আদিল মাহমুদ—এর দু’টি কবিতা

আদিল মাহমুদ—এর দু’টি কবিতা

আম্মাকে বলেছি

আম্মাকে বলেছি—
আমাকে একটি কবিতা লিখে দিবে
বড় কোন কবি সাহিত্যিকের মত করে নয়
একদম নিজের মত করে
যে ভাবে তুমি বুঝো
তোমার নবজাতক সন্তানের কান্নার ভাষা
কখন কাঁদে ক্ষুদায়, কখন কাঁদে অন্য কোন বেদনায়

একটা তরকারিতে কতটুকু লবন ও মশলার মিশ্রণে
অমৃত পরিবেশন করতে হয়।

তুুমি কবিতায় লিখবে—
কিভাবে তোমার ঘুম ভাঙে শেষ রাতে হঠাৎ বৃষ্টি এলে
টেবিলের পাশের জানালাটা বন্ধ করার জন্য
কিভাবে ফর্সা টানটান মায়াবী চেহারায়
কালো মেছতা দাগ পড়লো
কিভাবে মাথাভর্তি চুল একটু একটু করে পড়ে গেলো
কিভাবে তোষকের নিচে জমানো টাকাগুলো
সন্তানের প্রয়োজনে দিয়ে দাও
কিভাবে মাসের শেষে বাড়ি ভাড়া, কারেন্টবিল, মাস্টারের বেতন
সমস্ত কিছুর টানটান হিসেব কষো

তুমি লিখবে, বাবাহীন মধ্যবিত্ত সংসারের
হাজারো চিন্তায় রাতে ঘুমাও কখন।

আম্মাকে বলেছি—
তোমার দুই যুগের সংসারের গল্প দিয়ে
আমাকে একটি কবিতা লিখে দিতেই হবে তোমাকে
সুফিয়া কামাল কিংবা চন্দ্রাবতী মত করে নয়!
একদম নিজের মত করে। একদম নিজের মত করে

মা যে ভীষণ মিথ্যাবাদী

সকালে নাস্তা করি না, মা সেটা জেনে গেছে
কিন্তু কি করবে এখন!
নাস্তা করার কথা বললে তো আমি ঘুম থেকে উঠি না
দেখি মা জানালা খুলে দিয়েছে
ঠান্ডা বাতাস, মৃদ আলো দেখে—
হালকা ঘুমের আবছায় অবচেতন মনে ডাকি
মা, মা, তুমি জানালা খুলেছো নাকি!

মা বলে— উঠ, সকালের হাওয়া, প্রকৃতির চাওয়া
গায়ে লাগিয়ে নেয়, বাইরে যা।
আমি কিন্তু বুঝেছি
আমি যাতে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করি
সে জন্যে মা এমনটি করছে
আর এখন আমাকে ওসব মিথ্যে বলছে

দুপুরে খানা খাচ্ছি
আমার প্লেইটে কত কিছু দিচ্ছে মা
কিন্তু মায়ের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে
আমি জিজ্ঞাসা করি, কি হয়েছে মা! কাঁদছো কেন?
মা বলে— কই না তো! কাঁদছি কোথায়!
চোখটা খুব জ্বালাপোড়া করছে
তাই হয়ত পানি বের হচ্ছে।
আমি বুঝেছি
আগে আমি বাসায় আসলে মায়ের চোখের আনন্দের ছাপ থাকতো
তার সব ছেলে এক সাথে বাসায়।
আর এখন, আমি বাসায় আসছি
বড় ছেলে বাসায় নেই, এ জন্যে কান্না করছে
আমাকে এমনিতেই মিথ্যে বলছে

চারটা হয়ে গেছে, শাকিল এখনো আসছে না
মা দেখি একটু পর পর ব্যালকনিতে যায়
পথ পানে থাকিয়ে কতো কি ভাবতে বসে
আমি বলি, মা একটু পরপর ব্যালকনিতে যাও কেন?
মা বলে— এমনিতেই হাঁটাহাঁটি করছি।
আমি ঠিকই বুঝেছি
স্কুল থেকে আসতে শাকিলের একটু দেরী হচ্ছে
তাই এমন করছে মা
কিন্তু আমাকে শুধু শুধু মিথ্যে বলছে।

সন্ধ্যার পর কলিংবেলের শব্দ
দরজাটা আমিই খুলি
দেখি নিচের তালার খালা চারটা মিষ্টি নিয়ে হাজির
চারটা মিষ্টি দেখার সাথে সাথে মা বলে—
আমি বিকালে খালার ঘরে গেছি, তখন মিষ্টি খাইছি
তোরা চার জন খা এখন এই চারটা।
আমি দেখেছি এবং জানি, মা বিকালে কোথাও যায়নি
অথচ মিষ্টিগুলো আমাদের খাওয়ানোর জন্যে এখন মিথ্যে বলছে।

একটু আগে আপু বলছে— জীবনে তো কতো কিছু নিয়ে কবিতা লেখলি
আজ ‘বিশ্ব মা দিবস’ এ মা নিয়ে কবিতা লেখ
আমি বললাম, না
কেন লিখবি না? পারবি না নাকি?
সেটা না, তাহলে কারণ কি?
কারণ— তোমার মা যে ভীষণ মিথ্যাবাদী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *