আত্মোন্নয়নের এক ইসলাহী সফরের কথা

আত্মোন্নয়নের এক ইসলাহী সফরের কথা

আত্মোন্নয়নের এক ইসলাহী সফরের কথা

ফয়জুল্লাহ আমান : তারুণ্য চলে যাবার পর ফিরে আসা অসম্ভব মনে হয়েছে সব কালের কবিদের কাছে। আমাদের মত প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছা গতানুগতিক ধারার মানুষের কাছে তবু এবার কয়েকটি দিনের জন্য তারুণ্য ফিরে এসেছে। বহু প্রত্যাশার পর এমন নির্মল কিছু দিন যেন এল আমাদের জীবনে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সব অপ্রাপ্তি ও হতাশা যেন পিছনে পড়ে রইল। হারানোর যন্ত্রণাগুলো হারিয়ে গেল খুলনার এ পবিত্র সফরে। আহা কী মধুময় কী মায়াবি একেকটি মুহূর্ত।

গত বছর ঐতিহাসিক পথযাত্রার সময় আমি বের হইনি মাদরাসা থেকে। এ বছর আর মিস করতে চাইনি হুজুরের সান্নিধ্য সুরভি। অনেকটা জোর করেই অংশ নিয়েছি কাফেলায়। রঈসুল জামিয়ার কাছে আব্দার করে ছুটি নিয়েছি। আরেকটু হলেই আমি সুযোগ হারাতাম। মহান মালিকের তাওফিক থাকলে এ ভাবেই সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। এ সৌভাগ্য কব্জির তাগিদে নয়; মহান দাতা দয়াময় খোদা তালারই দান।

খুলনা যাত্রার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি সেই রমজানের আগ থেকে। আমি বলছিলাম, এ পর্যন্ত আমরা যা করেছি সব কিছুতেই ব্যতিক্রমী কিছু ছিল। সামনে আরও কোনো ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব কি না। সৃষ্টিশীল মানুষের সৃজন করতে খুব একটা সময় লাগে না। কিছু দিন না গড়াতেই নতুন সফর পরিকল্পনার কথা জানতে পেলাম। প্রাথমিকভাবে ছয় মাসে বাংলাদেশের ছয়টি জেলায় ইসলাহি সফরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছয় সফরের প্রথমটি শাওয়ালে খুলনা থেকে শুরু হলো।

তাজদীদ বা সংস্কার বলে ইসলামী দাওয়াত ও জিহাদের ইতিহাসে একটি শব্দ আছে। তাজদীদ শব্দের আভিধানিক অর্থ নবায়ন। নতুনত্ব সৃষ্টি। যা পুরাতন তা জরাগ্রস্ত। ক্ষয় প্রাপ্ত। পুরাতনের থাকে না আকর্ষণ সৃষ্টির সক্ষমতা। সজীবতা ফিরিয়ে আনতে পারে না জরাগ্রস্ত কিছু। মন্থর তার গতি। সে নিজেই চলতে পারে না; অন্য কিছুকে চালিত করবে কীভাবে? স্থবির জঙ্গমে স্পন্দন সৃষ্টির উপযোগ কী করে আসবে?

ইসলামের ইতিহাসে মুজাদ্দিদ তথা সংস্কারকদের একটি ধারা রয়েছে। হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয, হাসান বসরি, আবু হানিফা, আবুল হাসান আশআরি, ইমাম গাযালি, রাযি, ইবনে আরাবি, আব্দুল কাদির জিলানি, খাজা মাইনুদ্দীন চিশতি, মুজাদ্দিদ আলফে সানি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, শাহ আব্দুল আযীয থেকে নিয়ে আমাদের দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবির মাওলানা কাসিম নানুতুবি, রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি, শাইখুল হিন্দ, মাওলানা ইলয়াস ও শাইখুল ইসলাম মাদানী পর্যন্ত মনীষীদের এক অনন্য ধারা।

শতাব্দিতে যে একজনই মুজাদ্দিদ হতে পারবেন এমন কোনো কথা নেই। প্রয়োজন অনুসারে এক সময়ে বহু সংস্কারক যুগপৎ কাজ করতে পারেন। তবু সত্য হচ্ছে, উচ্চ ধী সম্পন্ন বিদগ্ধ ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী মনীষী ইতিহাসে খুব বেশি পাওয়া যায় না। ইজতিহাদ ও তাজদীদের গুণ সব লোকের থাকে না। সীমিত কিছু মনীষীর মাঝেই সংস্কারক হবার যোগ্যতা থাকে। আবু হানীফা বা গাযালি অসংখ্য হয় না। মাওলানা নানুতুবি বা মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি শতাব্দিতে দু একজনই জন্মান।

সময়ের প্রেক্ষাপট অনুসারে মুজাদ্দিদরা দীনের কাজের জন্য একেকটি স্ট্রাকচার দাঁড় করান। সময়ের সাথে সাথে নতুন স্ট্রাকচার পুরনো হয়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্ম মূল স্প্রিট ভুলে উপরের স্ট্রাকচারকেই মূল ভাবতে শুরু করে। তাদের জীবনাচারে দেখা দেয় খোলস সর্বস্বতা। রসহীন মগজহীন কেবল উপরের খোসা। ভেতরশূন্য দ্বীনদারি একধরনের নেফাকি। নতুন সংস্কারকের প্রয়োজন হয় এখান থেকেই। আবু হানীফা বা হাসান বসরি যে সব সংস্কার কাজ করেছেন তা নবীজীর সীরাতেই আছে। তারা কুরআন সুন্নাহ ঘেটে কেবল আবিষ্কার করেছেন। একটি উদহারণ দিব তাতে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। মাটির নীচে পাতালে হাজার বছর ধরেই পানি আছে। কিন্তু ডিপ মেশিনে পানি উঠানো হলো আজ। এর অর্থ এ নয় যে আজকের আগে এখানে পানি ছিল না। এই পদ্ধতি এবং স্থান-কাল ভিন্ন কিন্তু পানি এখানে আগে থেকেই ছিল। প্রত্যেক সংস্কারকই পানি তোলার মত কেবল সীরাত থেকে যার যার পরিবেশ অনুসারে কর্মপদ্ধতি আবিষ্কার করেন। সংস্কারকদের যার যার সময়ের নতুন কিছু চাহিদা থাকে তা পূরণ করতে হয় আর পরিস্থিতি বুঝে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। ইসলামের দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে মুজাদ্দিদদের ধারাবাহিকতায় আমরা এটাই দেখতে পাই।

বর্তমান যে সময় তাতে তাজদীদী কোনো নতুনধারা সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই সময়কে আমাদের বুঝতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেছেন, যে তার সময়কে বুঝবে না সে কোনো আলিমই নয়। আমাদেরকে তাই আমাদের সময় সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। এসময়ে পুরনো যতগুলো দ্বীনের মেহনতের ধারা রয়েছে সবগুলোতে ঘুনে ধরেছে। জড়তা ও জুমুদে আক্রান্ত পুরনো দ্বীনের মেহনতগুলো। তাবলিগ বা মাদারিস, খানকাহি নেজাম বা ধর্মীয় সংগঠন সবখানেই একটা শূন্যতা অনুভব করা যাচ্ছে। ইসলামের মূল রস যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ এবং আলেম উলামা আওয়াম খাওয়াস সব মহলেই সমস্যাগুলো উপলব্ধি করা যাচ্ছে।

প্রত্যেক মাসে তিন দিন আমরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে উলামা ও আওয়ামকে নিয়ে একেকটি ইসলাহি প্রোগ্রাম করব। সমস্ত বাতিল শক্তির গায়ে যেন তাতে একটা ধাক্কা লাগে। মানুষ যেন সত্যের দিকে ফিরে আসে। পার্থিব মোহ ছেড়ে মহান মালিকের দিকে অগ্রসর হয়।

আমাদের যে পরিস্থিতি তাতে বাংলাদেশে কোথাও গিয়ে পা রাখব সেই সুযোগও নেই। বাতিলরা আমাদেরকে আমাদের লোকজন থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছে। কোথাও গিয়ে দুটো কথা বলবো সেই পরিবেশ নেই। তাই বলে বসে তো থাকা যাবে না। দ্বীনের কাজ করে যেতে হবে আমৃত্যু। আমাদের আকাবিররা চরম বিরূপ পরিস্থিতিতেও থেমে থাকেননি। তাদের মিশন নিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। গত শতকের চল্লিশের দশকে হজরত শাইখুল ইসলাম মাদানী রহ.-এর অবস্থা এমন হয়েছিল। পুরো ভারতে কোথাও তার যাবার জায়গা ছিল না। পূর্ব বাংলায় তার দীর্ঘ দিনের যাতায়াত ছিল। অসংখ্য ভক্ত মুরিদান ছিল এক সময় এ অঞ্চলে। সেই সেখানেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এমন চরম বিরূপ পরিস্থিতিতেও তিনি সেই ৪৬ সালে একটি প্রোগ্রামে রংপুর সৈয়দপুর আসেন। এখানে তাকে হেনস্তা হতে হয়। তার পাগড়ি খুলে পাড়ানো হয়। টুপিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দাড়ি ধরে টানা হয়। একজন ইংরেজ অফিসার তাকে সেই অবস্থা থেকে রক্ষা করেন। ইতিহাস পড়ার সময় ভাবতাম সে সময় মাওলানা মাদানির ঘর থেকে বের হবার কী প্রয়োজন ছিল? আসলে যারা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করেছে আল্লাহর দ্বীনের কাজে তারা কখনও কোনো পরিস্থিতির কারণে দমে যেতে পারেন না।

কোনো আশা থাক বা না থাক আমাদের তো কাজ করে যেতে হবে। আমাদের হুজুরের কাছ থেকে এ শিক্ষা আমরা পেয়েছি। সফরের শুরুতে হুজুর একথা বললেন, শুধু আল্লাহর জাতের উপর ভরসা করে আমরা বের হচ্ছি। আল্লাহর নুসরতের দিকে তাকিয়ে আমরা বের হচ্ছি। অন্য কোনো দিক থেকে কোনো আশা নেই। কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যায় না। আমাদের ডাকে একটা মানুষ সাড়া না দিক আমাদের এই বের হওয়া অর্থহীন হবে না। এর প্রতিদান আমরা আখেরাতে অবশ্যই পাব।

খুলনার কথা

এক যুগ পরে আমি খুলনা এলাম। এর আগে আমার এক সহপাঠির বাড়ি বেড়াতে এসেছিলাম খুলনা শহরে। ছেলে বেলায় বেশ কবারই আসা হয়েছে। আমাদের বাড়ির কাছে হওয়ায় এখানে আসা যাওয়া ছিল সহজ। বেড়ানোর সে সময় কবে পেরিয়ে গেছে। মাদরাসা মসজিদের দায়িত্ব এবং পড়া শোনার ব্যস্ততায় আর কোথাও যেতে পারি না। এবার ইসলাহি প্রোগ্রামে এখানে এসে দেখি সেই আগের মতই খুলনা রয়েছে নিরিবিলি এক উন্মুক্ত গ্রামীণ শহর। আমাদের ঢাকার মানুষের কাছে অবশ্য ঢাকার বাইরে সবখানেই গ্রামীণ পরিবেশ বলে মনে হয়।

কাটাখালিতে আমরা অপেক্ষা করছি। হুজুরের গাড়ি এসে পৌঁছতে সময় লাগবে। একজন ডিআইজি তার গড়া একটা স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছেন। প্রশাসনের এমন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চন্দ্রদীঘলিয়ায় দেখলাম নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে হুজুরকে বসতে দিলেন। মূলত চন্দ্র দীঘলিয়ায় আগে থেকে রাবেয়া স্কুল এন্ড কলেজে দুআর জন্য আমাদের কিছু সময় অবস্থানের কথা ছিল। দুআ শেষে আমরা চলে আসলাম খুলনা। এরপর হুজুরকে ডিআইজি মহোদয় নিজের গ্রামের বাড়ি নিয়ে গেলেন। কাটাখালি আমাদের অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো।

মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী, তার মাদরাসার শিক্ষক ও খুলনায় হুজুরের ভক্তবৃন্দ আমাদের ইস্তিকবালের জন্য এখানে সেই সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সাথে খুলনা শহরের আরও অনেক মানুষ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি তাদের সাথে হুজুরের জন্য এখানে অপেক্ষা করব না মাদানি নগর মাদরাসা আমাদের গন্তব্যে চলে যাব। আমি বললাম, গন্তব্যে চলে গেলেই ভাল। আমরা একই গাড়িতে আছি বেশ কজন। আমাদের দলনেতা মাওলানা মাকনুন। সাথে আমরা তরুণ কয়েকজন। মাওলানা মাসউদুল কাদির। শেখ মুহাম্মাদ। মুফতি আদিল। মাওলানা শোয়ইব। সিনিয়র নেতৃবৃন্দ আরেক গাড়িতে। মাওলানা শোয়াইব ভাই বললেন, না আমরা হুজুরের সঙ্গেই এখান থেকে যাব। পরে দেখলাম তার সিদ্ধান্তই ভাল হয়েছে। খুলনার মানুষ আমাদের নিয়ে যখন কাটাখালি থেকে গন্তব্যের পথে যাচ্ছিল সে অন্যরকম এক দৃশ্য ছিল। প্রায় একশটি মটর সাইকেল আর গোটা দশেক প্রাইভেট কারের বহর। বুঝতে পারলাম বাংলাদেশের দক্ষিণে আমাদের একটি শক্ত দুর্গ রয়েছে।

মাদানী নগর মাদরাসা

খুলনা জিরো পয়েন্টের কাছেই মাদানি নগর মাদরাসা। যতটুকু সময় ছিলাম মনে হয়েছে আমরা আমাদের জামিয়া ইকরার ভেতরেই রয়েছি। এখানের ছাত্র শিক্ষকদের আন্তরিকতায় আমরা খুবই মুগ্ধ হয়েছি। সারা দিন আমলে কেটেছে। রাত তিনটায় সবাই উঠে গেছে। আর রাত ১২টা /একটা বেজেছে ঘুমুতে। সারা দিন তাসবিহ তাহলিল তালিম তারবিয়াত বারো তসবির যিকির বয়ান নসিহত এবং ইসলাহি বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমাদের সাথে তারাও ব্যস্ত থেকেছে। তাদের এর ভেতর দিয়েই মেহমানদের খাওয়া দাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ের খোঁজ খবর নিতে হয়েছে। এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও বার বার এসে হাল হাকিকত জিজ্ঞেস করেছেন। মাওলানা মেসবাহ, মাওলানা আসজাদ, মাওলানা আযীয ভাই পারলে যেন তাদের হৃদয়টাই খুলে দেন। দেখলাম, আমাদের ইকরার মতই প্রতিষ্ঠানের প্রতি এখানের ছাত্র শিক্ষকদের অন্যরকম ভালবাসা রয়েছে।

হাজার অপপ্রচার সত্ত্বেও মাদরাসার প্রতি তাদের ভালোবাসা কমেনি। আমাদের ধারার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কথা শুনলাম সেখান থেকে অপপ্রচারের কারণে ছাত্র চলে গেছে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা দুর্দিনে আমাদের কিছু প্রতিষ্ঠানে তালিবুল ইলমদের মনে প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রগাঢ় টান সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এখানে এই মাদানি নগরেও শুনলাম পুরাতন ছাত্ররা তাদের আদর্শে অবিচল। আকাবির আসলাফের ফিকির ও যেহনিয়াত নিয়ে তারা ঝড়ের মুকাবিলা করতে প্রস্তুত। এই তরুণ বয়সেই তারা ¯্রােতের বিপরীতে সত্যের মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিখছে। মাবুদ সব কিছুতে কেবল তোমারই প্রশংসা। তোমার জন্যই সমস্ত তারিফ।

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার ব্যানারে এ সফর শুরু হলেও সাংগঠনিক ক্ষুদ্র কোনো সফর নয় এটি। পুরো পৃথিবীতে বাতিল অপশক্তিকে একটা নাড়া দেওয়া এ সফরের উদ্দেশ্য। বিশেষত বাংলাদেশের দ্বীনী মাহলে যে অনাকাঙ্খিত এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার পরিবর্তন সাধন আমাদের লক্ষ্য। জমাটবদ্ধতা কেটে প্রিয় নবীজীর আদর্শে পরিপূর্ণভাবে ফিরতে পারে দেশের আওয়াম ও উলামা। এজন্য হয়ত আরও দীর্ঘ সাধনা আমাদের করতে হবে। যে কাজ আমরা শুরু করছি তার পূর্ণ রূপরেখা তৈরি হতে সময় লাগবে। তবে সুদূর প্রসারি এক লক্ষ্য নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের আরও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ত্যাগ আর মুজাহাদার কথা বললেন আমাদের রাহবার। বললেন, নবীজীর সুন্নাতের কথা। হক ও হাক্কানিয়াতের কথা। জিহাদ ও ইলায়ে কালিমাতুল্লাহর কথা। ইসলামি পরিভাষাগুলো নিয়ে বাতিলপন্থিরা সাধারণ মানুষের আবেগের সাথে খেলা করছে। ভুল পথে পরিচালিত করছে। তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাতিল যে সুরতে আসবে তাদের প্রতিহত করতে হবে সেই পন্থায়। পুরনো এসব কথা যেন নতুন করে শুনলাম আমরা।

অনুপ্রাণিত হলাম। দুআ ও রোনাযারিতে খোদার কাছে উম্মতের হাল তুলে ধরলাম। আহলে দিলের সোহবতে থেকে আমাদের সবার অন্তরেই জ¦ালা সৃষ্টি হলো। উম্মতের জন্য দরদ সৃষ্টি হলো। উম্মতপনা নিয়ে আমরা গভীর রাতে খোদার কাছে ফরিয়াদ করলাম। এর ভেতরে চলল, সালিকীনের বাইআত, দাওরার ছাত্রদের বুখারির দরস, সাধারণ মানুষের তালিম ও তাযকিয়া দরস ও ইসলাহ দাওয়াত ও জিহাদের সমন্বিত এক চর্চা। নবীজীর যুগে এক সাথে এই কাজগুলো চলত। আমাদের পূর্ণ সাফল্য পেতে সেখানেই ফিরে যেতে হবে যেখানে উম্মতকে ছেড়ে গিয়েছিলেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

শেষ রাত

একটি বন্ধ রুমে আমরা সমবেত হলাম। জমিয়তের নেতৃবৃন্দ অনেকেই সেখানে ছিলেন। মাওলানা আব্দুর রহীম কাসেমী, মাওলানা হুসাইন আহমাদ, মাওলানা মাকনুন ভাইসহ কয়েকজন কথা বললেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ছিল। এখানে দেশের প্রখ্যাত বক্তা মাওলানা ইয়াহয়া মাহমুদ সাহেবও ছিলেন। তার কিছু কর্মকাণ্ড জমিয়তকর্মীদের ব্যথিত করে। প্রকৃত কথা হলো, জমিয়ত কখনো কারও ঘারে সওয়ার হয়নি। জমিয়ত একটি জেহনিয়াতের নাম। এ স্রোতে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুতরাং এ জেহনিয়াতে চলতে চাইলে তারাদ্দুদ বা সংশয়বাদি হলে চলবে না।

এমন কিছু কথা আছে যা লিখতে আমার একদম মনে চায় না। তবু কিছু কথা না বলে পারা যায় না। সত্য বলতে আমাদের ভাবনায় কোন দুর্বলতা নেই। কিন্তু কাউকে অশ্রদ্ধা করা আমরা শিখিনি।

হযরত শাইখুল হিন্দের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তারই একান্ত শিষ্য মাওলানা মুর্তজা হাসান চাঁদপুরি। মাল্টার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার ছ মাস পর একবার শাইখুল হিন্দ গিয়েছিলেন মুরাদাবাদ। সেখানে মুর্তজা হাসান চাঁদপুরি সাক্ষাৎ করতে আসেন। মাওলানা মাদানী ছিলেন। আর ছিলেন মাওলানা উযায়ের গুল। শাইখুল হিন্দ ঘরের ভেতর ছিলেন। বারান্দায় মাওলানা মুর্তজা। উযায়ের গুল তাকে দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে গেলেন। বললেন, ইচ্ছে হয় একে কতল করে ফেলি। আমাদের হজরতকে কী কষ্ট দিয়েছে। শাইখুল হিন্দ বুঝতে পেরে মাওলানা উযায়ের গুলকে শান্ত করেন।

আজকাল বিচ্যুত আমাদের মনীষীদের প্রায় বলতে শোনা যায় হুজুর নাকি বলেছেন, তোরা আমার কারণে নিজেদের উপর বিপদ টেনে নিবি না। নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য যদি কখনও কিছু আমার বিরুদ্ধে বলতে হয় বলবি। এই কথাটির ভেতর কী পরিমাণ কষ্ট আর সূক্ষ্ম অভিমান লুকিয়ে আছে তা স্থূলদর্শীরা বুঝতে পারে না। একথায় কী অনুমতি দেওয়া হয়েছে পথচ্যুত হবার? বদরি সাহাবীদের নবীজী বলেছিলেন, ইমালু মা শিতুম। তোমাদের যা ইচ্ছে হয় করো। তোমাদের আগের পরের সব গুনাহ মাফ করা হয়েছে। এ ঘোষণা শুনে সাহাবায়ে কেরাম কি এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন? তারা বরং আরও বেশি ত্যাগের পথে অগ্রসর হয়েছেন। নবীজীর অনুসরণে বলেছেন, আফালা আকুনু আব্দান শাকুরা। সূক্ষ্ম সমজদারি আমাদের ভেতর থেকে আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। বেরসিকের মত আমাদের কেমন স্থূল ভাবনা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সকলের সুবুদ্ধি দিন।

এ লেখাটি যখন লিখছি তখনই ফুয়ুজুল হারামাইনে [১০৬ পৃ. করাচি, দারুল ইশাআত সংস্করণ] শাহ ওয়ালিউল্লাহর দারুণ এক গবেষণা চোখে পড়ল। তিনি লিখেছেন, বুযুর্গদের অনেকের কাছেই আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য আর শরিয়াতের কয়েদ নেই; তোমরা মুক্ত; নামাজ কালাম কিছুই করতে হবে না। এই ইলহাম শাহ ওয়ালিউল্লাহর বাবারও হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, তোমার জন্য ইবাদত বন্দেগি করা আর আবশ্যক নয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর চাচাকেও একই ধরনের ইলহামে বলা হয়েছিল, যদি জান্নাতের জন্য ইবাদত কর তাহলে জেনে রাখ তোমার ইবাদত ছাড়াই তোমাকে জান্নাত দিব, যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য করো তবে জেনে রাখ জাহান্নাম থেকেও তোমাকে মুক্তি দিয়ে দিলাম।

যদি আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত কর তবে তার জন্যও আর আমার ইবাদত করতে হবে না। শাহ সাহেব বলেন, কিন্তু বুযুর্গদের কেউ এ ইলহামের এ অর্থ গ্রহণ করেননি যে তারা শরিয়াতের কয়েদ থেকে মুক্ত স্বাধীন। বরং এর অর্থ হচ্ছে- এখন যে তুমি ইবাদত করবে তা তোমার তবীয়ত হয়ে গেছে শরিয়াতের কয়েদের কারণেই করছ এমন নয়। এক কথায় এটা একটা ব্যাখ্যামূলক ইলহাম; যা কামিলিনরা বুঝেছেন। স্বপ্নের মত ইলহামেরও তাবির হয়। বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য হয় না। আল্লাহর ওলিরাও অনেক সময় হেয়ালিপূর্ণ কথা বলতে পারেন। সেগুলির ব্যাখ্যা না করে স্থূল অর্থ গ্রহণ করা কোনো বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।

আখেরি মুনাজাত

আখেরি মুনাজাত হলো সকাল দশটায়। মাদানী নগর মাদরাসার অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবাইকে নিয়ে। এর আগে বাইরে থেকে আগত মুসুল্লি সাধারণকে নিয়ে শেষ দুআ অবশ্য আরও কিছুক্ষণ আগে মসজিদের উমুমি বয়ানের পরে হয়ে গেছে। খুলনা ছাড়ার পূর্বে আবারও আমরা মুনাজাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম। ক্রন্দনরোলে ভরে গেল বাতাস। ভারী হয়ে গেল পরিবেশ। এমন কেউ নেই যার চোখে পানি নেই। মুনাজাত নিয়ে কিছু বলব না। আমাদের হুজুরের দুআ আর কান্নাকাটি সম্পর্কে সবাই জানে। মজার একটি ঘটনা দিয়েই শেষ করব আজকের সংক্ষিপ্ত সফর নামা। পথে মুন্না ভাইয়ের হুগলি বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে ঢুকে মুন্না ভাইয়ের কারখানা এবং তার অসুস্থ স্ত্রীর জন্য দুআ করলাম। এরপর গাড়িতে চড়ে বসলাম ঢাকার উদ্দেশে। এ সময় আমাদের শেখ মুহাম্মদ বলল, আখেরি মুনাজাতে তার পাশেই মাদানী নগর মাদরাসার একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখেছে, সেও ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।

শেখ বলল, দৃশ্যটা খুব দেখার মত ছিল। মাওলানা মাসউদুল কাদির বললেন, আরে তুমি এই দৃশ্যটা ভিড়িও করেছ? শেখ বলল, না। আমিও খুব আক্ষেপ করে বললাম, কেন? আর তখন খুব আবেগ থেকেই শেখ বলল, হুজুর! আমাদের কি মুনাজাত নেই! আমিও তখন দু হাত তুলে মুনাজাতে শরিক হয়েছিলাম। দৃশ্য ভিডিও করতে গেলে আমার তন্ময়তা নষ্ট হত। মূলত আহলে দিলের সুহবতে সবার ওপরই প্রভাব সৃষ্টি করে। দারুল উলুম দেওবন্দের কথা উস্তাদদের মুখে শুনেছি, এক সময় সেখানে বুখারির শায়েখ থেকে নিয়ে একজন আদনা মুলাযিম পর্যন্ত সকলেই তাহাজ্জুদ গুজার সাহিবে নিসবত বুযুর্গ ছিল। সেসব দিন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে।

শেষ করার আগে কৃতজ্ঞতা জানাব কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে। মাদানি নগর মাদরাসার পাকিস্তানি হুজুর, খুলনা খালিশপুরের মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ, আমার বন্ধু খুলনা মার্কাজুল উলুম মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা রবিউল ইসলাম রাফে, খালিশপুরের অনার্সের ছাত্র কবি শাফিন ও তার সহপাঠি মাহদি, উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-এর ভাতিজা কাজি আরশাদ। আরেকজন ছিলেন আমার দেওবন্দের সহপাঠি মাওলানা কুদরতুল্লাহ ভাইয়ের শ্বশুর আমাদের হুজুরের প্রথম দিককার ছাত্র মাওলানা..।

এই মাওলানা একটা শুভলক্ষণের কথা বললেন, তাবলিগের কাজ বাংলাদেশে শুরু হয়েছে এই খুলনা থেকে। বড় হুজুর মাওলানা আব্দুল আযীয রহ.-এর বাড়ি এই খুলনা জেলাতেই। কাজেই আমাদের নতুন মেহনতের সূচনাও খুলনা থেকে শুরু হওয়া একটি শুভ লক্ষণ বটে। নেকফাল গ্রহণ করা নবীজীর সুন্নাত। আমরা সানন্দে এটি গ্রহণ করলাম। আরও অনেকেই আমাদের সাথে আমলে শরীক ছিলেন। তিন দিনের ইসলাহি ইলমি রূহানি সফরে তাদের সান্নিধ্য আমাদের সফরকে আরও সুন্দর এবং আনন্দদায়ক করেছে। আল্লাহ তাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। আমীন।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *