আজ চিন্তাশীল আলেমের বড় প্রয়োজন

আজ চিন্তাশীল আলেমের বড় প্রয়োজন

আজ চিন্তাশীল আলেমের বড় প্রয়োজন

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : বর্তমানে কওমী মাদ্রাসাতে চিন্তাশীল আলেমের বড় অভাব হয়ে পড়েছে। আরও অভাব দেখা দিয়েছে হক্কানী পীর-মাশায়েখদের সোহবতপ্রাপ্ত আলেমের।

এখন আমাদের দেশে মাদ্রাসার অভাব নেই। মহান আল্লাহতা’য়ার ফজলে হাজারো মাদ্রাসা। এমনিভাবে আলেমেরও অভাই নেই। লাখো আলেম এখন। কিন্তু বড়ই পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে, বড্ড অভাব চিন্তাবিদ আলেমের। বড় ঘাটতি হক্কানী-রব্বানী আলেমের…।

বছর ঘুরে হাজার হাজার আলেমের বহর বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এর মধ্যে চিন্তাশীল আলেম এবং হক্কানী বুজুর্গগণের সোহবাতপ্রাপ্ত আলেমদের সংখ্যা নগণ্য।

আমাদের আকাবির আছলাফগণ তথা দেওবন্দের পূর্বসূরী আলেম-উলামা, যাদেরকে আমরা অনুসরণ-অনুকরণ করে থাকি, তাঁরা তো সব ই’তেদালী মেজাজের ছিলেন। ওলামায়ে দেওবন্দ “বাইনাল ইফরাত ওয়াত তাফরীত” না কোনো বিষয় বাড়াবাড়ি করেছেন, না কোনো বিষয় ছাড়াছাড়ি করেছেন। সব-সময় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন।

বর্তমানে কিছু কিছু জায়গায় কওমী মাদ্রাসার কোনো কোনো আলেমের মধ্যে উগ্র-মেজাজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কট্টরপন্থী গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্টতা বোঝা যাচ্ছে।

যে সব কট্টরপন্থী-উগ্রবাদী গ্রুপ সব-সময় হক্কানী পীর-মাশায়েখদের বিরুদ্ধে। তারা তাযকিয়া-আত্মশুদ্ধির মেহনত বাঁকা চোখে দেখে।
এবং সুযোগ পেলে কারণে-অকারণে হক্কানী পীর-মাশায়েখদের বিরোধিতা করে।

অথচ ওলামায়ে দেওবন্দের মাঝে উগ্রতা ছিল না। ওলামায়ে দেওবন্দ কট্টরপন্থী নন।

আকাবিরে দেওবন্দ বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। দেওবন্দী প্রতিটি আলেম হক্ব-হক্কানিয়্যাতের উপর অটল-অবিচল থেকে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন। তাই বলে কোনো আকাবির খানকার আমল, আত্মশুদ্ধির মেহনতকে বাঁকা চোখে দেখেন নি।

দেওবন্দ গেলে এখনও দেখা যায়, বুজুর্গগণের খানকা বিদ্যমান রয়েছে। যে সব মনীষীগণ ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তারা আবার আত্মশুদ্ধির লাইনেও বড় শায়েখ ছিলেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজ আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওসব বিষয়গুলোর বড় অভাব হয়ে পড়েছে। তাই বুঝি আজ পাওয়া যায় না শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. মতো চিন্তাশীল আলেম, পাওয়া যায় না হাফেজ্জী হুজুর ( রহঃ) মতো ব্যক্তিত্ব। আজ বড় অভাব কাজী মু’তাসীম বিল্লাহ রহ.-এর মতো বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলার বিজ্ঞ আলেম। আজ সংকট সৃষ্টি হচ্ছে সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.-এর মতো বাতিলের বিরুদ্ধে হুংকার দেওয়ার মানুষ।

এমনিভাবে আর যেন তৈরী হচ্ছে না, মুজাহিদে মিল্লাত শামসুদ্দীন কাসেমী রহ.-এর মতো মানুষ।

একটু লক্ষ্য করুন, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, মওদুদী ফিতনার ব্যাপারে আমাদের আলেমসমাজ তীব্রভাবে সোচ্চার ছিলেন সব-সময়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেমিনার হত মওদুদীর ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে।

আল্লামা কাজী মু’তাসীম বিল্লাহ ( রহঃ) স্পষ্টভাবে মওদুদীয়্যাতের ব্যাপারে কথা বলতেন। যেকোনো প্রোগ্রামে নির্ভয়ে কথা বলেছেন। আমাদের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে মওদুদীর বিভ্রান্তিকর মতবাদের উপর ছাত্রদের সতর্ক করা হত। এ ব্যাপারে উস্তাদগণ ছাত্রদেরকে মওদুদীয়্যাত সস্পর্কে দালিলিক জ্ঞান দিতেন।

চরমোনাই সৈয়দ ফজলুল করীম সাহেব রহ. তো মওদুদী গ্রুপের যম ছিলেন। একদম শক্ত অবস্হানে ছিলেন। বহুবার তিনি মওদুদী গ্রুপকে বলিষ্ঠভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন এবং আমৃত্যু উনার সেই চ্যালেঞ্জ জারী রেখছেন।

এমনিভাবে দেশের দেওবন্দী আলেমগণ সকলে মওদুদী মতবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্হানে ছিলেন সব-সময়, সারাজীবন।

কিন্তু এই সময়ে ঐ বাতিল মওদুদী ফিতনার বিরুদ্ধে স্পষ্ট কথা বলার লোকের বড্ড অভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব কম আলেমই এখন তা বলছেন। এবং যিনি বা যাঁরা প্রকাশ্যে পষ্টভাবে বলছেন, তাঁকে বা তাঁদেরকে বিভিন্ন কায়দায় কোণঠাসা করা হচ্ছে। তাঁর বা তাঁদের নামে বিভিন্ন অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে, পদে পদে বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, নানা কূটচালে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ক্ষতি করার চেষ্টা করা হচ্ছে…।

আরও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, আজ কোথাও কোথাও কওমী মাদ্রাসাগুলোতে (?) মওদুদী গ্রুপের সাথে মিক্সড হয়ে আছে সবাই। দেওবন্দী আর মওদুদী একাকার..??..!! যার কারণে কথা বলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে তারা!

আর এটা হয়েছে, রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে। মওদুদীবাদের সমর্থিত গ্রুপের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে কওমী মাদ্রাসা তথা ওলামায়ে দেওবন্দের এক সর্বনাশ ডেকে আনা হয়েছে। এখন আর কেউ কথা বলেন না। বলার সাহসও রাখেন না! কেননা, কথা বললে ভোট নষ্ট হবে। নমিনেশন গড়বড়ি হবে। তাদের সাপোর্ট পাওয়া যাবে না… এসব ভয়। যা মূলতঃ ক্ষমতা-প্রতিপত্তি-অর্থ-সম্পদের লোভের কাছে তাদের নীতি-নৈতিকতা-আদর্শের পরাজয় ভিন্ন আর কী বলা যায়?

যেটা কিনা বিগত নির্বাচনের সময় কিছুটা হলেও আমাদের সম্মুখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

হক্বপন্থী আলেমগণ মওদুদী গ্রুপের সাথে ইলেকশন করলেন! আবার তিনি যে ইতঃপূর্বে মওদুদীবাদের উপর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটার ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশও করলেন…? এই নীতি-নৈতিকতা-আদর্শহীন কর্ম ছিল ইসলামপ্রেমীদের কাছে বড়ই আফসোসের বিষয়।

আর মওদুদীর অনুসারীরা, আলেমসমাজের মধ্যে প্রবেশ করে কিছুটা হলেও সফল। এখন আর তাঁরা মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না।

এমনিভাবে, মওদুদীর কিছু কিছু চিন্তা-চেতনা দেওবন্দী কোনো কোনো “আলেমের” মগজে ঢোকাতে সক্ষম হয়েছে…।

মওদুদী সাহেব যেমন আইম্মায়ে কেরামকে তোয়াক্কা করেন নি। এমনিভাবে পীর-মাশায়েখগণের বিরুদ্ধে বল্গাহীনভাবে কথা বলেছেন, ঠিক আমাদের কওমীর কিছু “আলেম”ও সেই মেজাজের তৈরী হচ্ছে। অলরেডি অনেক জায়গায় হয়েও গেছে। যারা এখন হক্কানী-পীর মাশায়েখগণের বিরুদ্ধাচার করে যাচ্ছে।

এ জন্য আমাদের মুরুব্বী আলেমগণের সতর্ক হওয়া দরকার। মওদুদী মতবাদের রাহু-গ্রাস থেকে বেরিয়ে নিজ গতিতে চলা চাই।

আর মাদ্রাসাগুলো তালীমের পাশাপাশি তাযকিয়ার প্রশিক্ষণ জরুরী মনে করছি। সেই সাথে মওদুদী মতবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে ছাত্রদের অবগত করাতে সে সম্পর্কে আলাদা আলাদা ক্লাস নেওয়া প্রয়োজন। আগের মতো জায়গায় জায়গায় মওদুদী ফিতনার বিরুদ্ধে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা প্রয়োজন।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের হক্বকে হক্ব বোঝার এবং তার অনুসরণ করার এবং বাতিলকে বাতিল বোঝার এবং তার থেকে বাঁচার তাওফিক দাও।আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *