মুক্তিযুদ্ধের অর্জন রক্ষায় প্রতিশ্রুতি চাই

মুক্তিযুদ্ধের অর্জন রক্ষায় প্রতিশ্রুতি চাই

মহান স্বাধীনতা দিবস মঙ্গলবার

মাসউদুল কাদির : আবার নতুন শক্তির জয়গান নিয়ে আমাদের সামনে হাজির ছাব্বিশ মার্চ। ভয়াল সেই ২৫ মার্চের কালো রাত্রি পেরিয়ে মঙ্গলবার ছাব্বিশ মার্চে আমরা অবতীর্ণ হয়েছি। পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর আক্রমণের সেই পঁচিশ মার্চ বাংলাদেশের কোনো মানুষই ভুলতে পারবে না। ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। ঘুমন্ত মানুষের উপর কী ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানী নরপশুরা। মানুষ মারতে তাদের কী আনন্দ হচ্ছিল।

ছাব্বিশ মার্চের সকালটাই ছিল এসব বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শপথের দিন। বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল। পথে পথে, মোড়ে মাড়ে, স্বাধীকার আন্দোলন রূপ নিয়েছিল সংগ্রামে, যুদ্ধে। রক্তক্ষয়ী নয়মাসের সফল যুদ্ধের পর, লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বিলিয়ে দেবার রক্তপিচ্ছিল পথের উপর দিয়ে একটি স্বর্ণখচিত পতাকা আমরা পেয়েছি। এই পতাকাই বাংলাদেশের পতাকা। আমাদের পরম ভালোবাসার পতাকা। পৃথিবীর কোনো পতাকাই এরচেয়ে আর পছন্দের নেই। ভালোবাসার নেই। কোনো পতাকাই এই ষোল কোটি মানুষদের ছায়া দেয় না। এই পতাকার নিচে শুয়ে থাকতে আজ আমরা যে প্রশান্তি অনুভব করি তা ব্যাকুলতর। তা খুবই আগ্রহের, আকাক্সক্ষার, ভালোবাসার।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত উপেক্ষা করেছিল, ক্ষমতার বদলে দিয়েছিল বুলেট আর কামানের গোলা। ২৫ মার্চের কালরাতে ঘুমিয়ে থাকা নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাংক, কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঢাকা শহরে বয়েছিল রক্তের বন্যা। বাধ্য হয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তার আগে ৭ মার্চের বিশাল জনসভায়ও বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দুঃখের বিষয়, তখন এ দেশেরই কিছু কুসন্তান হাত মিলিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে। গড়ে তুলেছিল রাজাকার-আলবদর-আলশামসসহ বিভিন্ন নামের বাহিনী, যাদের অত্যাচার-নির্যাতন পৃথিবীর ইতিহাসের সব বর্বরতাকে হার মানিয়ে দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও আরো বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। আজকের এই দিনে স্বাধীনতাযুদ্ধের সব শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যাঁরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাঁদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আরো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী সব ব্যক্তিকে।

পঁচাত্তর দুঃখ ঢেলে দিয়েছিল জাতির সারা অঙ্গে। ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি স্বাধীনতার পরও। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে চেয়েছিল পাকপূজারী একটা শ্রেণি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশ চলে যায় স্বাধীনতাবিরোধীদের কবজায়। রাজাকার-আলবদরসহ ঘাতকরা ফিরে আসে রাষ্ট্রক্ষমতায়।

স্বাধীনতা আন্দোলনে, সংগ্রামে অসংখ্য আলেমদেরও অবদান আছে। কিন্তু সেই আলেমদের অবদান আজ আলোচনায় নেই। এটিও কম দুঃখজনক নয়। জাতি মঙ্গলবার যথাযোগ্য মর্যাদায় ৪৯তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করবে। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হবে। আমরা মনে করি, আমাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মূল করার ব্যাপারেও। প্রিয় বাংলাদেশ সুন্দরভাবে এগিয়ে যাক আমাদের প্রত্যাশা সেটাই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *