অটিজম বিষয়ে সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে

অটিজম বিষয়ে সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক ● সমগ্র বিশ^ জুড়েই আছে অটিজম। পুরো বিশ্বেই অটিস্টিক শিশু জন্ম গ্রহণ করছে। তবে অটিস্টিক শিশু জন্মের জন্য বাবা-কিংবা মা দায়ী নয়। এটা আসলে হয়ে থাকে কিছু শারিরীক সমস্যার কারণে। অথচ আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমজে অনেক সময়ই এ জন্য অর্থাৎ অটিস্টিক শিশু জন্মের জন্য মাকে দায়ী করার কুসংস্কার চালু আছে। তেমনই কুসংস্কারের শিকার নগরীর উত্তরার বাসিন্দা সুরিয়া বেগম।

গুরিয়া বেগমের দুই সন্তান জাহেদ (৮) ও জায়েদ ( ৫)। প্রথম সন্তান জাহেদের জন্ম হয় কিছু শারিরীক এবং মানসিক সমস্যা নিয়ে। পরবর্তীতে জানা যায় জাহেদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ রয়েছে। এরপর থেকেই শুরু হয় শ্বশুড় বাড়ীর নির্যাতন। পরিবারের অন্যদের মত সুরিয়ার ব্যবসায়ী স্বামীও তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে থাকে। এমনকি জাহেদের সাথেও খারাপ ব্যবহার করে।

পরিবারের কাছ থেকে এমন খারাপ আচরণ পাওয়া সুরিয়া বলেন, এই অটিস্টিক বাচ্চাটিকে নিয়ে খুবই খারাপ সময় যাচ্ছে আমার। আমার স্বামী আর তার পরিবার সবসময় এই বাচ্চার জন্য আমাকে দোষারোপ করে। তাদের মতে আমার দোষের কারনেই এই ধরনের সমস্যা নিয়ে জাহেদের জন্ম হয়েছে। কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না আমার সমস্যাটা কোথায়?

কথাগুলো যখন বলছিলেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন সুরিয়া। তিনি বলেন তারা শুধু আমার সাথেই খারাপ আচরন করে না। আমার সন্তানের সাথেও দুর্ব্যবহার করে।

তিনি বলেন অটিজম সম্পর্কে আমার ভাল ধারনা থাকলেও আমার স্বামী আর তার পরিবার এ বিষয়ে মোটেই সচেতন নয় । যার ফলে তারা আমার ছেলেটার সাথে খারাপ আচরন করে।

শুধু সুরিয়া বেগম নয় তার মত আরো অনেক মাকেই প্রতিনিয়ত সহ্য করে যাচ্ছে অমানবিক এই নির্যাতন। শুধুমাত্র পরিবার নয়, সমাজের অনেকেই এসব শিশু এবং তাদের মা‘দের প্রতি করে যাচ্ছে মানসিক নির্যাতন।

আর এই অটিজম বিষয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতন দিবস‘।

পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে ১৫০ জন শিশুর মধ্যে অন্তত একজনের জন্ম হয় অটিজমের সমস্যা নিয়ে। ব্রেইনের নিউরো সমস্যার কারনে তাদের বুদ্ধির বিকাশ ব্যহত হয়। এবং তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা যায়। এর ফলে এসব শিশুরা বেড়ে উঠার সাথে সাথে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকে।

অটিজম বিষয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের মধ্যে এখনো অটিজম সম্পর্কে ভুল ধারনা রয়েছে। মানসিক সমস্যাকে তারা মনে করে কলঙ্ক। এছাড়াও তাদের এসব কুসংস্কারের ফলে ব্যহত হচ্ছে অটিজম বিষয়ে প্রচার করা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার‘ (এএসডি)।

বিগত পাঁচ বছরে অটিজম বিষয়ে এই কুসংস্কার দূরীকরণের ক্ষেত্রে সরকার অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এছাড়াও এএসডি বিষয়ে নিয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।

সচেতনতামূলক প্রচারনার অংশ হিসেবে ২০১০ সালে গড়ে তোলা হয়েছে ‘সেন্টার ফর নিউরো ডেভেলপমেন্ট এন্ড অটিজম ইন চিলড্রেন‘ (সিএনএসি)।

২০১১ সালে বাংলাদেশ আয়োজন করে আন্তর্জাতিক সমাবেশ ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার্স এন্ড ডেভেলপম্যান্ট ডিসএ্যাবিলিটিস ইন বাংলাদেশ এন্ড সাউথ এশিয়া‘। সেখানে এএসডি সংক্রান্ত ঢাকা ডিক্লারেশ‘কে অনুমোদন করে সাতটি অংশগ্রহণকারী দেশ।

অটিস্টিক শিশু‘র প্রাথমিক পরিচর্যা করতে হয় বাবা-মাকে। এতে করে তারা বাবা-মায়ের কাছ প্রাথমিক শিক্ষা পায় । বাবা-মা‘ই পারে তাদের অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে। কারন প্রায় সময় তারাই বুঝতে পারে তাদের বাচ্চার সমস্যাগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা মালেকা পারভীনের মতে অটিস্টিক শিশুর পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার বিভিন্ন উপায় বের করতে পারে।

তিনি বলেন, মূলত অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে যা প্রতিদিনই প্রয়োগ করতে হয়। বাচ্চাদের নিয়মের সাথে সঙ্গতি রেখে বাবা-মা সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা নতুনভাবে তাদের প্রাত্যহিক কাজের রুটিন তৈরী করতে পারেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিসঅর্ডার এন্ড অটিজম এর ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর এবং নিউরোলজিষ্ট ড. মুজাহারুল মান্নান বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই যেখানে দ্রুত রোগ নির্ণয় করা যায় সেখানে এসব শিশুরা অনেক বেশী এগিয়ে রয়েছে। তারা অটিজম নিয়েই বড় হওয়ার পাশাপাশি নিজে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং সমাজে ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু অনুন্নত এবং অনুন্নয়নশীল দেশ গুলো এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে বলে মন্তব্য করে ড. মান্নান বলেন এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার কারনে। সরকার নিজেই এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে সবার আগে বাবা-মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সচেতন হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সুতরাং অটিজম কোন কুসংস্কার নয়। এটা এক প্রকার রোগ । এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। সরকারের পাশাপশি সমাজের সকলকেই এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *