আমার দেখা মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী রহ.

আমার দেখা মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী রহ.

আমার দেখা মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী রহ.

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ছোট বেলায় ওয়াজ মাহফিলের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল আমার। কোথাও ওয়াজ মাহফিল হলে বাবার সাথে চলে যেতাম। গভীর রাতে ওয়াজ শুনে বাড়ি ফেরা হত। ওয়াজ মাহফিলের প্রচারণা শুনলে দৌড়ে যেতাম সেখানে। পোস্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেট সংগ্রহ করে রাখতাম।

পোস্টার গুলো ঘরে টানিয়ে রেখেছি। হ্যান্ডবিল গুলো জমা করে এক জায়গায় সংরক্ষণ করতাম। এগুলো আবার মাঝে মধ্যে মুতালায়া করা হত। এই পোস্টার হ্যান্ডবিলে একদিন নাম দেখলাম, মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী সাহেবের সাথে। আমাদের বাড়ি থেকে দশ কিলোমিটার দূরে সরকেল ডাঙ্গা মাদ্রাসায় হাফেজ্জী হুজুর ( রহঃ) এর সাথে পোস্টারে তাঁর নাম ছিল।

আমাদের বাড়ি থেকে যেহেতু অনেক দুর, সে কারণে সেই প্রোগ্রামে যেতে পারিনি। তিনি এসে ছিলেন হাফেজ্জীর সঙ্গে। বয়ান ও করে ছিলেন। এর কিছু দিন পর আবার আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি মাদ্রাসার মাহফিলে এসেছিলেন। আমার আব্বা সেখানে ছিলেন। কাসেমী সাহেবের বয়ান শুনে এসেছিলেন তিনি।

আব্বা বয়ান শুনে এসে কাসেমী সাহেবের ভুয়সী করেছিলেন। কাসেমী সাহেবের জ্ঞান গর্ভ বয়ানে স্রোতাদের মন ভরে গিয়েছিল সেদিন। এর পর আব্বার মুখে সব সময় শামসুদ্দিন কাসেমীর প্রশংসা শুনতাম। তিনি যে একজন মুহাক্কিক আলেম, সেটা তখন ছিল সবার মুখে মুখে।

যখন ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসায় পড়তাম, শামসুদ্দিন কাসেমীকে চিনলাম কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলন থেকে। রাজপথের একজন লড়াকু সৈনিক। একজন মর্দে মুজাহিদ ব্যক্তিত্ব। আপাদামস্তক একজন নায়েবে নবী। ওলামায়ে দেওন্দের বাস্তব নমুনা।

যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, বিরামহীন ভাবে সংগ্রাম চালিয়ে গিয়ে ছিলেন। বিন্দু মাত্র বাতিলের সাথে আপোস করতে দেখিনি তাঁকে। দেওবন্দের সাথে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী যখন আসতেন, তাঁকে দেখতাম প্রথম সারিতে। তাঁর আমন্ত্রণে ফেদায়ে মিল্লাত সে সময় বেশির ভাগ ঢাকায় এসেছেন।

শামসুদ্দিন কাসেমী সাহেব একজন উদার ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মত উদার আলেম কমই দেখা মেলে। শামসুদ্দিন কাসেমী সাহেবের একটা বড় বৈশিষ্ট ছিল, তিনি মেহমান নেওয়াজ। মেহমানদের প্রাণ খুলে আপ্যায়ন করতেন। ঢাকা শহরের বড় বড় রাজনীতিবিদদের আসা যাওয়া ছিল আরজাবাদ মাদ্রাসায়। তাঁরা প্রসংসায় পঞ্চমুখ ছিল কাসেমী সাহেবের। আরজাবাদ মাদ্রাসায় কোন মিটিং হলে কেউ কখনো মিস করত না। কেননা, কাসেমী সাহেবের প্রাণ খোলা মেহমানদারী গ্রহণ করার পাগল ছিল সবাই।

ছিয়ানব্বই সালে যখন দেওবন্দে ছিলাম, একদিন সংবাদ পেলাম, কাসেমী সাহেবের ইন্তেকাল হয়ে গেছে। দেওবন্দে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। আমরা বাঙালি ছাত্ররা দেওবন্দের মসজিদে কদীমে দোয়ার অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার ইন্তেজাম করেছিলাম।

দেওবন্দ থেকে ফিরে আরজাবাদ মাদ্রাসায় বহুবার গিয়েছি। বিভিন্ন প্রোগ্রামে শরীক থাকার চেষ্টা করি এখনো। বিশেষ করে ফেদায়ে মিল্লাত যখন আরজাবাদ আসতেন, যাওয়া হত বেশী।

আরজাবাদের অনেক উস্তাদদের সাথে আমার বন্ধুত্ব। বিশেষ করে কাসেমী সাহেবের ছেলে, বর্তমান মুহতামিম বাহাউদ্দিন জাকারিয়া সাহেব আমার একজন দোস্ত। এক সাথে একবার চট্রগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন সফর করেছিলাম।

ঢাকায় গেলে এখনো আরজাবাদ মাদ্রাসায় যাওয়া পড়ে। দেখা হয় কাসেমী খান্দানের অনেকের সাথে। কাসেমী সাহেবের মত মর্দে মুজাহিদ আলেমর বড় অভাব এখন। তাঁর কথা বড্ড মনে পড়ে আজ। আমরা দুআ করি, সেই মহান আলেমের জন্য। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *