২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

স্বপ্ন দেখি দেওবন্দ

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : দারুল উলুম দেওবন্দকেই স্বপ্ন দেখি। কালের বিবর্তনে মানুষ হারিয়ে গেলেও আমরা হারিয়ে যায়নি। আজো দেওবন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য ধারণ করে আছি। আঁকড়ে আছি দেওবন্দীয়্যাত। যত আসুক বাঁধা। তবুও আকাবির-আছলাফের নজরিয়্যাহ থেকে সরে যাব না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত তথা মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি এর দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী এ দেওবন্দী হালকার দামান ছাড়বনা কখনো।

লাইব্রেরিতে ঢুকলে যদি দেওবন্দ সম্পর্কে কোন বই, প্রবন্ধ, নিবন্ধ নজরে আসে, সেটা যেন লুফে নেই। একই টেবিলে দুটো বই, একটা উলামায়ে দেওবন্দের ইতিহাস- ঐতিহ্য – অবদান সম্পর্কে, অন্যটি ভিন্ন কোন লেখা, আমার হাতটি চলে যায় দেওবন্দ নিয়ে লেখা বইয়ের উপর। দুনিয়ার বহু দেশের আলেম- উলামার তাকরীর শোনা হয়। কী সুন্দর তাদের উপস্থাপনা। কিন্তু দেওবন্দী হালকার কোন আলেমের সাথে যেন আজো ওজন করা যায় না। এ যে অনন্য। অতুলনীয় আমার দেওবন্দী ঘরানার আলেমগণ।

নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি। অনেক ভাবে মানানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোন বুঝ যেন মানে না। দেওবন্দ যেন সেরা মনে হয় আমার কাছে। অনেকে হয়ত আমাকে গোঁড়া বলবেন, অন্ধ অনুকরণের কথা বলতে পারেন। কিন্তু তবুও ফেরাতে পারিনা মনকে। মন আমার ছুটেই যায় দারুল উলুম দেওবন্দ এর দিকে।

তবে আমি গোঁড়া নই। অন্ধ অনুকরণ করি না। যা সত্য তা বলি, লিখি। মানুষের সামনে তুলে ধরি। সেই সত্য কথাটা অনেকের কাছে অপছন্দ হয়। সেটাকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করে। শত শত বছর যাবত আজ দারুল উলুম দেওবন্দ এর খেদমত চলছে। এই ভারতবর্ষসহ পুরো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেছে দারুল উলুম দেওবন্দ এর অবদান। পৃথিবীর এমন কোন জায়গা বাকি নেই, যেখানে দেওবন্দের খেদমত পৌছেনি। বিশ্বময় বিস্তার করে আছেন দেওবন্দী আলেমগণ।

কী নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেটা কী আমরা জানি? কত নিমর্মতার শিকার হয়েছে এ জাতি। এদেশের সর্বস্তরের মানুষের উপর দিয়ে নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চলেছে। বিশেষ করে আলেম সমাজ ছিল সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত। জুলুমের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ছিল ময়দানে। হাজার হাজার আলেম শাহাদাতের সুধা পান করলেন। আবার হাজারো আলেম গেলেন জালিমের যিন্দান খানায়।

এই তো উলামায়ে দেওবন্দ। হাতে তাসবিহ। মাথায় পাগড়ী। আবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বীর মুজাহিদ।

পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহ এক অধ্যায় রচনা করেছিল ব্রিটিশ বাহিনী। তাদের নাগপাশ থেকে মুক্তিপাওয়া সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু আলেমগণ তো বীরের জাতি। রক্ত দিয়েছেন কিন্তু ব্রিটিশদের বশ্যতা স্বীকার করেননি। জীবন চলে গেছে। তবুও হার মানেনি তারা। এই তো উলামায়ে দেওবন্দ। হাতে তাসবিহ। মাথায় পাগড়ী। আবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বীর মুজাহিদ। একদিকে ইলমে হাদীসের ময়দানে মহা সম্রাটের ভুমিকায়। খানকাতে মুরিদানদের আত্মশুদ্ধির সবক। অন্যদিকে আবার বাতিলের ময়দানে সিংহপুরুষ।

পৃথিবীর দু-চারশ বছরের ইতিহাসে যেন নজীরবিহীন। এমন বীরত্বগাঁথা কোন জামাত মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক চুতুর্মুখি খেদমতের আঞ্জাম দেওয়া কোন গোষ্ঠীকে বীরদর্পে এগোতে দেখা যাবেনা। যে এক তাহরীক গড়ে তুলেছে দেওবন্দী আলেমগণ। সেটা শত শত বছর ধরে অব্যবহিত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

গর্ব করার মত একটি গোষ্ঠি। যাদের নিয়ে গর্ব করা যায়। দেওবন্দী আলেমদের কর্মকান্ডগুলো দেখে বুকটা ভরে যায়। হরলাইনে তাঁরা মেহনত করেছেন। কোথায় তাঁরা নেই। সমস্ত জায়গায় তাঁদের অবদান লক্ষ্য করা যায়। চলনে-বলনে সব কিছুতে সেই সোনালী যুগের মানুষের কথা স্মরণ করে দেয়। হযরত সাহাবায়ে কেরাম যেমন ‘ফুরাসান ফিন্নাহারি ওয়া রুহবানাল ফিল লাইলে’ রাতে ছিল তাঁরা সন্ন্যাসী-বৈরাগী এবং দিনে অশ্বারোহী মুজাহিদ। তেমনী দেওবন্দী আলেমগণের সেরকম সিফাত বিদ্যমান। শুধু খানকাতে বসে থাকা নয়। আবার মাদ্রাসার চৌহদ্দির মধ্যেও বসে ছিল না। বরং বাতিল শক্তির মোকাবেলায় তাঁরা সিংহেরমত গর্জে উঠেছেন। বাতিল শক্তিকে পরাভুত করেছেন। আবার এমন নয়, রাজপথে গিয়ে তাঁরা খানকায় আত্মশুদ্ধির কথা ভুলে গিয়েছেন। বরং যেখানে তাঁরা গিয়েছেন, সব জায়গাতে তাঁরা বীর মুজাহিদের ভুমিকায় আবার মহান আল্লাহর সাথে গভীর রজনীতে কানাকানি করতে ভোলেননি।

পুরো পৃথিবী জুড়ে ওলামায়ে দেওবন্দ এর কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে। দ্বীনি ইলমের তাহরীক যেন বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছে। এমন কোন দেশ-মহাদেশ বাকি নেই, যেখানে দেওবন্দী আলেমদের সেই তালিমের ফলগুধারা পৌছেনি। কুরআন-হাদীসের তালীমের পাশাপাশি নৈতিক চরিত্রের উন্নতি সাধনের সংগ্রাম, সেটা যেন বিশ্ববাসীর কাছে বেশী সমাদৃত হয়েছে। একজন মানুষ আলেম হওয়ার পরে সত্যিকার মানুষরুপে গড়ে উঠতে পারে। মানুষের মত মানুষ হিসাবে সমাজে পরিচয় দিতে পারে, এরকম মিশন নিয়ে বেশী কাজ করে যাচ্ছে দেওবন্দী আলেমগণ।

আজ বিদ্যপীঠের অভাব নেই। বিশ্বজুড়ে নামকরা শিক্ষালয়। কিন্তু তার ফল ভাল আসে না। নৈতিক চরিত্রের চরম অবক্ষয়। গাদা গাদা বই পড়েও মনুষ্যত্বের কাতারে পড়ে না। যারা বড় বড় ডিগ্রি হাসিল করার পরেও সেই জাহেলীপনা রয়ে যায়। তার মোকাবেলায় দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো থেকে যেন সোনার মানুষ বের হয়। প্রতিটি দেওবন্দী মাদ্রাসা যেন একটা খানকা। লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীর পিছনে আত্মার সংশোধন করার প্রচেষ্টা অব্যহত থাকে।

পুরো বিশ্ববাসী দেওবন্দী হালকার আলেমদের খেদমতে দ্বীন ইসলামের রুহ ফিরে পাচ্ছেন।

আকাবিরে দেওবন্দের আমল, আখলাক, চাল-চলন ছিল ঈর্ষনীয় পর্যায়ের। তাদের আখলাক-চরিত্র, জ্ঞান-গরিমা দেখে মানুষ মন্তব্য করেছে, এ যেন সোনালী যুগের মানুষের একটি জামাত। তাদের এমন চরিত্র-মাধুর্যে অবাক হয়েছে বিশ্ববাসী। পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের নকশে কদমে চলার চেষ্টা করেগেছেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে তাদের দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে সরল-সঠিক রাস্তায় নিয়ে আসার প্রাণান্তর চেষ্টা করেছেন। পুরো দুনিয়ার ঘরে ঘরে যেন সেই দাওয়াত পৌছেছে। সেই মিশনকে জারি রেখেছেন। আজো পুরো বিশ্ববাসী দেওবন্দী হালকার আলেমদের খেদমতে দ্বীন ইসলামের রুহ ফিরে পাচ্ছেন।

বড় পরিতাপের বিষয়। বর্তমান জামানায় কিছু মানুষ, তাঁরা দেওবন্দী হালকায় লালন-পালন হয়েছেন। সেখানকার রুটি-রুজিতে আজ হৃষ্টপুষ্ট। কিন্তু তাদের চাল-চলন কাজকর্মগুলোতে আকাবির –আছলাফের কোন নীতি আদর্শের ছোঁয়া খুজেঁ পাওয়া যায় না। বরং এখন যেন তাঁরা দেওবন্দী হালকার মুরুব্বীদের নজরিয়্যা থেকে বাইরে অবস্থান করছেন।

কথায় কাজে এখন আর আকাবিরদের দর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। বাতিল শক্তির সাথে তাঁরা মিলে গেছে। আমাদের মুরুব্বীগণ যেখানে আজীবন বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন,তাঁরা দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের জন্য বাতিলের সাথে হাত মিলিয়েছে। দেওবন্দী মাদ্রাসায় বসে আকাবির-আছলাফদের খেলাফ চলাফেরা। এমনকি মুরুব্বীদের ব্যাপারে সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেনা। যেটা বড় নিন্দনীয়।

তবে আমার কথা হলো, উলামায়ে দেওবন্দ এর যে অবদান, তাঁদের যে খেদমত, তাঁদের মাধ্যমে আমরা আলোর পথ দেখেছি, সুতরাং এই হালকার বিকল্প চিন্তা আসা নিজের পায়ে কুঠারাঘাত ছাড়া আর কিছু নয়। শত-ঝড়-ঝঞ্জার মাঝেও আমরা আকাবির-আছলাফের চিন্তা-চেতনা আঁকড়ে ধরব। এঁরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী জামাত। আমরা তাদের বাতলানো পথে চলব। বাতিলের সাথে কভু হাত মেলাব না। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে কবুল করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: আমার স্বপ্নপুরুষ যিনি, আমি তাঁর গল্প বলি

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com