অভিশপ্ত বেওয়ারিশ লাশ

অভিশপ্ত বেওয়ারিশ লাশ

অভিশপ্ত বেওয়ারিশ লাশ

মো. সামিউল আলম : হাসপাতালের মর্গে গুলিবিদ্ধ যুবকের লাশ। মর্গের হিমঘরে বেশ কিছুদিন ছিল তার স্থান। প্রথমে পরিচয় না মিললেও পরে জানা যায় তার পরিচয়। তার আত্মীয়, যারা এই শহরেই বাস করে। তবুও শেষ কৃত্যটা হচ্ছে বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে।

ছোটন, পুরো নাম রাকিবুল হাসান। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোটো। সবাই তাকে আদর করে ডাকে ছোটন বলে। ছোটন বেশ মেধাবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ছোটোবেলা থেকেই কর্মময় মা-বাবার এ সন্তানটি বেশ চঞ্চল ছিল। লেখাপড়া, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলা আর আড্ডা দিয়েই সময় কাটত তার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় ছোটনের মধ্যে, আড্ডা আর হৈ-হুল্লোড় এগুলো এড়িয়ে দু-একজন নতুন বন্ধুর সঙ্গে এবং কম্পিউটারে বসেই তার সময় কাটতে থাকে। তাও আবার বেশিরভাগ সময়ই ঘরের ভিতর দরজা বন্ধ অবস্থায়। মাঝে মধ্যে কাউকে কিছু না বলে কোথায় যেন চলে যেত। বিষয়টি বাবা-মা ও দুই বোনের দৃষ্টি এড়ায়নি, বিশেষ করে বোনেরা বাবা-মাকে বললেও তাদের এতোটা সময়ও ছিল না বিষয়টি নিয়ে ভাববার। তবে একেবারেই যে কিছু বলেননি তা নয়। পড়াশুনা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্যই তার এই পরিবর্তন বলে জানায় ছোটন। বাবা-মা ভেবেছে ছেলে লেখা-পড়া করছে, ধর্মীয় অনুশাসন মানছে ভালো কাজইতো করছে। কিন্তু জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত হয়ে অপার সম্ভাবনাময় এই তরুণ আজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। আপনজনেরা তার লাশ গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। তার লাশ দাফন করতে হচ্ছে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বর্তমান বিশ্বে একটি আলোচিত সমস্যা। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে অদ্যাবধি পৃথিবী ক্রমান্বয়ে অশান্ত হয়ে ওঠছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে জঙ্গিবাদের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা পায়। জঙ্গিবাদ উগ্রসন্ত্রাসবাদেরই একটি বিশেষ রুপ। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথকে পদদলিত করে ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে যে বিপথগামী গোষ্ঠী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদেরকে আমরা জঙ্গি বা উগ্রসন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত করি।

জঙ্গিবাদ উত্থানের বহুবিধ কারণ বিদ্যমান। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিবাদের ধরণ ও কারণ পরিবর্তিত হচ্ছে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। যার নেতৃত্বে জার্মানির নাৎসি বাহিনী পুরো ইউরোপে তাণ্ডব চালায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জঙ্গিবাদের কারণগুলোর মধ্যে ধর্মীয় কুসংস্কার ও দরিদ্রতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির চরমপন্থী ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ সমাজকে উগ্রপন্থী করে তুলছে। পাশাপাশি বিত্তবানদের ছেলে-মেয়েদেরকে ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। জঙ্গিবাদ উত্থানের কিছু কারণ লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব; ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার; তরুণ সমাজের হতাশা; আধুনিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব; সামাজিক সচেতনতার অভাব; ভঙ্গুর পারিবারিক বন্ধ এবং মগজ ধোলাই/ব্রেনওয়াশ ইত্যাদি।

যেহেতু জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদের একটি বিশেষ রূপ, সেহেতু এর পিছনে একটি গোষ্ঠী তাদের উগ্রসন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বৈধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে চায় এবং তাদের কট্টরনীতিকে জনগণের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাধীন বিবেকের ঊর্ধ্বে গিয়ে অন্ধভাবে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। কোনো ধর্মই এই জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না। বিশেষ করে ইসলামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যে বিনা কারণে একজনকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল এবং যে তাকে বাঁচাল সে যেন সকল মানুষকে বাঁচাল।” এছাড়া মহানবী (স.) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, ‘তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না।’

পূর্বে রমনার বটমূলে, যশোরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হলেও বাংলাদেশে আলোচিত জঙ্গি হামলা শুরু হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় জঙ্গি সংগঠন জেএমবি (জামায়াতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশ) এর সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এরপর বাংলাদেশে দুটি নির্মম ও লোমহর্ষক ঘটনা হচ্ছে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি ও শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলা। এছাড়াও শিয়া মসজিদে হামলা, সংখ্যালঘু হত্যা, গির্জার পুরোহিতকে হত্যা, বৌদ্ধবিহারে হামলা, মসজিদের ইমাম হত্যাসহ বহু জঘন্য ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী বাঙালি জাতিসত্ত্বার উপর কালিমা লেপন করেছে।

সরকার সকল প্রকার জঙ্গি দমনে বদ্ধপরিকর। সরকার সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুষ্ঠু পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের সহায়তায় এসব জঙ্গি দমন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতির পরিপ্রেক্ষিতে আইনের প্রয়োগ ও বিচারিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করতে হলে কেবল সচেতনতা সৃষ্টি নয়, সন্তানের সঙ্গে মাতা-পিতার রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। আমরা যত বেশি তাদের সঠিক তথ্য দেব, তত বেশি তারা জানতে ও বুঝতে পারবে। মুখে মুখে ভালবাসা নয়, সন্তানের অন্তরে জায়গা করে নিতে হবে। ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি আন্তরিক সেতুবন্ধ তৈরি করতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে কুশিক্ষার দিকে ধাবিত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানেরা যখন বড়ো হতে থাকবে তখন মা-বাবা ও অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে তারা কোথায় যায় এবং কাদের সঙ্গে মিশে সেদিকে নজর রাখা। তবে খেয়াল রাখতে হবে, মেয়েদের মৌলিক স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা যেন ক্ষুন্ন না হয়। মাদকাসক্ত বা জঙ্গি মানসিকতার মানুষের সঙ্গে যদি কেউ মেলা-মেশা করছে বলে জানা যায় তা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিজেদের দ্বারা তা সম্ভব না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে জানানো জরুরি। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিতের পাশাপাশি অভিভাবক সম্মেলনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যদিয়ে এক শ্রেণির জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী আমাদের সন্তানদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বিপথগামী করে তুলছে। এ ব্যাপারে সকলকে সজাগ থাকতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।

ভিশন : ২০২১ ও টার্গেট রূপকল্প : ২০৪১ (উন্নত দেশ : সোনার বাংলা) কে লক্ষ্য করে ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। উন্নয়ন ঠেকাতে দেশে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছে। সোনার বাংলা গড়তে বাধা দিতে একটি গোষ্ঠী দেশে সন্ত্রাস ও নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে।

শান্তি-সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে, শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করতে তারা জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০ লাখ শহিদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীন দেশে জঙ্গিদের স্থান কখনো হবে না। তার জন্য আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জঙ্গিদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে জঙ্গিবাদ নির্মূল সহজ হবে।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংগঠনে নিয়মিত জঙ্গিবাদ বিরোধী সচেতনতামূলক সভা সমাবেশ অব্যাহত রাখতে হবে। একইভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে জঙ্গিবাদ বিরোধী সচেতনতামূলক প্রতিবেদন, বিজ্ঞাপন, নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। আর জঙ্গিবাদ হচ্ছে ধর্ম ও শান্তির বিরুদ্ধে। ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান নেই। যারা জঙ্গিবাদকে উসকে দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কাজ করছে। জঙ্গিবাদ ও নাশকতা হচ্ছে ধর্মের বিরুদ্ধে, শান্তির বিপক্ষে, উন্নয়নের বিরুদ্ধে, দেশের বিরুদ্ধে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। তাই আমাদেরকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রবৃদ্ধি হবে না, শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। দেশে শান্তি বিরাজ না করলে শিক্ষা, শৃঙ্খলা, মানব উন্নয়ন ইত্যাদি কোনো সূচকেই সফলতা অর্জন করা যাবে না।

আমাদের নাশকতা এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নয়তো ছোটনের মতো অভিশপ্ত মৃত্যু পিছু ছাড়বে না আমাদের আপনজনদের, আমাদের সন্তানদের। প্রিয়জনের স্পর্শ ছাড়াই বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।

লেখক : কলামিস্ট

২৯.০৫.২০১৯

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *