হুইল চেয়ারে বসেও রাজপথে যাকে পেয়েছি
মাওলানা আমিনুল ইসলাম :: আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী সাহেবের বয়ান শুনেছিলাম রাজধানীতে। খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এক ইসলামী মহা সন্মেলনে তাঁর জ্ঞান গর্ভ আলোচনায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। এরপর আর কখনো কোন সন্মেলনে সরাসরি বয়ান শুনবার সুযোগ হয়নি। তবে অনলাইনে খোঁজ রাখতাম সবসময়। বিভিন্ন নিউজের মাধ্যমে তাফাজ্জুল হক সাহেবের আলোচনা শুনেছি বহুবার। অনেক ওলামায়ে কেরামের মুখে তাঁর প্রশংসা , গুণকীর্তন করতে দেখেছি।
আল্লামা তাফাজ্জুল হক সাহেব একজন তুখোড় আলেম ছিলেন এটা সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর ইলমী মাকাম ছিল অনেক উচ্চতায়। যেমন আলেম আবার সুবক্তা। মাদ্রাসার খেদমতের পাশাপাশি সাধারণ জনতার মাঝে ইসলাহী প্রোগ্রাম করে বেড়াতেন। বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের বিভিন্ন জায়গাতে তাঁর পদচারণা ছিল। মানুষের মাঝে কুরআন হাদীসের অমীয় বাণী তুলে ধরতেন।
তাঁর বক্তৃতার মাঝে ফুটে উঠত, জ্ঞানের গভীরতা। সাধারণ কোন ওয়ায়েজ তিনি ছিলেন না। ব্যাপক লেখাপড়া আর গবেষণাধর্মী বক্তৃতা ছিল তাঁর। কেচ্ছা কাহিনী আর স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া নয়। স্বাচ্ছা কথার প্রবক্তা ছিলেন তিনি। কাউকে সমীহ করা নয়। কাউকে ভয় পাওয়া নয়। নির্ভয়ে আলোচনা করে যেতেন।
আপোসহীন এক মর্দে মুজাহীদ ছিলেন তিনি। বাতিলের কন্ঠ রোধ করে দিতেন তাঁর হুঙ্কারে। হক- হক্কানিয়্যাতের উপর অটল অবিচল সব সময়। কখনো কোন বাতিলের সাথে আপোস করেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সত্যের ওপর অনড় থেকেছেন।
এই মহান ব্যক্তির এমন জযবা ছিল, বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন শেষ জীবনে। কিন্তু তাঁর ঈমানী স্প্রিরিট ছিল প্রখর। পরিণত বয়সে তিনি রাজপথে বাতিলের মোকাবেলা করেছেন বীর পুরুষের মত। বিন্দু পরিমাণ কাবু হননি। বরং তাঁর ঈমানী শক্তি আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল শতগুণ।
আল্লামা তাফাজ্জুল হক সাহেবকে দেখেছি, রাজপথে তিনি হুইল চেয়ারে বসে নেমে পড়েছেন। হাঁটতে পারেন না, তবুও পিছপা হননি। বাতিলের মোকাবেলা করার জন্য জীবনের সর্ব শক্তি ব্যয় করেছেন। হুইল চেয়ারে বসে রাজপথে মিছিলের অগ্রভাগে তাঁকে দেখা যেত। এক বে- মেছাল দৃষ্টান্ত ছিল এটা। যিনি হুইল চেয়ারে পরনির্ভরশীল। তিনি আবার রাজপথে মিছিলের অগ্রভাগে। তাও আবার সাধারণ কোন মিছিল নয়। বাতিল শক্তির মোকাবেলার কর্মসূচি। তবুও তাঁকে দেখা যেত সবার আগে।
এত বড় একজন আলেম এবং শায়খুল হাদীস। আবার তিনি বড় শায়েখ। ইচ্ছে করলে খানকায় বসে বসে জীবন কাটাতে পারতেন। খানকায় থাকলে নজর- নেওয়াজেরও অভাব হত না। কিন্তু তিনি খানকায় বসে থাকেননি। মাদ্রাসার চার দেয়ালের মধ্যে তাঁর জীবন কাটিয়ে দেননি। তিনি ছিলেন রাজপথে বীরের বেশে। বয়সের কারণে দুর্বল হলেও তিনি ঈমানী চেতনায় ছিলেন মর্দে মুজাহিদ।
একজন ব্যতিক্রম ধর্মী ব্যক্তিত্ব। যিনি ছিলেন অনন্য। গুণী আলেম এবং মুজাহিদে মিল্লাত। উম্মতে মুসলিমার রাহবার। পুরো জীবনটা আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ করার মিশন নিয়ে কাজ চালিয়েছেন। কখনো কোন দ্বীনি কাজে পিছু হটেননি।
সেই মহান ব্যক্তিটি বিদায় নিলেন। মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


