদেরই।

আরও পড়ুন: ধর্ষণ : সমাজ অবক্ষয়ের নীরব সাক্ষী

কেননা যখন নানা অসতর্কতার মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হোন কিংবা হাসপাতালে বেঁচে থাকার জীবনযুদ্ধে নামতে বাধ্য হোন, তখন রোগীর নিকটজনেরাই জানে এ পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, কতটা যন্ত্রণার। অসহায়ত্ব আর উৎকন্ঠা নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হয়। আর কাউকে যদি তার প্রিয়জনকে হারাতে হয়, তাহলে সে ছাড়া এই বেদনা উপলব্ধির সাধ্য কার! তখন বোঝে আসে করোনার সংক্রমণ কতটা ভয়াবহ, নিষ্ঠুর ও বিরহের। কিন্তু তখন সে বোঝের আর লাভ কী!

এই অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে প্রিয়জনদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে কত শত শত মানুষ! আমরা জানি না, কবে এই মহাযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে। প্রতিটি রাষ্ট্র এখন নিজের জনগণকে রক্ষা করার প্রয়াসে সচেষ্ট। করোনা নতুন ভ্যারিয়েন্ট অতীতের সব রেকর্ড ভাঙ্গতে শুরু করলে গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয় কঠোর লকডাউন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ বাহিনী মাঠে কাজ করছে। তাই এই দুঃসময়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের প্রকোপ থেকে সযত্নে রাখার বিকল্প নেই। আমরা আশাবাদী, যদি কিছুদিন সবাই মিলে লকডাউন মেনে চলতে পারি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারি, তাহলে হয়তো দ্রুতই আমরা করোনার অস্বাভাবিক সময়ের স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারবো। অন্য কারো জন্য না হোক! নিজের জন্য, পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোর জন্য হলেও আমাদের বাচঁতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুন্দর বলেছেন-

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্য্য করে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই!

লেখক: কওমি শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com