২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

সমাজ বিধ্বসংসী পরকীয়াঃ সমাধানে ইসলামী ভাবনা | ২য় পর্ব

সংযমী পুরুষ

মাহতাব উদ্দীন নোমান : প্রতিটি মন্দ কাজের সূচনা খুব ছোট জিনিস থেকেই হয়। যেমন দাবানলের শুরুটা ছোট আগুন থেকেই হয়। ছোট আগুন আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে একটা এলাকা, একটা সমাজকে ধ্বংস করতে পারে। সুতরাং আগুন ছোট থাকতে এই নিভিয়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ।

ঠিক তেমনভাবেই সমাজের অশ্লীলতা, নারী উত্যক্ততা এবং যৌন হয়রানির বিষয়গুলোও শুরু হয় ছোট ছোট বিষয় থেকে। অতঃপর তা ধর্ষণ, ব্যভিচার এবং পরকীয়ার মতো জঘন্য ও মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত করে। সুতরাং এই সকল বিষয়কে ছোট থাকতেই প্রতিহত করা বুদ্ধিমানের কাজ। যাতে একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি দেশ এই সকল খারাপ কাজ থেকে মুক্তি পেতে পারে। সমাজের প্রত্যেকটি লোক নিজেদের নৈতিকতাকে রক্ষা করতে পারে। দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক হতে পারে সচেতন।

ইসলাম কখনোই অন্যায় ও অশ্লীল কাজকে সমর্থন করে না। ইসলাম যেমনভাবে খারাপ এবং অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, ঠিক তেমনভাবে এইসব অশ্লীল এবং খারাপ কাজের উপকরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সমাজকে এসকল মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য ইসলামের পদক্ষেপ এবং দিকনির্দেশনা গুলো অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও প্রশংসনীয়। উক্ত পদক্ষেপ গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পুরুষ এবং নারীর দৃষ্টি সংযত রাখা, অবনত রাখা। কেননা সমাজে যৌন হয়রানি এবং অশ্লীলতার প্রথম সূচনা হয় এই দৃষ্টির দ্বারা। গভীর চিন্তা করলে দেখা যায়, এই দৃষ্টি সংযত রাখার মধ্যেই রয়েছে সমাজের অনৈতিক, মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধের মহৌষধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে এরশাদ করেন, ‘(হে নবী) আপনি মুমিনদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য রয়েছে খুব পবিত্রতা। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা সম্পর্কে অবহিত আছেন। এবং ঈমানদার নারীদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে।’ (সূরা নূর, আয়াত নং ৩০-৩১)

উক্ত আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, পুরুষরা চোখের দ্বারা যা করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই সম্পর্কে ভালই জানেন। অন্য আয়াতে এই বিষয়টাকে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।’ (সুরা মুমিন, আয়াত নং ১৯)

তিনি অন্য আয়াতে কান, চোখ এবং হৃদয় দ্বারা কৃতকর্ম সম্পর্কে কেয়ামতের দিন পরিপূর্ণ হিসাব নেওয়া হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। যদি চোখের দ্বারা কোন পাপাচার না করে থাকে তাহলে সে রক্ষা পাবে। আর যদি চোখের দ্বারা কোন পাপাচার হয়ে যায় তাহলে সেদিন তার কোন রক্ষা নেই। এরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই কান, চক্ষু এবং অন্তর; প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত নং ৩৬)

আমি যদি কোন গুনার কাজ করি তাহলে আমার চোখ, আমার কান, আমার হৃদয়, আমার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেয়ামতের দিন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে। আমার কেয়ামতের দিন আমার মুখে মোহর এঁটে দেওয়া হবে এবং আমার হাত-পা গুলো আমার মন্দ কাজের বর্ণনা দিতে থাকবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, ‘আজ (কিয়ামতের দিন) আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাতগুলো আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা গুলো তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিবে।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত নং ৬৫)

উপরোক্ত আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের চোখে এবং অন্য সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। যদি আমরা উত্তর না দিতে পারি তাহলে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আমাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিবে। সুতরাং সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলোকে গুনার কাজ থেকে বিরত রাখা মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

কিন্তু সমাজে ও রাস্তাঘাটে চলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়। এই মহামারী থেকে বাঁচার পদ্ধতিও প্রিয়নবী শিখিয়ে গিয়েছেন। হঠাৎ যদি কোন বেগানা নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে একজন মুমিনের করনীয় সম্পর্কে নবীজি বলেন, ‘হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হঠাৎ বৃষ্টি পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। (অর্থাৎ যদি হঠাৎ কোন বেগানা নারীর প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে আমার করনীয় কি?) তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি যেন সে দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেই। (মুসলিম, হাদিস নং ২১৫৯)

বেগানা নারী এবং হারাম স্থান থেকে দৃষ্টি অবনত রাখলে কেয়ামতের দিন পুরস্কার হিসেবে জাহান্নামের আগুন দেখতে হবে না। মহানবী ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির চোখ জাহান্নাম দেখবে না। ১.যে চোখ আল্লাহর রাস্তায়। ২. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। ৩. যে চোখ হারাম স্থান থেকে দৃষ্টি অবনত রেখেছে। (আল মুজামুল কুবরা লিত তাবরানী, হাদিস নং ১৬৩৭৫)

মানুষের এটা স্বভাব যে, সে কোন লোভনীয় বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বেগানা নারীর প্রতি হঠাৎ দৃষ্টিপাত করার দ্বারা মানুষের অন্তরের মধ্যে কামভাব সৃষ্টি হওয়াটাও তার স্বভাবগত বিষয়। কিন্তু এটা শয়তানের প্ররোচনায় অত্যন্ত মন্দ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এই কামভাব দূর করার পদ্ধতিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘হযরত জাবের থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অনেক সময় কোনো নারী শয়তানের আকৃতিতে আসা-যাওয়া করে। (অর্থাৎ তার ঢং ও চালচলন মানুষের জন্য শয়তানি ফেতনার উপকরণ হতে পারে) তাই তোমাদের কারো কাছে যদি কোন নারী ভালো লেগে যায় এবং তার অন্তরে এর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে সে যেন নিজ স্ত্রীর কাছে চলে যায় এবং তার কামনা পূরণ করে নেয়। এ প্রক্রিয়া তার মন্দ বাসনাকে দূর করে দিবে। (মুসলিম, হাদিস নং ১৪০৩)

হারাম স্থান থেকে দৃষ্টি হেফাজতের জন্য ইসলাম অন্যের ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার বিধানও দিয়েছে। যাতে সমাজে ব্যভিচার, ধর্ষণ, পরকীয়া, কুধারণা এবং অপবাদের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অনুমতি ছাড়া কোন ঘরে উঁকি মারতেও নিষেধ করেছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে প্রবেশ করো না যে পর্যন্ত না আলাপ-পরিচয় করো এবং সেই ঘরে লোকদেরকে সালাম করো। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম; যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। যদি তোমরা গৃহে কোন লোককে না পাও তবে তাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেওয়া হয়। আর যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও তবে তোমরা ফিরে যেও। এতেই তোমাদের জন্য খুব পরিছন্নতা রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা জানেন যা তোমরা করো।’ (সূরা নূর, আয়াত নং ২৭-২৮)

সমাজকে অশ্লীলতা ও মন্দ কর্ম থেকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এগুলোর মধ্যে একটি ইহাও যে, কোন ব্যক্তি কোন পরনারীর সাথে নির্জনে সাক্ষাত করবে না। কারণ শয়তান তখন তাদেরকে অপকর্মে লিপ্ত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। হযরত ওমর সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন পুরুষ যেন কোন বেগানা নারীর সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে, কেননা তখন সেখানে তৃতীয় জন হিসেবে শয়তান অবশ্যই থাকে।

প্রথম পর্ব পড়ুন: সমাজ বিধ্বংসী পরকীয়াঃ সমাধানে ইসলামী ভাবনা | ১ম পর্ব

এমনকি স্বামীর উর্দ্ধতন এবং অধঃস্তন ছাড়া স্বামীর নিকট আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও আল্লাহর রসূল সতর্ক করে গেছেন। তাদেরকেও স্বাধীনভাবে ঘরে আসা, নির্জনে ও প্রকাশ্যে বেপর্দা সাক্ষাৎ করা এবং কথাবার্তা বলতে কঠিন ভাবে নিষেধ করেছেন। হযরত উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা বেগানা নারীদের কাছে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকো (এবং এ ব্যাপারে খুবই সর্তকতা অবলম্বন করো) এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল ইয়া রাসূলাল্লাহ দেবর (স্বামীর নিকট আত্মীয় ইত্যাদি) সম্পর্কে কি বলেন ? তিনি উত্তর দিলেন দেবর তো মৃত্যুতুল্য।’ (বুখারী, হাদিস নং ৫২৩২)

বিবাহিততা নারী যাদের স্বামী কোথাও কর্ম চাকরি-বাকরিতে অথবা সফরে গিয়েছে, তাদের সাথে ভিন্ন পুরুষদের সাক্ষাতে ফেতনার আশঙ্কা বেশি থাকে। এজন্য মহানবী এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশ প্রদান করেছেন। হযরত জাবের থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা ঐ সব মহিলার ঘরে যেও না যাদের স্বামী বাড়ির বাহিরে (সফর ইত্যাদি কোন কাজে) গিয়েছে। কেননা শয়তান সবার মধ্যে এরূপ অদৃশ্যভাবে চলে যেরূপ শিরা সমূহে রক্ত প্রবাহমান থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস নং: ১১৫৪)

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ইসলাম ও ইসলামী শরীয়ত এই সকল বিষয়গুলো যত গুরুত্ব দিয়েছে, কোরআনে এর বিস্তারিত অবতীর্ণ হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে এর প্রতি যে পরিমাণ জোর দিয়েছেন, কিন্তু মুসলমানরা আজকাল এ ব্যাপারে সে পরিমাণ উদাসীন। আমাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়েই শয়তান আমাদের দ্বারাই আমাদের সমাজকে নষ্ট করছে। সমাজের মধ্যে ধর্ষণ, ব্যভিচার, পরকীয়া ও অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইসলামের নৈতিক দিক নির্দেশনা ও বিধিবিধানগুলোই এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়। সমাধানের একমাত্র পথ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকেই মন্দ ও অশ্লীল বিষয় থেকে দৃষ্টি সংযত রেখে সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখকঃ শিক্ষক ও খতীব

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com