আলেম উলামার ঈদ পুনর্মিলনী

আলেম উলামার ঈদ পুনর্মিলনী

আলেম উলামার ঈদ পুনর্মিলনী

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আলেমগণ তো মানুষের খেদমত নিয়ে থাকেন সারাক্ষণ। সারাটা বছর কাটে মানুষের পাশে। আনন্দ উৎসব এর দিন যতই আসুক, তাঁরা মানুষের পাশেই থাকে। নিজের পরিবার পরিজনের সাথে সময় দেওয়া হয় না।

এই যে ঈদুল ফিতর গেল, আলেম উলামাদের মধ্য থেকে কম লোকই ছুটি পেয়েছে তার পরিবারের সাথে ঈদ করার জন্য। বাকি সকলেই ছিলেন, নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়ে। নিজের কর্মস্হলে।

আমি নিজেও সেরকম এক পরিবারের সাথে যুক্ত হয়ে আছি। অবশ্য নিজে ছুটি পেলেও, আত্মীয় স্বজন সবই ছিল তাদের কর্মস্হলে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত।

আমার পরিবারের কেউ আছেন মাদ্রাসার স্বনাম ধন্য মুহাদ্দিস। কেউ ঢাকা শহরের নামকরা মসজিদের ইমাম।কেউ বড় মাদ্রাসার মুহতামিম। কেউ মুফতি। কেউ আদীব।

মানে আলেম উলামায় ভরপুর একটি পরিবার। হাফেজে কুরআনের এক বড় জামাত। আত্মীয় স্বজনের প্রায় সকলেই হাফেজ,মাওলানা,মুফতি। বলা যায় আলেম উলামায় সমৃদ্ধ এক পরিবার।

বড় আনন্দের বিষয়, ঈদে আমরা কেউ এক জায়গায় না হতে পারলেও আজকে আমরা সব একত্র হয়েছি। বড় খুশির দিন আমাদের।

আজ আমাদের ঈদ পুনর্মিলনী হচ্ছে। কোন আড়ম্বর পূর্ণ জমকাল অনুষ্ঠান নয়। একদম সাদা মাঠা। তবে এতে আনন্দ যে অনেক বেশী। এক সঙ্গেই খাওয়া দাওয়া। এক সঙ্গে ঘুমান।

বিশাল বাড়ীর কোথাও জায়গা নেই। আত্মীয় স্বজনের মহিলা মেম্বার সব দখল করে আছেন। আমরা আছি পার্শবর্তী মাদ্রাসার এক হল রুমে। সবাই ফ্লোরে। গল্প গুজব আর আড্ডা। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা। বিশেষ করে দ্বীনি মাসয়ালা মাসায়েল। দেশীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি।

আমাদের এই পরিবারের মধ্যে অনেক হাফেজে কুরআন আছে, যারা আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ। অনেক হৃদয় গ্রাহী তেলাওয়াত করে থাকে। মাঝে মধ্যে তাদের তেলাওয়াত ও শুনছি আমরা।

তবে ইচ্ছে আছে বন্ধুদেরকে একটু কোরআন তেলাওয়াত শোনানোর। সময় হলে শোনাব ইনশাআল্লাহ।

ঈদের নামাজ ও আমরা

বছরে দুইবার ঈদের নামাজ আমরা পড়ি। একটা ঈদুল ফিতর, আরেকটা ঈদুল আজহা। ঈদুর ফিতর রমজানের পর শওয়ালের এক তারিখ। আর ঈদুল আজহা ১০ জিলহজ্জ পড়া হয়ে থাকে। ঈদের নামাজ অনেকদিন পরে আসে। বছরে মাত্র দুইবার। একারণে এই নামাজের নিয়ম আমাদের অনেকেরই অজানা। নামাজ পড়ার তরিকা আমরা শতকরে ৯৯ জন লোকই জানিনা।

আসল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম যেখানে অনেকেই অজ্ঞ।সেখানে ঈদের নামাজ তো অনেকদিন পরে আসে।  তাই ঈদের এই নামাজ অনেকেই ভুল করে থাকেন। বিশেষ করে অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের ক্ষেত্রে সব চেয়ে বেশী প্যাঁচ লাগে। দ্বিতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার পুর্বে যখন অতিরিক্ত তাকবির বলা হয়, তখন তো অনেকই খেই হারিয়ে ফেলেন। কেউ তো ইমামের সাথে সাথে তাকবীর বলেন, আর কেউ কেউ রুকুতে চলে যান।

আবার তকবির বলার সময় হাত উঠাতে হবে কিনা সেটা নিয়েও এলোমেলো করেন। কেউ হাত উঠান, আর কেউ জানাযার নামাজের মত হাত না উঠায়ে থাকেন।

মানে নামাজের সঠিক নিয়ম না জানা থাকলে যা হবার তাই হয়।

এটা একটা আফসোসের বিষয়, আমরা মুসলমান। এটা আমাদেরই ইবাদত। কিন্তু এই ইবাদতের নিয়মে বড়ই গাফলতি করি।

এই ইবাদতের নিয়ম কানুন শেখার ব্যাপারেও আমাদের আগ্রহ কম। কেউ কখন এটা শেখার চেষ্টা করেন না। ঈদের পুর্বে কোন মসজিদে এটা শেখানো হয় না।

কিন্তু কেন? আমরা কি এই নামাজের নিয়ম একটু আগ্রহ নিয়ে শিখতে পারিনা? আর মসজিদে মসজিদে এসব নামাজের নিয়ম শেখানোর ব্যবস্হা করা যায় না?

তাই মসজিদের ইমাম সাহেবদের উচিত, ঈদের আগে এই ঈদের নামাজের প্রশিক্ষনের ব্যবস্হা করা। আর যারা মুসল্লি আছেন, তাদেরও একটু আগ্রহ নিয়ে এই নামাজের নিয়ম শিক্ষা নেওয়া।

আরেকটা বিষয়, এই ঈদের নামাজের সময় এক শ্রেণীর লোক নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে চান। আর এগুলো সাধারণত গ্রাম গন্জে বেশী হয়। শহরে একটু কম চোখে পড়ে।

ঈদের নামাজ যেহেতু কয়েক গ্রামের লোক এক সঙ্গে এক ঈদগাহে পড়া হয়, একারণে ঈদের মাঠে শুরু হয় যত নেতাগিরী। ঈদের মাঠে এক শ্রেণীর নেতাদের বয়ান বক্তৃতায় মানুষ অতিষ্ট হয়ে যায়। সারা মাস মানুষ রোজা রেখে ঈদের দিন খুশির আমেজ নিয়ে ঈদগাহে যায়, কিন্তু এক শ্রেণীর সমাজপতিদের বাড়াবাড়ি মানুষকে বিরক্ত করে ফেলে।

ইমাম সাহেবদের বক্তৃতায় মানুষ কিন্তু অতিষ্ট হয় না। যেহেতু তারা দ্বীনের কথা বলেন। কিন্তু কতিপয় নেতা আর মাতুব্বর ক্লাশের লোকদের বক্তৃতা গুলো থাকে বিরক্তিকর।

তাছাড়া খুতবার পরেও আবার কোন কোন জায়গায় ইমাম সাহেব দীর্ঘক্ষণ বয়ান করেন।সেই সাথে মাতুব্বরগণ। মানে ঈদের জামাতকে জগা খিচুড়ি বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।

এরপর আরেকটা বিষয় হলো, কোথাও কোথাও ঈদের মাঠের কালেকশন। ইমাম সাহেবের জন্য কালেকশন! মসজিদের জন্য কালেকশন! ঈদগাহের জন্য কালেকশন!

এভাবে বিভিন্ন ভাগে ভাগে কালেকশন করা হয়। তবে সবচেয়ে লজ্জাস্কর বিষয় হল।, ইমাম সাহেবের সামনেই তার জন্য হাত পাতা হচ্ছে। রুমাল নিয়ে, বাক্স নিয়ে নামাজের কাতারে গিয়ে গিয়ে বলা হচ্ছে, ইমাম সাহেবের জন্য কিছু দেন!!

মসজিদের জন্য কালেকশন এবং ঈদগাহের জন্য কালেকশন করা সেটাতে তেমন খারাপ দেখা যায় না।কিন্তু ইমাম সাহেবের সামনে তার জন্য এভাবে টাকা খয়রাত করা বড্ড বেমানান।

একজন ইমাম তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। তার জন্য প্রকাশ্যে তাঁর সামনে এভাবে তাঁর জন্য টাকা কালেকশন করা হবে কেন? এটাতো ইমাম সাহেবকে ছোট করা হয়।

ঈদগাহ কমিটির উচিত হবে, আগেই তাঁর বেতনের ব্যবস্হা করা।সেটা কমিটির জিম্মাদারীর মাধ্যমে ইমামের অনুপস্হিতে করা যেতে পারে। কমিটির সদস্যদের অনুদান বা ব্যক্তি বিশেষের অনুদান, যেটা ইমাম সাহেবের সামনে না করলে ভাল হয়।

এজন্য মনে রাখতে হবে, ঈদের নামাজ এটাতো ইবাদত। ঈদের দিন দু রাকাত ঈদের নামাজ পড়াটাই আসল। সেই সাথে হয়ত ইমাম সাহেব নসীহত মুলক দু একটি কথা বলতে পারেন।তবে সেটা মানুষের অবস্হার দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। লম্বা চওড়া বক্তব্য নয়।

আর ঈদের মাঠে সমাজপতি,মাতুব্বর, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা একদম বন্ধ করা চাই।

আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *