৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২০শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আয়রণ ও খনিজ লবণ

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আয়রণ ও খনিজ লবণ

জিনাত রহমান : সুস্থ থাকার জন্য বিশুদ্ধ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। মা ও শিশুসহ সব বয়সের মানুষের জন্য পরিমিত মাত্রায় এমনভাবে খাবার নির্বাচন করা দরকার যাতে খাদ্যের সবগুলো গুণই বিদ্যমান থাকে। খাদ্যের ৬টি উপাদান থাকে। এ ৬টি উপাদান হলো: শর্করা, আমিষ, স্নেহ, খনিজ লবণ, ভিটামিন এবং পানি। এর কিছু উপাদান শরীর গঠন করে, কিছু শরীরকে রক্ষা করে, কিছু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আবার কোনো কোনটি রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে।

শরীর গঠনে যেসব খাদ্য সাহায্য করে তা হলো প্রোটিন, ফ্যাট এবং শর্করা। আর যে বিশেষ উপাদানটি শরীরের শক্তি সামর্থকে বৃদ্ধি করাসহ আমাদেরকে নানা রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা করে, তা হলো খনিজ লবণ। খনিজ লবণ শরীরের জন্য খুবই দরকারী উপাদান। ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি খনিজ লবণ বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি ও ফলে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। এজন্য মানবদেহে খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবার জানা প্রয়োজন।

আয়রণের অভাব হলে শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। এতে ফুসফুস ঠিকমত অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না। এই আয়রণ রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিন নামে উপস্থিত থাকে। ফুসফুস থেকে শরীরের কোষে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পৌঁছালে রক্ত দূষিত হয়ে পড়ে। ফলে নানা ধরণের রোগ-ব্যাধির সংক্রমণ ঘটে। মাথা ঘোরা, ক্ষুধামান্দ্য, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, চোখে হলুদ ভাব দেখা দেয় এর ফলে। এছাড়া চোখের পাশে কালি পড়াও আয়রণের অভাবে হয়ে থাকে।

তাই হিমোগ্লোবিনের অভাব পূরণ করতে যেসব খাবারে আয়রণ রয়েছে সেসব খাবার নিয়মিত গ্রহণ করা দরকার। টমেটো, গাজর, মটরশুঁটি, পালংশাক, ডিম, মাছ, কলিজা, আম, কলা, আলুসহ কিছু শুকনো ফল যেমন খেজুর, বাদাম, কাজু বাদাম ইত্যাদি খাবারে প্রচুর আয়রণ রয়েছে।

দুধ, ডিম, পনীর, বাদাম, সবুজ শাক-সবজি এবং ফলের মধ্যে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। শরীরের দাঁত এবং হাড় মজবুত রাখতে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। শিশুদের শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব ঘটলে তাদের হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শরীরের বিকাশ স্বাভাবিকভাবে হয় না। আমরা অনেকেই জানি না ক্যালসিয়ামের অভাব হলে এর প্রভাব শিশুদের স্মরণশক্তির ওপরেও পড়ে। এর অভাবে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। গর্ভাবস্থায় মায়েদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এসময় ক্যালসিয়ামের অভাব হলে গর্ভস্থ সন্তানের অস্থি দুর্বল হয়ে যায়। ক্যালসিয়ামের অভাব বেশি হলে আলাদাভাবে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়ার প্রয়োজন হয়।

যেসব খাবারে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়, সেগুলো থেকেই সহায়ক পদার্থ হিসেবে ফসফরাস পাওয়া যায়। এটাও শিশুদের হাড়ের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সবুজ শাক-সবজি, দুধ, বিশেষ করে মাছের মধ্যে ফসফরাস বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়।

আয়োডিন আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বিষয়টিকে আমরা কমই গুরুত্ব দিয়ে থাকি। থাইরয়েড হরমোন এবং হজম বা পরিপাক ক্রিয়ার জন্য এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। আয়োডিনের অভাব হলে শারীরিক বৃদ্ধি বা গঠনে বড় ধরণের প্রভাব পড়ে। গলগ- বা হাবাগোবা রোগ আয়োডিনের অভাবে হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই, কী পরিমাণ আয়োডিন আমাদের শরীরের জন্য দরকার বা কোন খাবারে তা পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে গবেষণায় যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্গারেট রেম্যান দেখতে পেয়েছেন, আধুনিক অনেক স্বাস্থ্যকর খাবারেও আয়োাডিনের ঘাটতি রয়েছে, যা বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝূঁকি তৈরি করতে পারে।

কথায় আছে, যদি সুস্থ থাকতে চান, আয়োডিন যুক্ত লবণ খান। দেহের সুস্থতা, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ এবং গলগন্ড রোগ প্রতিরোধে আয়োডিন একটি বিশেষ উপকারি খাদ্য উপাদান, বিশেষত বাড়ন্ত শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্যে আয়োডিনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবার লবণে আয়োডিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ পরীক্ষা করাও কিন্তু বেশ সহজ। ভাতের সাথে কিছুটা লবণ আর লেবুর রস মিশিয়ে ভালো করে মাখালে যদি তা বেগুনী রঙ ধারণ করে তবে বুঝতে হবে এতে আয়োডিন আছে। বেগুনী রঙ না হলে বোঝা যাবে এতে আয়োডিন নেই। এখন খাবার লবণে আয়োডিন আছে কি নেই, তা পরীক্ষা করার পরিবর্তে আয়োডিনযুক্ত খাবারগুলো খেলেই বেশি ভালো হয়। এতে উপকার অনেক বেশি। আমরা অনেকেই আয়োডিন যুক্ত খাবারের উৎস সম্পর্কে জানি না। প্রধাণত ৮টি খাবার আয়োডিনে ভরপুর থাকে। এগুলো হলো- দুধ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ টুনা, সেদ্ধ ডিম, টকদই, কলা, স্ট্রবেরে এবং ভুট্টা। কাজেই শুধুমাত্র আয়োডিন যুক্ত লবণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ ও ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন। সুস্থ থাকতে এর কোনো বিকল্প নেই।

একটি সুস্থ শিশু জন্মদানে গর্ভাবস্থায় মায়ের যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা দরকার। এতে গর্ভস্থ শিশুর বিকাশ যেমন স্বাভাবিক হয়, তেমনি জন্মের পরও শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। এক্ষেত্রে জন্মের পর শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাছাড়া সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে গর্ভাবস্থায় মায়েরও দরকার যথেষ্ট পরিমাণে খনিজ লবণ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। এর অভাবে রক্ত শূন্যতাসহ নানা ধরনের জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার ফলে মা ও শিশু, উভয়ের জীবনই বিপন্ন হতে পারে। তাই সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের জন্য সব বয়সী মানুষের বিশেষ করে বাড়ন্ত শিশু ও গর্ভবতী মায়ের খাদ্য তালিকায় আয়োডিন যুক্ত লবণের পাশাপাশি দুধ, ডিম, কলিজা, সামুদ্রিক মাছ, বাদাম, কলা, ভুট্টা, গাজর, পালংশাক, শিম, মূলাসহ সবুজ শাক-সবজি ও ফল থাকা দরকার। আমাদের নিজেদের সুস্থতা বজায় রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই। কাজেই এ বিষয়ে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com