আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ১

আকাবিরের পদচিহ্নের খোঁজে- ১

অদ্ভুত এক শহরে

মুফতি আব্দুস সালাম : ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখ বন্ধ, হাতের ইশারায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। লাইনে যিনি আমার সামনে ছিলেন অফিসার হাতের পাঁচ আঙ্গুল দুলিয়ে অভিনব কায়দায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘ইন্ডিয়া কেন যাচ্ছেন’? লোকটি আম্পায়ারের ফ্রি হিট কল করার মত করে এক আঙ্গুল শূন্যে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিলেন ‘বেড়াতে যাচ্ছেন’। লোকটার রসিকতায় অফিসার একটু রাগ করলেন মনে হলো। রেগে গেলে মানুষের ভুল হয়, তারও ভুল হলো। তর্জনীর ছাপ নেওয়ার পরিবর্তে দুই দুইবার আমার বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ নিয়ে নিলেন। আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম, তাতেও কাজ হলো না। সহজেই ইমিগ্রেশন পার করে দিলেন।

ভেতরে বসে বসে ফেইসবুক স্ক্রলিং করছি৷ ফ্লাইট ছাড়ার আরো ঘণ্টা খানেক বাকি। একটু পরপর মাইকে এক তরুণী কিছু একটা বলেই চলেছে। ইংলিশ একসেন্টে চিবিয়ে চিবিয়ে বাংলা বলছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন মুখের ভেতর চুইংগাম ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বিমানবন্দরে বসেই ইউএস-বাংলার সাথে বাংলাদেশ বিমানের ধাক্কা খাওয়ার খবর পড়লাম। ইথিওপিয়ার মর্মান্তিক বিমান ক্রাশের ঘটনায় বুকের ভেতর যেই ভয় জমাট বেঁধেছিলো এই খবর শুনে তা বিগলিত হয়ে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়লো। একটু পরেই ফ্লাইটে চড়বো, ভিতরটা এক অজানা শঙ্কায় ছেয়ে আছে।

নভো এয়ারের ছোট্ট বিমানটি আকাশে উড়াল দেওয়ার পর মনে হলো যেন আমি কোন বিমানে চড়িনি , আমাদের গাঁয়ের আড়িয়াল বিলে ডিঙ্গি নৌকায় চেপে বসেছি। বিকেলের বাতাসে ডিঙ্গি নাও দুলছে, সাদা মেঘগুলো কাশফুল হয়ে ফুটেছে, সেই কাশবনের ভেতর দিয়ে হেলেদুলে চলেছে ডিঙ্গি নৌকা, একটু পরেই সে বড়ইতলা ঘাটে গিয়ে ঠেকবে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিয়ে ডিঙ্গি বিমানটি আমাদেরকে নিয়ে অবতরণ করলো কলকাতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে।

খুবই নোংরা অপরিপাটি বিমানবন্দরের রানওয়ে। সেই তুলনায় আমাদের সিলেট কিংবা কক্সবাজারের আন্তঃদেশীয় বিমান বন্দরের রানওয়ে অনেক দৃষ্টিনন্দন। ফ্রান্সের নিস কোত দা’জুর বিমান বন্দরের রানওয়ে নাকি ভারী মনোমুগ্ধকর। সমুদ্রের বালুচরে এর রানওয়ে। অবতরণ করার সময় নাকি মনে হয় এই বুঝি সাগরের জলে পা ভিজে গেলো। ইউরোপের রাজকীয় পাহাড় সারির মাঝে আছে ইতালির আওস্তা ভ্যালি এয়ারপোর্ট। ইন্টারনেটে এর সৌন্দর্য্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি, বাস্তবে দেখার ভাগ্যে হবে কি না জানিনা।

ইমিগ্রেশনে এসে মহা বিপত্তিতে পড়া গেলো। লিখতে ইচ্ছে করছে না সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। যেখানে আমার পোশাক দেখে মানুষের ভেতর শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হওয়ার কথা, সেখানে এখন তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে। জঙ্গিরা তাদের ত্রাসের কলঙ্ক ঢাকতে ধর্মীয় আবরণ লাগায় এই বেশ ধরে। সেই থেকে জনমানুষের মনে এই বেশ ভূষার প্রতি ভয় ঘৃণা বা অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়৷ ওনাদের মেকি ‘জেহাদি’ উত্তেজনার বীর্যস্খলনে নাপাক হতে হয় আলাভোলা মুসলমানকে। বাদ দেই, ঘৃণা হয় এই নপুংসকদের কথা লিখতে।

বিমান বন্দর থেকে বের হয়েই মাওলানা হাবিবুল্লাহ মাহমুদকে পেয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে সে। মুম্বাই থেকে ছুটে এসেছে কলকাতায়৷ সে পুরো ইন্ডিয়ায় আমার সাথে ছিলো। ভ্রমণের নিঃসঙ্গতা আর কষ্ট দুটোই লাঘব করেছে হাবিবুল্লাহ। তাকে শুকরিয়া জানানোর ভাষা আমার নেই।

কলকাতা আমাদের পুরান ঢাকার চেয়েও হিজিবিজি শহর। রাস্তাঘাট অলিগলির কোন ঠিক ঠিকানা নেই। হইচই চিৎকার চেচামেচিতে সরগরম থাকে চব্বিশ ঘণ্টা। ট্রামের ধ্রিমধ্রাম শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে আসে। কলকাতার জিনিস পত্তরের দাম খুব সস্তা। আঙুরের কেজি ষাট টাকা। গরুর চাপ খাবেন চল্লিশ টাকায়। আড়াইশ টাকায় মিলে আঠারশ টাকার জুতো।

কাছাকাছি কোথাও যেতে টেক্সির বিকল্প যানবাহন নেই। রিক্সার মত অদ্ভূত ধরনের এক ঠেলাগাড়ি চোখে পড়ে। এই বস্তুটা কলকাতার সবচেয়ে বিরক্তিকর। মূল অংশটা রিকশার অবয়ব, চাকাজোড়া ঘোড়ার গাড়ি থেকে খুলে এনে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামনের দিকে মাছ ধরা জালির মত দুটি লোহার ধরণী পাঁচ সাত হাত সামনে এসে মিলিত হয়েছে। ধরণীর ফাঁকের মধ্যে সেঁধে গিয়ে আধা বয়সী লোকগুলো মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে গতিরোধ না করতে পেরে পথচারীদের গায়ে ধাক্কা দিয়ে অযথাই ফ্যাসাদ বাঁধিয়ে দেয়। থামানো অবস্থায় লোহার সেই সরু ধরণীযুগল মাটিতে পরা থাকে। তখনই সমস্যাটা হয়। পা বেঁধে ছিটকে পড়ে পথচারী। আমি নিজ চোখে এমন একটা দৃশ্য দেখেছি কয়েকবার। দু’দিন কলকাতা চষে বেড়ালাম।

শিয়ালদহ রেলস্টেশনে যাওয়ার সময় ট্যাক্সি চালক বললো, ‘তা, দাদা! কেমন দেখলেন আমাদের কোলকাতা’?
আমি বললাম, ‘ভালোই দেখলুম, তবে দাদা, তোমরা এইযে উদোম হয়ে রাস্তায় স্নান করো না, এটা খুব অদ্ভূত লেগেছে আমার কাছে’।
টেক্সিওয়ালা বললো, ‘এগুলো আমাদের কাছে পানি ভাতের মত, আমরা দাদা রেল লাইনের পাশে বসেও সারিবদ্ধভাবে কাজ সারতে পারি। এসব কাজে লজ্জার কিছু নেই’।

বড়ই অদ্ভূত মানুষ এরা। এই অদ্ভুত মানুষগুলোর অদ্ভুত শহরকে বিদায় জানিয়ে চললাাম নতুন কোন শহরের খোঁজে।

চলবে…

লেখক : আন্তর্জাতিক ধর্মীয় বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *