২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

সমাজের বিচ্ছেদকে মিলনে পরিণত করতে হবে : আল্লামা মাসঊদ

সমাজের বিচ্ছেদকে মিলনে পরিণত করতে হবে : আল্লামা মাসঊদ

পাথেয় রিপোর্ট : পতন্মুখ এই সময়ে বিপন্ন সমাজের চিত্র বয়ান করতে গিয়ে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ও বেফাকুল মাদারিসিদ্দীনিয়ার চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, আজকের সমাজে একজন আরেকজনের প্রতি যে আক্রোস রাখে জাহিলি যুগেও ছিলো না। সমাজের সর্বত্র বিচ্ছেদ আর বিচ্ছেদ। আলেম উলামার কাজ হলো এই বিচ্ছেদকে মিলনে পরিণত করা। দুঃখের বিষয় হলো আজ আলেমগণই বিভ্রান্ত মানুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। আলেম যদি হিদায়াত থেকে মাহরুম হলে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু হিদায়াতের বাত্তি হলো আলেমদের হাতে। অন্ধ ব্যক্তি যেমন বাতি নিয়ে চললে নিজের আলো না পেলেও অন্যরা অন্তত তাকে দেখতে পায় এবং কেউ ধাক্কা দেবে না।

১২ এপ্রিল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর ইকরা বাংলাদেশ মিলনায়তনে জমিয়তুল উলামার কর্মী সম্মেলনে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।

অবক্ষয় থেকে মানুষকে বাঁচাতেই বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা কাজ করছে দাবি করে জমিয়তুল উলামার মহাসচিব মাওলানা আবদুর রহিম কাসেমী বলেন, জমিয়তুল উলামা নববী আদর্শ, নবীর দৃষ্টিভঙ্গি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে।

জমিয়তুল উলামা গতানুগতিক কোন কর্মসূচি হাতে নেয় না। জমিয়তুল উলামা নবীজীর আদর্শের উপর চলে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তবেতাবেয়ীন থেকে আকাবিরগনও নবীর দৃষ্টিভঙ্গির উপর মেহনত করেছেন। অতএব আমাদেরকে নবীচিন্তার উপর অন্য চিন্তাকে বিসর্জন দিতে হবে।

আলেমদের সতর্ক করে আল্লামা মাসউদ বলেন, আওয়াম ও আলেমদের মধ্যকার বিচ্ছেদের পরিণতিতে আওয়াম হবে বঞ্চিত এবং আলেম হবেন জালিম।

বোখারা সমরখন্দে আলেমগণ জুলুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, আওয়ামের সঙ্গে না মেশার কারণেই বোখারায় আলেমদের উপর নির্যাতন নেমে আসে। অধপতন কোখনোই আর ঠেকানো যায়নি।

আকাবিরের বার্তা দিয়ে ইসলাম বুঝার আহ্বান জানিয়ে আল্লামা মাসঊদ বলেন, আকাবিরের পাওয়ার দিয়ে শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী ইসলাম বুঝেছিলেন।

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ও বেফাকুল মাদারিসিদ্দীনিয়ার চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, আকাবিরের চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠিত চেতনাই হলো দেওবন্দী চিন্তা।দেওবন্দিয়াত।সাহাবায়ে কেরাম কখনো সুন্নাহ থেকে সরেন নাই , আকাবিরে দেওবন্দও সুন্নাহর উপরে ছিল।

জমিয়তকর্মীদের কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, জবান বা কথা বড় নয় বরং কাজই বড়। জমিয়তের কাজ মানে আকাবিরদের কাজ।

জজবা নয় নবীজীর অনুসরণের মানুষের মুক্তি আছে দাবি করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, সালমান ফার্সী পিতার নাম বলতেননা, তিনি সালমান বিন ইসলাম বলতেন। ইসলাম জাতীয়তাবাদ ধর্মের উপর নির্ভর নয় আঞ্চলিকতার উপর নির্ভর করে। শাইখুল ইসলামও বুঝেছিলেন জজবা বা শক্তি দিয়ে নিয়ে নয় বরং চেতনা দিয়ে কাজ করতে হবে। জজবা দিয়ে কাজ করা যায় না। সত্য সত্যই, সত্যকে উপলব্ধি করে বলতে থাকতে হয় এতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুখরোচক আর জজবা দিয়ে কথা বলি না বলে এই সমাজ আমাদের গ্রহণ করতে চায় না। জজবা আর মুখরোচক কথা বাদ দিয়ে মৌল চেতনায় তুলে আনার দায়িত্বই কর্মীদের।

কর্মীদের কাজের কথা উল্লেখ করে ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, কাজ কী। তা বুঝতে হবে। ১। চেতনা নির্মান ২। কাজ নির্ধারণ ও ৩। কাজের পদ্ধতি ঠিক করে আমাদেরকে পরিকল্পনা করতে হবে।

দেশের আলেমগণ আলোকবর্তিকা দাবি করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, হেদায়তের বাতি আলেমদের হাতে, নিজেদের পরিচয় জেনে সে বাতি আমাদেই জ্বালাতে হবে। বিচ্ছেদকে মিলনে পরিণত করতে হবে। বর্তমানে যে আক্রোশ-বিদ্বেষ সমাজে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে তা জাহেলি যুগেও ছিলো না। হেদায়ত থেকে মাহরুম হলেই এমন হয় কেননা হৃদয়হীন মানুষ পশুর চেয়েও অধম। আলেমরা হেদায়তের বাতি জ্বালাতে না পারলে, বিচ্ছেদ-বিচ্ছিন্নতাকে রুখতে না পারলে আওয়াম মাহরুম হবে আর উলামারা মজলুম হবে। ফলে বোখারা সমরকন্দের মত আলেমদের ছিড়ে খাবে এই জনগণই।

উম্মতের মধ্যে খুন, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ এই জঘন্য রূপায়ণে বিবেকহীন পৃথীবির মধ্যে এ বিষয়টি আমাকে ভাবিত করছে। এ অবস্থায় নবীজি অস্থির হয়ে উলট পালট খাচ্ছেন মদীনায় নবীজীর রওজায়।

বর্বতায় জর্জরিত সমাজ শুভ চেতনা পাওয়ার বাসনায় উদগ্রীব হয়ে আছে উল্লেখ করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, একমাত্র এই শুভ চেতনার অংশ জমিয়ত। লোকরঞ্জণ, মুখরোচক কথা আমরা বলি না। ঠিক যেমন আহমদ ইবনে হাম্বল -এর মাসালায় কোন মানতেক পেশ করলেন না। সবাই যখন যুক্তি তর্ক পেশ করলেন তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা আমাকে এমন একটি আয়াত বা হাদীস দেখাও যেখানে বলা আছে কোরআন মাখলুক’ । খলকে কোরআন এর মাসায়ালায় তিনি ছিলেন অটল অবিচল, কেউ তাঁকে তাঁর এই চিন্তাধারা থেকে সরাতে পারেনি আমৃত্যু তিনি একই কথা বলে গেছেন।

সে সময় কেউ না মানলেও আজ আর এই নিয়ে কোন সংশয় নেই। আমাদেরও মনে রাখতে হবে শুধু জজবা চেতনার সৃষ্টি করে না, বরং স্থির চেতনাকে আগে বাড়ায়, অগ্রসর করতে উদ্বীপ্ত করে।

জমিয়তের কাজের সৌন্দর্য ও দ্বীনি পথের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, পিয়ারে হাবিবের তাওয়াজু উম্মুখ হয়ে আছে, ফেরেশ্তারা আমাদের ছড়িয়ে আছে। আকাবির ও সাহাবীদের চেতনার আঙ্গিনায় আমরা শরীক হব। আম্বিয়া কেরামের মিছিলের অত্যুঙ্গ মার্গে আমরা শামিল হবো ইনশাআল্লাহ।

এদিকে দেশের মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করতে ও আলোকিত মানুষ গঠনের অভিপ্রায়ে বিকাল তিনটা থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার কর্মী সম্মেলন। বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মুফতি আবুল কাসেম-এর সভাপতিত্বে এ সম্মেলন শুরু হয় পবিত্র কুরআন পাকের তিলাওয়াতের মাধ্যমে।তিলাওয়াত করেন জামিআ ইকরা বাংলাদেশ ফারেগীন মাওলানা মাজহারুল ইসলাম। হামদে বারী তাআলা পরিবেশন করেন জামিআ ইকরা বাংলাদেশ ফারেগীন, কলরব শিল্পী সাইদুজ্জামান নুর। স্বাগত ভাষন দেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার মহাসচিব মাওলানা আবদুর রহিম কাসেমী।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন দাবি করে মাওলানা উবায়দুর রহমান বলেন, আল্লামা মাসঊদ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন না। মানুষ তাৎক্ষণিক ভুল বুঝেন তাঁকে কিন্তু পরে ঠিকই বুঝতে পারে তিনি ঠিকই বলেছেন।

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এক লাখ আলেম ইমাম ও মুফতির স্বাক্ষরসম্বলিত মানবকল্যাণে শান্তির ফাতওয়ার বিষয়ে উবায়দুর রহমান বলেন, এক সময় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ফতওয়া দেওয়ায় অনেকে হাসাহাসি করেছে কিন্তু বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হওয়ার পরে ঠিকই সবাই বুঝতে পেরেছে। অনেককে গর্ব করতেও শুনেছি।

আল্লামা মাসঊদের মতো আপসহীন আর কোনো আলেম নেই দাবি করে তিনি বলেন, আল্লামা মাসঊদ কখনো অন্যায়ের সাথে আপোস করেন না। এ চেতনা আমরা তাকে চল্লিশ বছর ধরে দেখছি।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com