অপরাজনীতির শিকার কওমীর ছাত্র সমাজ
মাওলানা আমিনুল ইসলাম :: আগে আমরা ছাত্র শিবিরকে বলতাম, বেয়াদব, বে- আমল, উশৃঙ্খল। বেয়াদব কত প্রকার ও কি কি সব গুণাবলী তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। যার কারণে আলেম- উলামা ও পীর মাশায়েখগণ ছাত্র শিবিরকে কখনো মেনে নিতে পারেনি। ওরা যতই সাংগঠনিকভাবে মজবুত হোক না কেন, ওলামায়ে কেরামের সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আমাদের বর্তমান সময়ের কওমী অঙ্গনের ছাত্ররা কি এখন সেই শিবিরের বাতলানো পথে হাটছেন? যা কোনদিন আমরা কল্পনা করিনি, কওমীর শিক্ষার্থীদের থেকে যে গুলো কখনো আশা করা যায়নি, সে কাজ এখন আমাদের ছাত্র ভাইয়েরা নির্দ্বিধায় করে যাচ্ছেন।
কওমী অঙ্গনে আর যেমন তেমন আদব- আখলাকের ব্যাপারে তারা সচেতন। এ সব মাদ্রাসায় ছাত্রদের আদব শেখার প্রতি খুব জোর দেওয়া হয়। কোন ছাত্র যেন বে আদব না হয়, এব্যাপারে উস্তাদগন খুবই সতর্ক থাকেন। কিন্তু এখন হচ্ছেটা কি? ছাত্ররা কোন পথে হাটছে?
গত বছর দেখেছিলাম, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, ওলামায়ে দেওবন্দের সূর্য সন্তান, তাজুল উলামা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজপথে মিছিল- মিটিং করতে। যাতে এদেশের কিছু নওজোয়ান আলেম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়, ছাত্রদের উস্কিয়ে দেওয়া হল, তারা সেই প্রখ্যাত আলেমের কুশ পুত্তলিকা দাহ করল। তাঁর ছবি নিয়ে রাজপথে পদদলিত করা হল। ছবিতে অগ্নি সংযোগ করল তারা।
বড় দুঃখ পেয়ে ছিলাম সেদিন। সচেতন বিবেকবান মানুষ গুলো স্তমিত হয়ে গিয়ে ছিল। যারা সত্যিকারের জ্ঞান বান তাদের হতবাক করেছিল মাদ্রাসার ছাত্রদের এমন আচরন।
এখন দেখছি, একজন তুখোড় রাজনৈতিক, আমাদের আলেমদের গর্ব, রাজপথের সিংহ পুরুষ মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.- এর হাতে গড়া শিষ্য, মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেব দামাত বারাকাতুহুমকে অপমান। তাঁর প্রতি জুতা নিক্ষেপ। (আছতাগফিরুল্লাহ)
মুফতি ফয়জুল্লাহ সাহেবের কর্মী আমি নই। তাঁর রাজনীতি আমি করি না। তাঁর রাজনীতির আদর্শের সাথে আমার চিন্তা- চেতনার অনেক ফারাক। তাই বলে সেই মহান আলেমকে অপমান করা, এটা তো কোন মনুষত্বের পরিচয় বহন করে না। হতে পারে, মুফতি ফয়জুল্লাহ-এর রাজনীতির সাথে মিল নেই, তাই বলে তাঁকে এভাবে লাঞ্ছিত আর অপমানিত করা কোন ভদ্র মানুষের কাজ নয়।
এঘটনাটি বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ। যারা আদবী- আখলাকী, যাদেরকে আদব আখলাকের মডেল বলা হয়, তারা এখন কোন পর্যায়ে চলে গেছে ভাবতে কষ্ট হয়।
এখানে শুধু দুজনের কথা উল্লেখ করলাম, এরকম বহু অঘটন ঘটে যাচ্ছে কওমী মাদ্রাসার মধ্যে। কওমীর ছাত্রদের যে আদব – আখলাক ছিল, তার সব কিছু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এখন যেন সেই বাতিলের রাস্তা অবলম্বন করেছে তারা।
তবে কেন আজ এই অবস্থা? কওমীর সন্তানদের এই ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ আচরন কেন? কেন তারা আজ এত অধঃপতনে?
চিন্তা করলে হয়রান হয়ে যেতে হয়। কোথায় যাচ্ছি আমরা। কোথায় যাচ্ছে আমাদের সন্তানেরা। আমাদের সন্তানেরা কিভাবে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে।
আগে কখনো আমাদের কওমীর সন্তানদের থেকে এরকম আচরণ দেখিনি। বা কোন দিন শুনিনি। আলেমদের মধ্যে এখতেলাফ হয়েছে অনেক। আমাদের উস্তাদদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদের মধ্যে তার প্রভাব পড়েনি। ছাত্ররা আদবের সাথে সকলকে ছারে তাজ মনে করেছে। সকল উস্তাদ এবং আলেমকে সন্মান করেছে।
এখন কোন মাদ্রাসায় উস্তাদদের মধ্যে ইখতেলাফ হলে গ্রুপিং হয়ে যায়। ছাত্ররা কিছু এক পক্ষ আর কিছু অন্য পক্ষ। এক পক্ষের ছাত্ররা অন্য পক্ষকে দুশমুন মনে করে। অন্য পক্ষের উস্তাদকে সন্মানের চোখে দেখেনা।
বড় আফসোস হয়। আগে যে ইখতেলাফ ছিলনা তা নয়। তুমুল ইখতেলাফ হত আলেমদের মধ্যে। কিন্তু ছাত্রগণ কোন তরিতে পা দিতেন না। আবার কোন তরিতে উঠলেও অপর পক্ষের আলেমদের ব্যাপরে পুরোপুরি ভক্তি শ্রদ্ধার কোন কমতি থাকতনা।
আমি উস্তাদদের মুখে শুনেছি, জামেয়া ইমদাদিয়া কিশোরগন্জে একবার উস্তাদদের মধ্যে ইখতেলাফ হয়েছিল। সে সময়ে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব সেখানকার ছাত্র ছিলেন। ফরীদ সাহেব তো ছাত্র জীবন থেকেই অনেক মেধার পরিচয় দিয়ে ছিলেন। সকল উস্তাদদের প্রিয় পাত্র ছিলেন তিনি। যখন উস্তাদদের মধ্যে ইখতেলাফ চলছিল, ছাত্রগণও বিভক্ত হয়ে পড়ে ছিল, উভয় পক্ষের ছাত্ররা তাঁকে টানাটানি শুরু করল। কিন্তু ফরীদ সাহেব কোন পক্ষেই গেলেন না। বরং বললেন, আমি একটু এই সুযোগে বেশী বেশী মুতালায়া করি।
আমাদের মুরুব্বীদের কি আদর্শ আর আখলাক ছিল চিন্তা করুন। উস্তাদদের মধ্যে মতানৈক্য থাকতে পারে। তাই বলে ছাত্রদের তো খুবই সতর্ক হয়ে চলতে হবে।
আমাদের দেশে সকলেরই রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। একটা গণতান্ত্রিক দেশ। যার যা খুশি, সে তার মত রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকতে পারে। আমাদের যদি কারো দর্শন পছন্দ না হয়, তাহলে চুপ থাকাই শ্রেয়। এখানে কাউকে লাঞ্চিত করা মোটেও ভদ্রতা নয়।
তবে আমাদের বর্তমান জামানার ছাত্রদের এত অধঃপতনের কারনটা কি? কেন এখন আর আগের মত নেই?
একটু চিন্তা করলে দেখা যায়, আগে আমাদের মাদ্রাসা গুলোতে এত ছাত্র সংগঠন ছিল না। এখন যে হারে মাদ্রাসাতে সংগঠন দাঁড়িয়েছে, এর কিছুই আগে দেখা যায়নি। ছাত্ররা মাদ্রাসায় এসেছে আর পড়া শুনা করেছে। ব্যস, এতটুকু। এখনকার মত এত রাজপথে ধুম- ধাড়াক্কা করার সময় ছিলনা। এত মিটিং- মিছিল করার সময়ও ছাত্রদের ছিল কোথায়?
আমি একদম ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বলছিনা। ছাত্র রাজনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। তরবিয়ত দিতে হবে তাদের। এখন সংগঠন আছে, তবে কোন তরবিয়ত নেই। তাদেরকে সেভাবে আখলাক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছেনা।
এখন কোন আলেম কিছু বললে, কোন কাজ করলে, সেটা ঐ ছাত্র রাজনীতির পক্ষে না হয়, তখন তার বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। আদব শিক্ষা দেওয়া তো দুরের কথা, রাজপথে সেই সব আলেমদের সমালোচনা ইনিয়ে – বিনিয়ে করে ছাত্রদের শেখানো হচ্ছে।
সুতরাং আমাদের ছাত্ররা কেন আর এসব করবে না। তাকে আমরাই ট্রেনিং দিচ্ছি!
এজন্য ছাত্রদের তরবিয়ত দেওয়া দরকার। অপরাজনীতির যাতাকল থেকে তাদেরকে বের করে, সঠিক পথে পরিচালনা সময়ের দাবি।
আজ এই অপরাজনীতির শিকার হয়ে আমাদের সু- সন্তান গুলোর জীবন নষ্ট হচ্ছে। তাদের এই রাহু – গ্রাস থেকে মুক্ত হতে হবে।
আরেকটা বিষয়, কওমী মাদ্রাসাতে রাজনীতির ছদ্মাবারণে এবং বিভিন্ন কৌশলে মওদুদী ও লা মাজহাবীগণ ঘাপটি মেরে বসে আছে। ওরা বিভিন্ন সময়ে কওমীর ছাত্রদের নানান কায়দায় ব্যবহার করে। যেটা আজো আমরা বুঝি না।বিশেষ করে মওদুদী গ্রুপের সাথে রাজনৈতিক সমাঝোতার পর থেকে কওমীর ছাত্ররা আর আগের মত নেই। কিছুটা হলেও তাদের মাঝে পরিবর্তন ঘটেছে।
মওদুদী আর কওমীর একাকার হওয়ার কুফল বলা যায় আজকের ছাত্রদের এই হালাত। সোহবতে মওদুদী পন্থীর কারণে কওমীর শিক্ষার্থীদের সেই আসল অবস্থা বাকি নেই। এখন ঐ ওদের উচ্ছৃঙ্খলতার মনোভাব আমাদের সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাই সচেতনতা জরুরি। মওদুদী বাতিল পন্থীদের সংস্পর্শ থেকে নিজেদের ছাত্রদের ফেরানো জরুরি। নচেৎ আরো বেগতিক হওয়ার সম্ভবনা।
আল্লাহ তুমি আমাদের সন্তানদের হেফাজত কর। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


