আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে তরুণ আলেমদের আন্দাজে ঢিল

আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে তরুণ আলেমদের আন্দাজে ঢিল

আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে তরুণ আলেমদের আন্দাজে ঢিল

আদনান সামদানী : আল্লামা শাহ আহমদ শফী কথা শুনতে পান। চোখে দেখতে পান। কিতাব মুতালা করে দরসে হেঁটে গিয়ে হাদীস পড়ান। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকলে আবার রাগ করে ফিরেও আসেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, বুঝ আর সৃষ্টিশীল অধ্যাপনায় কারও দ্বীমত নেই।

তার দায়িত্বগুলো দেখুন, দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটাহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড-এর চেয়ারম্যান, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমীর, শায়খুল আরব ওয়ালআজম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ-এর খলিফা। এসব দায়িত্ব এমনি এমনি তিনি জোর করে নিজের দখলে নেননি।

দেশের হক্কানী আলেমদের পরামর্শেই তিনি এসব গুরু দায়িত্বের অধিকারী হয়েছেন। তাঁর কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব আর বার্ধক্য ইলম, আমল, ইখলাস (আত্মশুদ্ধি), দাওয়াতের পুণ্যময় আলোয় উদ্ভাসিত। গোটা জাতির অবিসংবাদিত এই আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক একাধারে মেধাবী আলিম, সফল শিক্ষক, পরিশুদ্ধ সাধক, দূরদর্শী সমাজসংস্কারক, সংযমী, বিনয়ী, সদালাপী, মিষ্টভাষী, যু্ক্তিবাদী, উদার ও পরম স্নেহবৎসল এক জ্যোর্তিময় ব্যক্তিত্ব।

সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আল্লামা আহমদ শফী ব্যাপক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শায়খুই ইসলাম হয়রত হুসাইন আহমদ মাদানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামি আকীদা-বিশ্বাস, তাহজীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আদর্শ বাস্তবায়নে যে কোন বাস্তব কর্মসূচিতে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশের হক্কানী উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বধানী বিশুদ্ধ আকীদার সব ইসলামি সংগঠনের অভিভাবকত্ব করে যাচ্ছেন। তিনিই যেন সকলের সমন্বয়স্থল।

বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন, দুবাই, কাতার, বাহরাইন, কয়েতসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ও উপমাহদেশের বহু জায়গায় তাঁর ছাত্র-শিষ্য, মুরিদ অনুসারী ছড়িয়ে আছে। বিশেষত, আরবদেশগুলোতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা ঈর্ষণীয়। দেশের শীর্ষ আলেমগণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে সমাসীন করে রেখেছেন।

১৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া সোনারগাঁ শাখার আঞ্চলিক পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ ও ইসলামী মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথি বক্তব্যে আল্লামা আহমদ শফী বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলেমদের সম্মানিত করেছেন। কওমি মাদ্রাসার দাওরা হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দিয়েছেন। তাই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। খালেদা জিয়া আলেমদের কিছু দেননি। এ জন্য তিনি এখন আফসোস করছেন। বড় বড় আলেমরা কওমি মাদ্রাসার দাওরা হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদা চেয়েছিলেন কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই এটির স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা এ স্বীকৃতি দিয়ে আলেমদের এ মর্যাদা দিয়ে প্রশংসা নিয়ে নিয়েছেন।’

আল্লামা আহমদ শফীর এই বক্তব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দাজে ঢিল ছুড়ছেন তরুণ আলেমরা। ফেসবুক থেকে নেয়া তরুণ আলেমদের কিছু আন্দাজে ঢিল নিচে তুলে ধরা হলো—

আবদুল্লাহ মাহমুদ : ‘কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন বয়োবৃদ্ধ আল্লামা আহমদ শফী সাহেবকে তাই এখম মিডিয়ার সামনে আর না আনাই ভালো। শেষ বয়সে উনাকে এইভাবে লাঞ্ছিত করার কোনো মানে হয় না। তাঁর চারপাশে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটটা ভাঙ্গতে পারলে আমাদের শায়খে আর অনেক কিছু থেকে বাঁচতে পারতেন। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।’

শোয়াইব জিয়া : ‘আল্লামা আহমদ শফী দাঃবাঃ কে জাতীয় পর্যায়ের সকল প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানজনক অব্যবহিত দেওয়া দরকার।’

হাসিব আর রহমান : ‘আল্লামা শফী সাহেবের বর্তমান অবস্থা এবং অবস্থান কী তা বুঝতে পারা খুব একটা মুশকিল কিছু না। তিনি অনেকটাই সিন্ডিকেটে আটকে আছেন তবে সবদিক বিবেচনায় একটা ব্যাপার পরিস্কার যে, তিনি অজ্ঞাতসারে এসব বক্তব্য দেন না বরং সব জেনে বুঝে তবেই এসব বক্তব্য দেন এবং সহজ সরলার্থে তিনি কথা বলেন ওই সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুসারে।’

বুরহান উদ্দীন : ‘আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা. বলেছেন “শেখ হাসিনা আলেমদের সম্মানিত করেছেন, খালেদা জিয়া কিছুই দেন নি।” আমি নিশ্চিত শফী সাহেব এটা নিজের থেকে বলেন নি। কেউ তাঁকে দিয়ে বলিয়েছে। সেই কেউ হতে পারে হযরতের ছেলে আনাস মাদানী কিংবা অন্যকেউ। যেই হোক না কেন এই চক্রকে চিহ্নিত না করা কিংবা হেফাজত থেকে এদেরকে সরাতে না পারাটা নিশ্চয়ই হেফাজতের ব্যার্থতা কিংবা হতে পারে অপারগতাও। সরকারকে বাইরে রেখে এখন অনেকে নিজের ঘর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অন্যের ফ্যামেলিতে পর্যন্ত হাত ডুকাচ্ছে এই সরকার। এর উদাহরণ খোঁজলে আপনি অনেক পেয়ে যাবেন। আর হেফাজত তো বিশাল একটা সংগঠন। উপরন্তু হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই কুটকৌশল করে হেফাজতকে সহজে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে সরকার। শুধু হেফাজত কেন দেশের কোনোকিছু কি এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আছে?’

আব্দুল মোহসিন : ‘বৃদ্ধ মানুষটি কয়েকজনের তৈরীকৃত সিন্ডিকেটে আবদ্ধ। কিন্তু খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা কওমী অঙ্গন কে।’

আবদুস সাত্তার আইনী : ‘একজন রোবটকে দিয়ে কী বলানো হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন অনেকেই রোবটের ভূমিকা পালন করবে।’

অবশ্য আহমদ শফীর বক্তব্য নিয়ে জলঘোলা না করার আহ্বানও অনেকে জানিয়েছেন। দেখুন দুজনের মন্তব্য তুলে ধরা হলো,

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী : আল্লামা আহমদ শফী দা বা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সোনারগাঁওয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার পুরোটা আপনাকে শুনতে হবে। এক আধটি পত্রিকার নিউজ দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কওমী ঘরানার অনলাইন মিডিয়ার রিপোর্টগুলো পড়া উচিৎ। একটি বাক্য বা উক্তি নিয়ে কটাক্ষ নয় পুরো কথাটি কী বলেছিলেন,সেটি জানতে হবে। তার কোনো বক্তব্য বুঝে না আসলে তিনি যে সব লোকের উপর আস্থাশীল,তাদের কাছে এর ব্যাখ্যা পেতে পারেন।

তিনি বর্ষীয়ান মানুষ হিসাবে সহজ সরল কথা বলে থাকেন। কোনো রাখঢাক ও ঘোরপ্যাঁচ তার কথায় থাকেনা। তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত বা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে না পারলে না করেন কিন্তু তাই বলে তার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন না। তার সমালোচনা করবেন না। তার শানে বেয়াদবী করবেন না।

আমিন আশরাফ : একজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, আহমদ শফী সাহেব বলেছেন, ‘বিএনপি কওমি আলেমদের জন্য কিছুই করেনি।’ তিনি জবাব দিয়েছেন, সে সময় নাকি হুজুরদের অন্তঃদ্বন্ধের কারণে বেগম জিয়ার কওমির সনদের মান তারা নিতে পারেনি। আসলে কি হুজুররা নিতে পারেননি, না দিয়ে তারা সেই সম্মান অর্জন করতে পারেন নাই? আসলে কওমি স্বীকৃতিটা একটা ফাউল জিনিস মাত্র। কেউ যদি সত্যিকারের কওমি সনদের স্বীকৃতি দিতো তাহলে কোনো প্রকার প্রসেসিং ছাড়া এ বিষয়টা অতোটা সহজ হতো না। যা দিয়েছে সেটা একটা হাস্যকর সাবজেক্ট হয়ে আছে। আজ পর্যন্ত কোনো ছাত্র সেই সনদ দিয়ে কিছুই করতে পারেনি। কেবল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ১১ হাজার তিনশত টাকার চাকরি ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। যদিও সে প্রজেক্ট আপাতত বন্ধ হয়ে আছে। আসলে এটা একটা লোভনীয় মূলামাত্র।

এইটা পুরানো কাসুন্দি! এইটা নিয়ে আলোচনার কিছু নেই। প্রকৃতপক্ষে হুজুরদের কেউ কিছু দেয়নি। সবই এক প্রকার রাজনৈতিক বকওয়াস মাত্র। ‘আমরা দিয়েছি অমুকে দেয়নি’ বলে সবাই কেবল রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া ছাড়া আর কিছু করেনি। এখনও ওই তথাকথিত সার্টিফিকেট যাদুঘরেই সংরক্ষিত রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *