পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ডিভাইড অ্যান্ড রুল। এই নীতি কাজে লাগিয়ে এদেশের মানুষকে শাসন ও শোষণ করেছিল ব্রিটিশ শাসকরা। স্বাধীনতার সাত দশক পরে সেই একই নীতির ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলিমকে ভাগ করার চক্রান্ত চলছে। এই জাতীয় প্রেক্ষাপটে সংহতির সঙ্গে হিন্দুস্তান জিন্দাবাদের স্লোগান, জাতীয় পতাকায় ছয়লাপ পার্ক সার্কাস ময়দান– আর দারুল উলূম দেওবন্দের সিনিয়র মুহাদ্দিস ও জমিয়তে উলামা হিন্দের সভাপতি মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানীর দৃঢ়চিত্ত দিল-স্পর্শী ভাষণ রোববারের (১২ জানুয়ারি) দিনটিকে পরিণত করল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, এনআরসি, এনপিআর-এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। বাংলাতেও আছড়ে পড়েছে তার লহর। ইস্যুটি নিয়ে গ্রাম-গঞ্জ থেকে কলকাতার রাজপথ মিছিল, সমাবেশ চলছে লাগাতার। তবে রোববার পার্ক সার্কাস ময়দানে জমিয়তে উলামা হিন্দের আয়োজনে যে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হল, তা যেন ছাপিয়ে গেল আগের সবগুলিকেই।
বহু মুসলিম যুবককে অন্যায় ভাবে সন্ত্রাস বা অন্য অজুহাতে গ্রেফতার করে বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হয়। তাদের জন্য বার বার লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন মাওলানা আরশাদ মাদানী।
কালাকানুন সিএএ-এর বিরুদ্ধে এদিনের সভা ছিল সংবিধান রক্ষা ও জাতীয় সংহতির সমাবেশ। হিন্দু-মুসলিম-দলিত-খ্রিস্টান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব অতিথি-বক্তা ও হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে পার্ক সার্কাস ময়দান হয়ে উঠেছিল বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় নাগরিকদের মহাশপথের সমাবেশ। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম-মফসসল থেকে যেমন সাধারণ মানুষরা হাজির হয়েছিলেন, তেমনি বিশিষ্ট অতিথি বক্তারাও এসেছিলেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জমিয়তে উলামা হিন্দের সর্বভারতীয় সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানী। অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথি-বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, মহন্ত সত্য নামদাস, দলিত নেতা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস, সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, বাগ্মী ও ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ গোলাম আহমাদ মোর্তজা, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি, পাদ্রি জিতেন্দ্র সিং প্রমুখ।
সিএএ-এনআরসি-এনপিআর বিরোধী এই সমাবেশের প্রধান বক্তা ছিলেন মাওলানা আরশাদ মাদানী। অশীতিপর এই জননেতার কথা শোনার জন্য আকুল হয়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন উপস্থিত জনতা। শাইখুল ইসলাম, স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-এর সুযোগ্য পুত্র হিসেবেই নয়, মুসলিমদের প্রকৃত নেতা হিসেবে সারা জীবন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান এদিন তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে জানান, ‘বহু মুসলিম যুবককে অন্যায় ভাবে সন্ত্রাস বা অন্য অজুহাতে গ্রেফতার করে বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হয়। তাদের জন্য বার বার লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন মাওলানা আরশাদ মাদানী। আইনজীবী নিয়োগ করে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করে জেল থেকে বের করেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ দেখেন না। অসমে এনআরসির পর ডি-ভোটার হয়ে যাওয়া হাজার খানেক হিন্দুকে (মুসলিমদের সংখ্যার চেয়ে বেশি) তিনি আইনি সহায়তা দিয়ে ডিটেনশন সেন্টারের বন্দিজীবন থেকে বাঁচিয়েছেন।’
সভায় নিজের বক্তব্যেও এ তথ্য তুলে ধরেন মাওলানা আরশাদ মাদানী। জমিয়তের সর্বভারতীয় সভাপতি আরশাদ মাদানী স্বাধীনতা ও দেশগঠনে জমিয়তের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা বক্তব্যের প্রথমেই উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘জমিয়তে উলামা হিন্দ ১০০ বছর ধরে সংহতির জন্য কাজ করছে। স্বাধীনতার সময় দেশভাগের বিরোধিতা করেছে জমিয়ত।’
এ দিনের সমাবেশে জাতীয় সংহতির কথা বার বার উঠে এসেছে বক্তাদের বক্তব্যে। মাওলানা আরশাদ মাদানী এ বিষয়ে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশের ভেতরে একটি অপশক্তি ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়েছে। আর তারই ফলস্বরূপ বিজেপি ক্ষমতার মসনদে। তারা ক্ষমতায় এসেই অসমে এনআরসি করে সেখানে ১৯ লক্ষ মানুষকে ‘রাষ্ট্রহীন’ করেছে। শুধু মুসলিমরা নয়, হিন্দু, দলিতরাও এর ফল ভোগ করছেন।’
বিজেপি সরকারের জনবিরোধী সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত ও ঘৃণার রাজনীতিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য পরাজিত করেছে।
অসমে এনআরসির দুর্ভোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওখানেই ১৯ লক্ষ বাদ পড়েছে নাগরিকপঞ্জির তালিকা থেকে, তাহলে সারা ভারতে এনআরসি হলে কী হবে বুঝতে পারছেন!’ সংঘ পরিবার এই সিএএ-এনআরসি ইস্যুটিকে মুসলিমদের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে একে একঘরে করার চেষ্টা করছে। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মাদানী জানান, ‘এটি তামাম হিন্দুস্তানের সমস্যা। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান নিজেকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেও ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।’ সংঘ-পরিবারের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্থানে সেই সেকুলার দেশ হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সারা দেশে এনআরসি-এনপিআর বিরোধিতার ময়দান হিন্দু-মুসলিম জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তা উল্লেখ করে মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, ‘বিজেপি সরকারের জনবিরোধী সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত ও ঘৃণার রাজনীতিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য পরাজিত করেছে।’ সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করার জন্য বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। প্রশংসা করেন কেরলেরও। তাঁর বক্তব্যে বার বার ভারতের ‘সেকুলার’ চরিত্রের ক্রমাবনতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, ‘জনতা রুখে দাঁড়ালে বিভেদকামী শক্তি অবশ্যই পিছু হটবে। ঝাড়খণ্ডের জনগণ ওদের ছুড়ে ফেলেছে। দেশের সব জায়গাতেই এমন হবে।’
এদিনের সভার আরেক আকর্ষণ ছিলেন সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব। এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনে দেশের নানা জায়গায় তিনি উপস্থিত থাকছেন। পার্ক সার্কাস ময়দানের সভায় তিনি স্বাধীনতার জন্য জমিয়ত তথা মুসলিমদের লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে মোদির নাম না নিয়ে বলেন, ‘আজ যিনি কলকাতায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁর দলের পূর্বপুরুষরা স্বাধীনতার জন্য একবিন্দু রক্ত দেয়নি। আজ তারাই ঠিক করে দিতে চাইছে কে স্বাধীন দেশের নাগরিক হবে।’
মোদিজি, আপনি স্বামীজির বিরুদ্ধে লড়ছেন। আপনি পোশাক দেখে প্রতিবাদকারীদের চেনা যায় বলেছেন। আপনি টুপি দেখেন, বোরকা দেখেন। কিন্তু আজকের এই সভায় আমি তো জাতীয় পতাকা দেখছি শুধু।
রোববার ছিল ১২ জানুয়ারি, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। বিবেকানন্দ সেই ভারতবর্ষের জন্য গর্ববোধ করতেন, যেখানে বিশ্বের যে-কোনও জায়গা থেকে আসা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষ আশ্রয় পায়। কিন্তু নয়া নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে বিজেপি সরকার নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনও দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের ঠাঁই দিচ্ছে না। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ থেকে মুসলিমরা এলে নাগরিকত্ব পাবে না। ‘এই আইন শুধু সংবিধান-বিরোধী নয়, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও বিশ্বাসেরও বিরোধী’ বলে তোপ দাগেন যোগেন্দ্র যাদব। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, ‘মোদিজি, আপনি স্বামীজির বিরুদ্ধে লড়ছেন। আপনি পোশাক দেখে প্রতিবাদকারীদের চেনা যায় বলেছেন। আপনি টুপি দেখেন, বোরকা দেখেন। কিন্তু আজকের এই সভায় আমি তো জাতীয় পতাকা দেখছি শুধু।’ এনপিআর-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন দীর্ঘদিন যাবত চালিয়ে যেতে হবে, উপস্থিত জনতার কাছে এই আহ্বান জানান তিনি।
রাজ্যসভার সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান বিজেপি তথা মোদি-শাহের এই বিভাজন নীতির বিরুদ্ধেই সরব হন তাঁর বক্তব্যে। দেশের উন্নয়নের কথা বা গরিবি-বেকারত্বের কথা তুললেই বিজেপি ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে তাকে পাকিস্তান পাঠাতে চায়। বার বার পাকিস্তান প্রসঙ্গ আসে মোদি-শাহের বক্তব্যে। এদিন এই ‘পাকিস্তান’কেই হাতিয়ার করেন ইমরান। তিনি আক্রমণ করে বলেন, ‘তোমরা পাকিস্তানের দালাল নাকি? আমরা কেউ পাকিস্তান যাব না। তোমাদের প্রিয়, তোমরাই যাও।’ তিনি যুবসমাজের উপর আস্থা রেখে বলেন, ‘ছাত্র-যুবারাই ভারতকে রক্ষা করবে আর বিজেপিকে পাকিস্তানে পাঠাবে।’ গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে হস্টেলে ঢুকে পড়ুয়াদের মারা হচ্ছে, সেটা কীভাবে সম্ভব, তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি নিজেই এর উত্তরে বলেন, ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। মোদির শাসনেই এমন অরাজকতা সম্ভব। বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও বলে মোদিজি স্লোগান দেন। আর তার পুলিশই জেএনইউতে ঢুকে বাঙালি ছাত্রী ঐশী ঘোষকে রক্তাক্ত করল। বিজেপি সবকা সাথ, সবকা বিকাশের কথা বলে। উত্তরপ্রদেশের ৪০৩ আসনযুক্ত বিধানসভায় কোনও মুসলিম বিধায়ক নেই। লোকসভায় বিজেপির কোনও মুসলিম সাংসদ নেই। ইউপিতে পুলিশ সংখ্যালঘুদের উপর বর্বরতা চালাচ্ছে। এই ওদের সবকা সাথ, সবকা বিকাশ।’
উত্তরপ্রদেশের চার্চগুলিতে খ্রিস্টানদের উপর হামলা চালিয়েছে পুলিশ। খ্রিস্টান বলে নাকি আমরা এ দেশে থাকতে পারব না, এমন হুমকিও পেয়েছি।
এদিনের সভায় ‘বক্তাসম্রাট’ নামে খ্যাত গোলাম আহমাদ মোর্তজা সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘দেশভাগের জন্য শুধু জিন্নাহকে অনেকে দায়ী করেন। কেউ একা দেশভাগ করতে পারে? এই ভারতবর্ষ একসময় বিশাল বড় একটি অঞ্চল ছিল। পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ তৈরি হয়েছে ভারতবর্ষ ভেঙে। বিজেপি আরও ভাগ করে দেশটাকে টুকরো টুকরো করতে চাইছে।’ মুম্বই থেকে আগত মাতাঙ্গার উদাসীন আশ্রমের মহন্ত সত্য নামদাস বিজেপি-সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘সাদা ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু কালো ইংরেজরা রয়ে গেছে। এদেরকেও তাড়াতে হবে।’ মহন্ত নামদাস এদিন উচ্চকণ্ঠে হামদ (আল্লাহু আল্লাহু…) পেশ করেন সমবেত জনতার সামনে। পশ্চিমবঙ্গ জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক ক্বারী শাসসুদ্দিন আহমাদ রাজ্য সরকারের কাছে দাবি জানান, ‘বিধানসভায় সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধে বিল পাস করাতে হবে।’ মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘মুসলিমরা বিজেপিকে ভয় পায় না। ভয় পায়নি বলেই ব্রিটিশদের তাড়াতে পেরেছে।’ ‘বিভাজনকারী মোদিকেও তাড়াব’ বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। পাদ্রি জিতেন্দ্র সিং জানান, ‘উত্তরপ্রদেশের চার্চগুলিতে খ্রিস্টানদের উপর হামলা চালিয়েছে পুলিশ। খ্রিস্টান বলে নাকি আমরা এ দেশে থাকতে পারব না, এমন হুমকিও পেয়েছি।’
জমিয়তের এ দিনের সভায় এ ছাড়াও হাজির ছিলেন ক্বারী ফজলুর রহমান, রাজ্য জমিয়তের সভাপতি মুফতি দবীর হুসেন, শিয়া নেতা হাসান মাহদী, উত্তরপ্রদেশ জমিয়তের সভাপতি আশহাদ রশিদি, আদিবাসী মুক্তি মোর্চার বীরেন্দ্র মাহাতো, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সদস্য আবু তালিব রহমানী, জামাআতে ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি আবদুর রফিক, অল ইন্ডিয়া আহলে সুন্নাত আল জামাতের সম্পাদক আবদুল মাতীন, মাওলানা সৈয়দ হাসান মাদানী, রাজনীতিবিদ নির্বেদ রায়, সমাজসেবী ইশতিয়াক আহমেদ রাজু, ওয়ালি রহমানি প্রমুখ।
– ভারত থেকে গোলাম রাশিদ


