১৬ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

শিশুরা যেন বিপথে না যায় : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক ● প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বলেছেন, শুধু শিক্ষা নয়, ধর্মীয় শিক্ষাকেও আমরা বাধ্যতামূলক করেছি। কিন্তু ধর্মান্ধতা যেন না আসে। ইসলাম অত্যন্ত পবিত্র ধর্ম, শান্তির ধর্ম। এই ধর্ম কাউকে খুন করার অধিকার দেয়নি। শিশুরা যেন বিপথে না যায় সে বিষয়ে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তারা যেন জঙ্গি ও মাদকাশক্ত হয়ে না পড়ে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয় আয়োজিত শিশু  সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শিশু প্রতিনিধি উপমা বিশ্বাস। বিশিষ অতিথির  বক্তব্য রাখেন শিশু ও মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, শিশুদের পক্ষ থেকে শিশু  ফাইয়াদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ স্বাগত বক্তব্য প্রদান করে।

মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শিশু  ও মহিলা বিষয়ক সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার  মনির হোসেন ও গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের মর্মবাণী হল শান্তির বানী প্রচার করা। কাজেই যে যে ধর্মই গ্রহণ করুক না কেন, সবাইকে মাথায় রাখতে হবে– যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। ধর্মে সব সময় শান্তি, ভাতৃত্ব, সৌহার্দ্যের কথা বলা হয়েছে। সেটা সকলকে মেনে চলতে হবে।’জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শৈশব থেকেই পরোপকারী ছিলেন জানিয়ে সমাবেশে আসা শিশুদের তা অনুসরণ করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে বড় হতে হবে। দেশের মানুষকে ভালবাসতে হবে।একদিন তোমরা দেশের কর্ণধার হবে। আমার মত প্রধানমন্ত্রী হতে পার। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে ধাপে ধাপে এ জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে জীবনে অনেক বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, বারবার মৃত্যুর মুখে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। তিনি ছিলেন অদম্য সাহসী, নীতি ও লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে গেছেন।

দাদীর কাছে শোনা বাবার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু। বালক বয়স থেকেই তিনি মানুষের উপকারে বিভিন্ন কাজ করতেন। নিজের জামা, খাবার ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস অভাবী মানুষকে বিলিয়ে দিতেন। দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধু তার বাবার গোলা থেকে ধান বিলিয়ে দিয়েছিলেন বলেও জানান শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার বদলে তাকে দেখতে জেলখানায় যেতে হয়েছে। কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারা সময়ও বাবার সঙ্গে জেলে দেখা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতির পিতা চেয়েছিলেন, এ দেশের প্রতিটি শিশু শিক্ষিত হবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি। প্রত্যেকটা শিশুর মাঝে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে, তা বিকাশের সুযোগ করে দিচ্ছি।

শিশু সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, চিত্রাংকন, আবৃত্তি ও ৭ মার্চের ভাষণ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে শিশু ও মহিলা অধিদপ্তরের উদ্যোগে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলার ১০০ দুস্থ মহিলাদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে আসেন। ১০টার পর  রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে স্বাগত জানান।

পরে সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ বেদী পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর পবিত্র ফাতেহা পাঠ করেন। তারা বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেন।

এর পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক  সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধু সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক পেশাজীবী ও শ্রমজীবি সংগঠনের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি  শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

বিকেল ৫টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা বলেছেন, আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, তখন আমার বাবা বেশির ভাগ সময় জেলেই থাকতেন। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বাবা বাসায় থাকলে স্কুলে যাওয়ার বায়না ধরতাম। তাই বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন। এ সময় ঈদের মতো আনন্দ হতো।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে শিশুকিশোরদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন (সিআরআই)। শিশুদের কাছে বঙ্গবন্ধুর শৈশবকাল, রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রামের কথা তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক উপস্থিত হন।

শেখ রেহানা বলেন, ‘বেশির ভাগ একাই স্কুলে যেতাম। মাঝে মাঝে মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা স্কুলে নিয়ে আসতেন। আমরা যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে উঠি তখন আমার বয়স ৩-৪ বছর। বাবা বাসায় থাকলে পরিবারের সবাই মিলে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। বিভিন্ন রকমের ফুলে ভরে থাকতো বাসার বাগান, বারান্দা।’

তিনি বলেন, ‘বাবা সকালে পুরো ধানমন্ডিতে হাঁটতেন। আমি আর ভাইয়েরা শুধু ৩২ নম্বরেই তার সঙ্গে হাঁটতাম, কিন্তু বোঝাতাম আমরাও পুরোটা হেঁটেছি। বাবাকে তো আমরা সব সময় কাছে পেতাম না, তাই যখনই বাসায় থাকতেন, বাচ্চারা সবাই তার সঙ্গে খেলতো, তার কারাগারে থাকার গল্প শুনত, তার হাতে ভাত খেতো।’

বঙ্গবন্ধু কোথায় জন্মেছিলেন, তার বাবা-মার নাম কি শেখ রেহানা এ প্রশ্নগুলো করলে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয় শিশুরা। বাবা কেমন শাসন করতেন, একজন শিশুর এমন প্রশ্নে শেখ রেহানা বলেন, মারধর তো দূরের কথা কখনো বকাও দিতেন না। শুধু এমনভাবে তাকাতেন যে আমরা বুঝে ফেলতাম যে কোন ভুল করে ফেলছি।

শেখ রেহানা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শিশুদের অনেক ভালোবাসতেন। বাবার চাইতে মা বেশি শাসন করতেন। পড়াশোনায় বাবার ছিল কড়া নজর, সবার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তিনি যখনই সুযোগ পেতেন, ছেলে-মেয়েদের বাংলা-ইংরেজি লেখার দক্ষতা, অংকের দক্ষতার পরীক্ষা নিতেন। তখন সবাই খুব ভয়ে থাকতাম।’

তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে অন্য শিশুরা যখন বাবার সঙ্গে মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটার গল্প করতো, তখন আমার অনেক মন খারাপ হতো। একবার এমন ঈদের সময় বাবা বাড়িতে ছিলেন, তখন তাকে আমি জোর করে নিউ মার্কেটে নিয়ে যাই। এখনকার মতো শপিং মল তখন ছিলনা, নিউ মার্কেটই ছিল কেনাকাটার সবচেয়ে বড় জায়গা। বাবা নিউ মার্কেট থেকে একটি জামা ও আইসক্রিম কিনে দেন।’

বঙ্গবন্ধুর মতো মহান ব্যক্তিত্বদের সম্বন্ধে জানতে শিশুদের উপদেশ দেন শেখ রেহানা। এতে তারা কিভাবে অন্যের উপকার করতে হয়, কিভাবে মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হয় তা জানতে পারবে।

patheo24/mr

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com