দিল্লী হনুজ দুরস্ত
মুফতি আব্দুস সালাম : এক লেবু ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শিয়ালদহ স্টেশন কতদূর?’
লোকটা হাতের ইশারায় বলল, ‘এদিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছয়বার আল্লার নাম যপুন, পৌঁছে যাবেন।’
আমি বললাম, ‘রাম রাম কয়বার যপলে পৌঁছা যাবে?’
লেবুওয়ালা মুচকি হেসে ফেললো। জাতি হিসেবে ভারতীয়রা বড়ই রসিক।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝকঝকে তকতকে ট্রেনের বগি। স্লিপারের সাইড আপারে সীট পড়েছে। আরামসে এক ঘুমে রাত পার করে দেয়া যাবে। পাশের রুমে চিটাগং থেকে আসা আধ বয়সি এক ভদ্রলোক হৈচৈ জুড়ে দিয়েছেন। তার সীট আরেক জনের সাথে প্যাঁচ খেয়ে গেছে। দুজনের সীট নম্বরই সাতান্ন। তা নিয়ে তিনি পুরো ভারতবাসীর উপর ক্ষোভ ঝারছেন। ইন্ডিয়ান রেলওয়ের এই চরম অব্যবস্থাপনার কথা বাংলাদেশে ফোন করে নানান জনকে জানাচ্ছেন।
এই রুমের যাত্রীরা ভীষণ রকম আড্ডাবাজ। জম্পেস আড্ডায় মাতিয়ে রেখেছে সারাটা পথ। কলকাতার এক দীদী এই আড্ডার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন চট্টগ্রামের মাঝ বয়সী লোকটি। তার রাগ এখন কিছুটা কমেছে। ইন্ডিয়াবাসীর উপর ক্ষোভ আছে কিনা বলা যাচ্ছে না, তবে আপাতত কলকাতার এই দীদীর উপর তার কোন ক্ষোভ নেই।
রাতের কিছু অংশ ছাড়া পুরো তেরো চৌদ্দ ঘণ্টা তারা হইচই করে কাটিয়ে দিয়েছে। এমননা যে তারা আগে থেকেই পরিচিত। মানুষ বড়ই আজীব! কত অল্প সময়ে অচেনা অজানা কারো সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে, আবার মুহুর্তেই ভুলে যেতে পারে অতি ঘনিষ্ঠজনকে।
কলকাতার দিদি বললেন, ‘জানেন দাদা, প্রতি মাসে আমাকে চারবার করে দিল্লী যেতে হয়।’
চিটাগং এর বড়দা, ‘মোদি সরকারও তো মাসে চারবার কলকাতা আসে না, আপনি তো দেখছি দিদি মোদির চেয়েও ব্যস্ত মানুষ। অমনি পুরো রুম হো হো হো করে হেসে উঠলো।’
আমাদের রুম জুড়ে সুনসান নিরবতা, বাহিরের নৈঃশব্দ্য ভেতরে বিস্তার করেছে। ছয়জন যাত্রীর সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। জানালার পাশে বসা তরুণী ট্রেন ছাড়ার পর থেকে নিয়ে ইয়ারফোন লাগিয়ে মোবাইলে মাথা গুঁজে বসে আছে। এই জগতের প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই৷
হাবিবুল্লাহ মাহমুদ উপরের সিটে গড়াগড়ি করছে। একটু পরপর ট্রেন কোথায় আছে সেই আপডেট দিচ্ছে। ‘হোয়ার ইজ মাই ট্রেন’ নামক এক এন্ড্রয়েডে এ্যাপের মাধ্যমে এই কাজটি সে সারা রাস্তা খুব নিষ্ঠার সাথে আঞ্জাম দিয়েছে।
সাইড লোয়ারের যুবকটা স্বস্তিতে বসছে না। এদিক সেদিক পায়চারি করছে। ভাবলাম কোন সমস্য কিনা জিজ্ঞেস করে দেখি। কিন্তু বাংলায় বলবো নাকি হিন্দিতে দোটানায় পড়ে গেলাম। এর আগে কয়েক জনকে বাংলায় বলে বোকা হতে হয়েছে আবার কয়েকজনকে হিন্দিতে বলে বাংলায় উত্তর পেয়ে বিব্রত হতে হয়েছে।
শেসতক বাংলায়ই বললাম-
কোন সমস্যা আপনার?
যুবক: নেহি
আমি: কাহা যানা?
যুবক: দিল্লি, ঘার মে
আমি: কালকাত্তা কিউঁ আয়া থা?
যুবক জানালো কলকাতায় সে আরমির চাকরি করে, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে। তবে তার মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে না যে সে আরমি। আরমির চেহারা জেল পলাতক আসামীর মত মনে হবে কেন?
রাতের খাবার চলে এলো, পাশের রুমের কলকাতা আর চট্টগ্রাম আবার হো হো করে উঠলো। এই লোকগুলোর মনে হয় হাসির রোগ আছে, ছোটখাট বিষয় নিয়ে তারা হেসে খুন হয়। এবার হাসার কারণ হলো ভাতের পরিমাণ কম কেন তা নিয়ে। চট্টগ্রাম বলছে, যেখানে এক পাতিল ভাত না হলে আমার খাওয়া হয় না, সেখানে একমুঠো ভাতে আমার কি হবে? তার কথা শুনে আবার কলকাতা হো হো করে উঠলো।
বিস্তির্ণ গমক্ষেত পেছনে ফেলে অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে রাজধানী এক্সপ্রেস। রাতের নির্জনতা ভেঙ্গে খানখান হচ্ছে ট্রেনের ঝমঝম শব্দে। রাস্তার দুইপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আচ্ছে পাতাশূন্য কাঠগাছ। আকাশে চাঁদ নেই। দুই একটা তারা উঁকি দিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। ট্রেনের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। ইন্ডিয়ার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে ট্রেন জিনিসটা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। জীবন সংসারের বাইরে তাদের আলাদা এক সংসার পাততে হয় ট্রেনের বগিতে। দিনকে দিন বসে থেকে সাতশত ক্রোশ পারি দেয় তারা ট্রেনে চড়ে।
পরদিন বেলা বারটায় ট্রেন নিউ দিল্লী জংশনে এসে থামলো। ব্যাথায় শরীরের হাড়গোড় মড়মড় করছে। ‘দিল্লী হনুজ দুরস্ত’ ব্যাপারটা এতোদিনে উপলব্ধি হলো। ট্রেন থেকে একেক করে সবাই নেমে যাচ্ছে। তরুণী তখনো ইয়ারফোন খোলেনি, কলকাতার আরমি কখন নেমে গেছে খেয়াল করিনি, চট্টগ্রামের লোকটা দুই হাতে বড়বড় দুই ব্যাগ নিয়ে নামছেন, তার পেছন পেছন নামছেন কলকাতার দীদী। তার হাতে ব্যাগ নেই, আছে একজোড়া ক্রাচ। তাতে ভর করে খুব সাবধানে প্লাটফর্মে নামলেন তিনি। তার একটি পা নেই।
চলবে….
লেখক : আন্তর্জাতিক ধর্মীয় বিশ্লেষক


