১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

হিজরি নববর্ষের তাৎপর্য ও ঐতিহ্য

  • মুফতি আব্দুল মুহাইমিন

হিজরত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হিজরত শব্দটির একটি সাধারণ অর্থ রয়েছে। হিজরতের সাধারণ অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো বস্তু স্থান বা ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করা, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। এ অর্থেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন। হিজরতের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা থেকেই হজরত ওমর (রা.) তাঁর খিলাফত-কালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে হিজরি সন গণনা শুরু করেন। প্রেক্ষাপট ছিল এমন-

হজরত ওমর (রা.) এর কাছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চিঠি আসত। সেখানে মাসের নাম ও তারিখ লেখা হতো কিন্তু সন থাকত না। এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) একটি পত্রে ওমর (রা.) এর কাছে অভিযোগ করেন, ‘আপনি আমাদের কাছে যেসব চিঠি পাঠাচ্ছেন তাতে কোনো সন উল্লেখ নেই যে কারণে আমাদের অনেক সমস্যা হয়।’

তা ছাড়া সুপ্রসিদ্ধ আল ফারুক গ্রন্থে উল্লেখ আছে হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে ১৬ হিজরির শাবান মাসে তাঁর কাছে একটি দাফতরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়। পত্রটিতে মাসের উল্লেখ থাকলেও সনের উল্লেখ ছিল না। তীক্ষ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফা জিজ্ঞাসা করেন পরবর্তী কোন সময়ে কীভাবে বোঝা যাবে যে এটি কোন সনে তাঁর সামনে পেশ করা হয়েছিল? এ প্রশ্নে কোনো সদুত্তর না পেয়ে হজরত ওমর (রা.) সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে এক পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। তখন পরামর্শের ভিত্তিতে একটি সন নির্ধারণ ও গণনার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন উপলক্ষ থেকে সন গণনার মতামত এলেও শেষ পর্যন্ত হিজরতের ঘটনা থেকেই সন গণনার সিদ্ধান্ত হয়। সন গণনার আলোচনার সময় প্রস্তাব এসেছিল ইসলামী সনের সূচনার সঙ্গে মিল রেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সন থেকে ইসলামী সনের সূচনা হওয়ার।

এ রকম আরও কিছু কিছু উপলক্ষের কথাও আলোচিত হয়। কিন্তু হিজরতের সন থেকে সন গণনা চূড়ান্ত হওয়ার পেছনে তাৎপর্য হলো হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে হিজরতের পর থেকেই মুসলমানরা প্রকাশ্যে ইবাদত ও সমাজ গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন।

প্রকাশ্যে আজান, নামাজ, জুমা, ঈদ সবকিছু হিজরতের পরই শুরু হয়েছে। এসব তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য করেই মুসলমানদের সন গণনা হিজরত থেকেই শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলী (রা.) আর তৎকালে আরবে অনুসৃত প্রথা অনুযায়ী মহররম মাস থেকেই ইসলামী বর্ষ শুরু (হিজরি সন) করার এবং জিলহজ মাসকে সর্বশেষ মাস হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ দেন হজরত উসমান (রা.)। তা ছাড়া মহররমকে হিজরি সনের প্রথম মাস নির্ধারণের পেছনে আল কোরআনের একটি নির্দেশনাও গুরুত্ব পেয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হইতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি; তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান’। [সূরা তাওবা – ৩৬]

আল কোরআনে চারটি মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ চারটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। মহররমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের ইচ্ছা ঘোষণা করায় ও চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হওয়ায় তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষে আমাদের দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। আরবি নববর্ষের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য থাকা সত্ত্বেও উল্লেখ করার মতো কোনো কর্মসূচি পালন করা হয় না। যার কারণে আমরা অনেকেই অবগত নই কোন মাসে হিজরী নববর্ষ। অথচ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এই হিজরী তারিখের উপর নির্ভরশীল। যেমন- রোজা, ঈদ, হজ, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল বরাত, আশুরাসহ সকল ধর্মীয় উৎসব পালন করতে হয়।

হিজরী তারিখ চাঁদের হিসেবের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্রমাস ২৯ ও ৩০ দিনে হয় বিধায় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে বর্ষ পূর্ণ হয়। তাই চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষে সাধারণত ১০ বা ১১ দিনের পার্থক্য হয়। এ মাসগুলো আরবি হলেও গোটা মুসলিম উম্মাহর সন হিসেবেই তা গ্রহণ করতে হবে। ইসলাম সর্বক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহকে সর্বোচ্চ আদর্শ, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়েছে। হিজরী নববর্ষ কিভাবে উদযাপন করবে তার সর্বোত্তম শিক্ষাও ইসলাম দিয়েছে।

নতুন বছর বা নতুন মাস শুরু করার ইসলামী নীতি এবং সুন্নত পদ্ধতি হলোঃ নতুন মাসের চাঁদ দেখার বিশেষ গুরুত্ব দেয়া। এটা বিশ্ব নবী (সা.) এর সুন্নত। আর যখন চাঁদ দেখবে তখন নতুন চাঁদ দেখার দোয়া পড়বে। এই সুন্নত পদ্ধতিতে বরকত, হেফাজত এবং সাওয়াব রয়েছে। আর সমস্ত কুসংস্কার এবং অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকবে। দোয়াটি হলো:

أللهم أهله علينا بالیُمْنِ والإِیْمَانِ والسَّلامَةِ والإِسلامِ، ربِّيْ ورَبُّك الله

(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-য়ুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।)

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে সৌভাগ্য ও ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। (হে চাঁদ) আল্লাহই আমার ও তোমার রব।’

নবী করিম (সা.) চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাসের জন্য কল্যাণের দোয়া করেছেন। দোয়ার প্রতিটি শব্দ দ্বারা শান্তি ও নিরাপত্তার আবেদন করা হয়েছে। ছোট্ট একটি দোয়াতে নবী করিম (সা.) আল্লাহ তায়ালার কাছে অনেক কিছু প্রার্থনা করেছেন। নবী করিম (সা.) প্রত্যেক মাসের নতুন চাঁদ দেখে এ দোয়া পড়তেন।

আমরা দুনিয়ার বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার জন্য, নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে থাকি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি মাসের শুরুতে আল্লাহ তায়ালার কাছে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতেন। এজন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত, প্রতি মাসের শুরুতে নিজেকে ভালো কাজের জন্য প্রস্তুত করা এবং চাঁদ দেখা কমিটির দিকে না তাকিয়ে নিজেই এই সওয়াবের অংশিদার হওয়া। চাঁদ দেখার সুন্নতের ওপর আমল করা।

হিজরী সন মুসলমানদের সন। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। এক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। ইসলামী ফিকাহবিদগণ চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কিফায়া বলেছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ এর খবরা-খবর রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায় তাহলে প্রত্যেকে গুনাহগার হবে। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই, চান্দ্রমাসের হিসাবের অনুসরণ নবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাত। যাদের অনুসরণ আমাদের জন্য পুণ্যময় ও কল্যাণকর আমল।

হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, সৌর হিসাব রাখা ও ব্যবহার করা একেবারেই নাজায়েজ নয়। বরং এই এখতিয়ার থাকবে, কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, জাকাত, ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সৌর হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু শর্ত হলো, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। এমন যাতে না হয়, শুধু জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ছাড়া অন্য কোনো মাসই তার জানা নেই।

হিজরী নববর্ষে মুসলমানরা কোনো আনন্দ উৎসব করবে না, তবে নবী (সা.) ও তার সর্বস্তরে ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক, আল জামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, হাড়িনাল, গাজীপুর

আরও পড়ুন: সন্তানের জন্মে পরিবারের দায়িত্বঃ ইসলামী দিকনির্দেশনা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com