অনলাইন ‘সতেজ বাজারে’ ভাগ্যবদল
মোঃ মঈনউদ্দীন : সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছে বিশ্বজিৎ। মুখে তার দুশ্চিন্তার ছাপ। কারণ, নামের আগে যুক্ত হয়েছে নতুন একটা আইডেনটিটি, বেকার। বিধবা মায়ের টানাপোড়েনের সংসারে একমাত্র অবলম্বন বিশ্বজিৎ। কিন্তু বিশ্বকে জয় করা দূরে থাক, নিজের ভাগ্যটাকে কিভাবে জয় করবে সে ভাবনায় তার রাতের ঘুম হারাম । ইতোমধ্যে কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছে সে। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো সাড়া আসেনি। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে সে। ভেবে পায় না কিভাবে চলবে তার সামনের দিনগুলো।
একদিন পড়ন্ত বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর ঘাটে অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। তাকে এরকম গুরুগম্ভীর দেখে পাশে এসে বসল সবুজ। তারই এলাকার ছোটো ভাই, আবার একই বিশ্ববিদ্যালয়েরও। সবকিছু শুনে সবুজ বলল- দাদা, চাকরির অপেক্ষায় না থেকে চলোনা সবাই মিলে নতুন কিছু করি। ওর কথা শুনে মুখ তুলে তাকালো বিশ্বজিৎ। তার চোখে তীব্র জিজ্ঞাসা। কী বলতে চাইছে সবুজ? সবুজ বলে চললো- দেখ দাদা, দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা দিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রত্যয় ও সাহস দিয়েই আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন পৃথিবী। চলো, আমরা সাহসী হই, উদ্যোক্তা হই। সবুজের কথা শুনে মুচকি হাসলো বিশ্বজিৎ। কিছুটা কৌতুহলের হাসি হেসে বলল-উদ্যোক্তা হবো, টাকা কোথায় পাবো? কে দিবে তোকে-আমাকে টাকা? সবুজের নিরুদবেগ উত্তর- দেখ দাদা, প্রতিকূলতা বা উপকরণের স্বল্পতা নয়, ব্যর্থতার মূল কারণ অন্তর্গত উদ্যমহীনতা। সাফল্যের জন্য আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। মাথায় যদি আইডিয়া থাকে, টাকা পয়সা কোনো সমস্যাই না, শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে কোনো শিক্ষিত তরুণ আর বেকার থাকবে না।
সবুজ তার আইডিয়াটা খুলে বললো বিশ্বজিৎকে। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার ছোটো একটি গ্রাম শলুয়া। সেই গ্রামের তেরজন উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণরত তরুণকে নিয়ে গঠন করা হলো এক টিম। টিম ম্যানেজার হিসেবে সবুজ তার আইডিয়াটা সবার সাথে শেয়ার করলো। সবার মুখে তখন আনন্দের ঝিলিক। এভাবেতো কখনও ভাবেনি তারা। একদিকে গ্রামের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না, অন্যদিকে খুব কাছেই খুলনা শহরেই সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায় তিন থেকে চারগুণ। তারচেয়েও বড়ো সমস্যা ভেজাল। দুধে মেশানো হয় পানি, শাকসবজি ফলমূলে মেশানো হয় নানা ধরনের কেমিক্যাল।
তারা খুলনাবাসীকে নির্ভেজাল কৃষিপণ্য সরবরাহ করবে এবং তা সুলভমূল্যে দিবে। ফলে একদিকে যেমন নগরবাসী সতেজ কৃষিপণ্য পাবে, অন্যদিকে গ্রামের কৃষকরা পাবে ন্যায্যমূল্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থাকবেনা, আর তাদের বেকারত্ব দূর হবে, হবে ভাগ্যবদল।
পরিকল্পনা মতো একটি ওয়েবসাইট খোলা হলো। নাম দেওয়া হলো সতেজ বাজার ডট কম। ফেসবুকেও একই নামে খোলা হলো একটি পেজ। অতিদ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল তাদের উদ্যোগের কথা।
ফেসবুকে তাদের এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে এগিয়ে এলেন খুলনা জেলা বাজার কর্মকর্তা। তিনি সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্রেসকাট সবজি ও ফলমূল প্রক্রিয়াজাত এবং বিপণন সম্প্রসারণ কর্মসূচি’র আওতায় তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিলেন। বিনামূল্যে এই প্রজেক্ট থেকে সরবরাহ করলেন ইঞ্জিনচালিত কুলিং চেম্বার সমৃদ্ধ একটি ভ্যান। যাতে করে গ্রাম থেকে পণ্য খুলনা শহরে আনা নেওয়া সহজ হয়।
গ্রামের প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন বিত্তশালী ব্যক্তিও এগিয়ে এলেন তাদের পাশে। তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিনাসুদে ধার দিলেন কিছু অর্থ।
সেই থেকে যাত্রা শুরু। অনলাইনে চলল প্রচার প্রচারণা। খুলনা শহরবাসীর কাছ থেকে আসতে লাগলো প্রচুর সাড়া। প্রতিদিন দুধ, দেশি হাসমুরগির মাংস, ডিম, শাকসবজি ফলমূলসহ সব ধরনের কৃষিপণ্যের অর্ডার আসতে থাকলো তাদের কাছে, ফেসবুক, ওয়েবসাইট ও মোবাইলের মাধ্যমে।
প্রতিদিন সকালবেলা পূর্বের পাওয়া অর্ডারের পণ্য সংগ্রহে বেরিয়ে যায় তাদের একটি দল। সরাসরি কৃষক বা খামারির কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় সতেজ শাকসবজি, মাছ, মাংস এবং দুধ। তারপর তা পৌঁছে দেওয়া হয় যিনি অর্ডার করেছেন তার বাসায় কিংবা অফিসে। একেবারে ফ্রেশপণ্য, বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে।
সতেজ বাজার ডটকম থেকে পণ্য কিনেছেন এরকম কয়েকজন ক্রেতার সাথে কথা বলে জানা গেল তাদের অসাধারণ অনুভূতির কথা। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সতেজ বাজার ডটকম এর একজন ক্রেতা বললেন, আগে একটি দোকান থেকে কেজি প্রতি ষাট টাকা দরে দুধ কিনতেন তিনি, কিন্তু তার প্রায় অর্ধেক থাকতো পানি। এখন সতেজ বাজার থেকে পঞ্চান্ন টাকা কেজি দরে নিয়মিত দুধ কেনেন তিনি। দাম এবং মান দুটোতেই খুশি তিনি।
এরকম খুশি ছড়িয়ে দেওয়ার আইডিয়াটা যার মাথা থেকে এসেছে সেই টিম লিডার সবুজের সাথে কথা বলে জানা গেল, দিন দিন তাদের এই টিমে সদস্যের সংখ্যা বাড়ছে। শুরুতে তেরজন থাকলেও এখন পঁচিশ। সব মিলিয়ে কী অনুভূতি জানতে চাইলে সবুজের সহাস্য উত্তর – শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষিত তরুণের বেকার দিন শেষ।
১২.০৬.২০১৯
লেখক : কলামিস্ট


