আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে— ৪
‘সাদিয়ানী ফিৎনা’র মারকাযে
———মুফতী আবদুস সালাম
অনেকটা বীর দর্পে নিযামুদ্দীন মারকাযের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমরা সা’দপন্থী হলে নিযামুদ্দীন হয় আমাদের ‘পৈতৃক ভিটা’; সেই পৈতৃক অধিকার খাটিয়ে ‘বাহুকা বল দেখ বেটা’ টাইপ ভাব নিয়ে মারকায মসজিদে প্রবেশ করলাম। এই মসজিদ আর কাকরাইল মসজিদের মাঝে তেমন কোন ফারাক নেই। আগে কাকরাইল গেলে দেখতাম, বয়ান তালিম তাশকিল মশক মুজাকারার আওয়াজে পুরো মসজিদ গমগম করছে, এখানেও ঠিক তাই, এখানেও সেই প্রাণ আছে, আছে সেই সঞ্জীবনী, তবে কোন ঠুনকো জিনিসকে কেন্দ্র করে উগ্র আস্ফালন এখানে নেই, নেই দলাদলি আর গদি দখলের উদগ্র বাসনা, নেই কাদা ছোড়াছুড়ি, নেই ফতোয়াবাজির উৎকট গন্ধের ছড়াছড়ি।
‘সাদিয়ানী ফেতনা’ থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে দেওবন্দ সাহারানপুর বা নদওয়া থেকে কোন লাঠিয়াল বাহিনী আজ পর্যন্ত এখানে হামলা করেনি। বাকি সব চিত্র আমাদের কাকরাইল মসজিদের মতই।
‘এতায়াতী,ওয়াজাহাতি’ শব্দদ্বয়ের সাম্প্রদায়িক উগ্রতার ঊর্ধ্বে উঠে শুধু ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়ে মধ্যবয়সী লোকগুলো আমাদের লাগেজ নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিলো। বাংলাদেশী হালকায় গিয়ে আস্তানা গাড়লাম। বাড়তি খাতির যত্ন আদায় করতে হাবিবুল্লাহ গিয়ে জিম্মাদার সাথীদের কাছে আমার পরিচয় জানিয়ে দিলো, মোটামুটি কাজও হলো তাতে। জিম্মাদার সাথীরা কয়েকজন উঠে এসে আমার ‘হালপুরসি’ করছে৷ সবাই যুবক গোছের, চোখে গাঢ় করে সুরমা মাখানো, নারিকেল তেলে চপচপ বাবরি দোলানো ঝাঁকড়া চুলগুলো নাচিয়ে নাচিয়ে কথা বলছে যুবকগুলো।
গুলিস্তানের একজন বলল, হযরত আপনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। আরেকজন বলল, আমার বাসা নয়াটোলা, আমি আগামী মাসেই দেশে ফিরছি, দেখা হবে। প্রচণ্ড রকমের ভিড় থাকার পরও তারা আমাদের জন্য দুটি সিটের ব্যবস্থা করে দিলো।
একটা মিথ্যা একশবার বললে তা সত্য হয়ে যায়, ওয়াজাহাতিরা আমাদেরকে এতায়াতী বানানোর জন্য লক্ষবারেরও বেশী মিথ্যা কথা বলেছে, এবং এতে লোকে আমাদেরকে সত্যি সত্যি এতায়াতী হিসেবে ধরে নিয়েছে৷ বাংলাদেশে পাইনি তবে দিল্লী এসে জবরদস্তি ‘এতায়াতী’ হওয়ার সুবাদে একরাত মাথাগোঁজার ঠাই হলো, এই ফায়দাটুকুও বা কম কীসে?
এশার নামাযের অপেক্ষায় আছি। সা’দ সাহেব এলে নামায শুরু হবে। আশপাশের লোকগুলোর দিকে ভারী মায়া হচ্ছে আবার ঈর্ষাও হচ্ছে, আহা কত লকবের পসরা সাজানো হয়েছে এদেরকে ঘিরে! ‘সাদিয়ানী ফেতনা’ ‘ফেরকায়ে সা’দিয়াহ’ ‘ফিতনায়ে সা’দিয়্যা’ গোমরা সা’দ’ ‘মৌলবী সা’দ’ ‘সা’দ মোল্লা’ ‘ভণ্ড সা’দ’ একজন লোক ও তার অনুসারীদের কতগুলো লকব ভাবা যায়?
নামাযের পরে সা’দ সাহেবের হায়াতুছ ছাহাবা থেকে তালিম করানোর কথা থাকলেও পুত্র ইউসুফ তালিম করালেন। পুত্রকে এখন থেকেই পোক্ত করা হচ্ছে। এ যেন বাংলার জমহুরদের চিন্তার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা।
তিন দিন ধরে ভাত খাইনি অথচ আমার কাছে মনে হচ্ছে তিন মাস হলো ভাত চোখে দেখিনি। নিযামুদ্দীনের অলিগলি ভেঙ্গে অবশেষে হাবিবুল্লাহ এক ভাতের হোটেল আবিষ্কার করলো। পরিবেশ সুন্দর না হলেও ডাল ভাত আর পুই শাকের স্বাদ ছিলো অতুলনীয়। সম্পূর্ণ দেশীয় স্বাদের মুরগীর ঝোল। ইন্ডিয়ায় আমার এটাই ছিলো সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ তৃপ্তি ভরে খাওয়া।
মধ্যরাতে ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলোয় নিযামুদ্দীনের রাস্তায় হাঁটছি, রাতের হিমেল হাওয়ায় গা জুড়িয়ে আসছে। অতীত আমার সামনে এসে স্থবীর হয়ে গেলো যেন, নিযামুদ্দীনের এই পথের ধুলোয় হেঁটেছেন কত মনীষা, এই পথে আলো জ্বেলেছেন হযরতজী ইলিয়াস কান্ধলভী, ইউসুফ কান্ধলভী, মনজুর নোমানী, আবুল হাসান আলী নদবী, এনামুল হাসান কান্ধলভী, ধন্য হয়েছে এই বাতাস শাইখুল ইসল মাদানীর পরশে, এই এখানে এই পল্লীতে থেকেছেন শায়খুল হাদীস যাকারিয়া, আরও কত কে। তাদের কথা ভেবে ভেবে আমি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। ইচ্ছে করে সেই মহান আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে এমনি ভাবে কাটিয়ে দেই লাখো কোটি বছর।
নিযামুদ্দীন থেকে সকাল সন্ধ্যায় বাস ছেড়ে যায় দেওবন্দে, মসজিদে রশিদের পাশে সারাদিন থেকে সন্ধ্যায় আবার নিযামুদ্দীন ফিরে। দারুল উলুম দেওবন্দ না হয়ে যদি বাংলাদেশের কোন ‘মকতব’ হতো নির্ঘাত বাসখানা তার হাতপা হারাতো৷
‘সাদিয়ানী ফিতনা’র আখড়া থেকে গাড়ি এসে দেওবন্দ থাকবে তা হবে না, তা হতে পারে না।
দেওবন্দগামী মিনিবাসে আমরাই সবার আগে চেপে বসলাম। কিছুক্ষণ বাদে বারো পনেরো জনের একটা জামাত উঠলো। সেখানে অল্পবয়সী এক যুবক ছিলো, কাকরাইল মাদরাসায় সাতবছর পড়েছে। বাংলা জানে বেশ। যুবকের সমস্যা হচ্ছে সে অল্পতেই রেগে যায়, একবার রাগ ওঠলে সহজে নামে না। বাসে উঠে ছেলেটা আরেকজনের সীট দখল করে বসলো, উঠিয়ে দেওয়ার কারণে ভীষণ ক্ষেপে গেলো সে, অন্য কোন সীটে বসবে না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাবে। বহু বলে কয়ে আমীর তাকে বসালো।
পাঁচ ঘণ্টায় দেওবন্দ পৌঁছা গেলো। দারুল উলুম দেওবন্দকে প্রথম দেখার নিশ্বাসের কথা ঠিক মনে আছে আমার? স্বপ্নে স্বয়ম্ভর; তন্ময় হয়ে আমি কি বলে উঠেছিলাম- কত কালের পুরোনো হাড় তুমি, জানে না ওই মাটি বা মরুভূমি, কী নাম ছিলো? কী ছিলো পরিচয়?
ক্যালেন্ডারে যে লাল দালানটির ছবি দেখে দেখে দারুল উলুমকে ভালোবেসেছিলাম; এতোকাল ধরে ঝাপসা হয়ে ওঠা একটি জীবৎকাল আর শতাব্দিকে আমি অবলীলায় দেখছি ধুলোখেলার সেই মেঘের আড়ালে।
এই কি সেই জলাঙ্গিনী? বিন্দু পার হয়ে সমুদ্রজগত উত্থাপন করে মেঘ স্তম্ভ লাল ঊর্ধ্ববিন্দু? কি নেশা আছে এই লাল স্তম্ভে? এই মেঘে? সমুদ্রজগতে? যার অস্তিত্ব কৃষ্ণতম নীল, তমসাতম ক্রমঅগ্রসরমান। চাঁদ সে দণ্ডিত আলো মাথা দিয়ে ঠেলে মুহ্যমান মেঘে ঢাকা চন্দ্রসংস্করণ। অশরীর লক্ষ চন্দ্র নিয়ে নীলিমা স্থাপন করা এই স্তম্ভ। আমি আছি তোমাতেই।
যতক্ষণ এই শ্বাস আছে তোর শীর্ষাসনে বাস/মাথার নীচে বসুন্ধরা, দুপায়ে কৈলাস।।
লেখক : শিক্ষক ও পরিভ্রাজক


