আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আকামা ও ভিসার মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা লিখিত নির্দেশনা দেয়নি সৌদি সরকার। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে আশ্বাস দিলেও ছুটিতে দেশে এসে আটকেপড়া কর্মীরা নিশ্চিত হতে পারছেন না। তারা এখনও অনলাইনে দেখতে পাচ্ছেন তাদের কর্মস্থলে ফেরার শেষ সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর। বাড়েনি আকামা ও এক্সিট রি-এন্ট্রির (ছুটি শেষে কাজে ফেরার) সময়সীমা।
সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ভিসা নবায়নের কাজ শুরু করবে ঢাকার সৌদি দূতাবাস। কিন্তু গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত দূতাবাস থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা পায়নি অনুমোদিত ভিসা সার্ভিস সেন্টারগুলো। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিলেও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আকামার ও এক্সিট রি-এন্ট্রির মেয়াদ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত ঘোষণা না আসায় অন্ধকারে কর্মীরা।
বিভ্রান্ত কর্মীরা কর্মস্থলে ফেরার টিকিট পেতে তাই গতকালও কারওয়ান বাজারে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স এবং মতিঝিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সামনে ভিড় ও বিক্ষোভ করেন। ভিসা নবায়নের আশায় ভিড় ছিল গুলশানে সৌদি দূতাবাসের সামনেও। এর মধ্যেই অভিযোগ এসেছে, কয়েকটি সার্ভিস সেন্টার ভিসা নবায়নের নামে কর্মীদের কাগজ নিয়ে টাকা দাবি করছে। সোমবারও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, আকামার মেয়াদ বেড়েছে। তিনি বলেছেন, সৌদি আরব কথা দিয়েছে। তাদের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। আটকেপড়াদের ভিসা নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, যাদের আগে থেকে ভিসা ও আকামা রয়েছে, তারা আবেদন করলে নবায়ন করা হবে। নতুন করে কাউকে দেওয়া হবে না। আটকেপড়া কর্মীরা বলছেন, ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের অধিকাংশের আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত তাদের এক্সিট রি-এন্ট্রির মেয়াদ বাড়েনি। আকামা মেয়াদহীন হয়ে গেলে তারা কী দিয়ে ভিসা নবায়নের আবেদন করবেন?
সৌদিতে কর্মীদের ফেরত যাওয়ার সংকট নিয়ে গতকাল আলোচনা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, সৌদি আবরে যাওয়া নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রিসভাকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেছেন, তারা আশ্বাস দিয়েছেন আকামার মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে, যাতে সবাই যেতে পারেন। তবে সৌদি দূতাবাস অনুমোদিত ভিসা সার্ভিস সেন্টারগুলোর মালিকদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন মজুমদার বলেন, এখন পর্যন্ত তারা সৌদি সরকারের কাছ থেকে আকামার মেয়াদ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা চিঠি পাননি। গত রোববার ঢাকায় দূতাবাস খুললেও তারা জানায়নি কী প্রক্রিয়ায় আটকেপড়া কর্মীদের ভিসা নবায়ন করা হবে।
করোনা মহামারি শুরুর আগে কয়েক মাসে সৌদি আরব থেকে প্রায় লাখ খানেক কর্মী দেশে এসেছিলেন ছুটিতে। তাদের বড় অংশই লকডাউনের কারণে আটকে পড়েন। সৌদি সরকার তিন দফায় তাদের ছুটির মেয়াদ সাত মাস বাড়ায়। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে ভিসা ও আকামার মেয়াদও। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বিমান চলাচল শুরু হলেও আটকেপড়ারা টিকিট সংকটে ফিরতে পারেননি। আগামীকাল বুধবার শেষ হবে বাড়ানো সময়সীমাও। তবে অনেকের আগামী মার্চ পর্যন্ত আকামা রয়েছে। কিন্তু তাদেরও এক্সিট রি-এন্ট্রির মেয়াদ শেষের পথে। ফলে তারা আশঙ্কা করছেন, তাদেরও হয়তো চাকরি থাকবে না।
আসলেই আগামীকালের পর এ কর্মীদের কী হবে- এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। জনশক্তি খাত সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অনেকেই হয়তো কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন না। যারা নিয়োগকর্তার (কফিল) কাছ থেকে কাজে ফেরার সম্মতিপত্রসহ অন্যান্য কাগজ এনে এক্সিট রি-এন্ট্রির মেয়াদ বাড়াতে পারবেন, তাদের ভিসা নবায়ন হবে। এ জন্যও থাকতে হবে বৈধ আকামা। কফিল উদ্দিন মজুমদার বলেন, পরিস্থিতি কী হবে, তা নির্ভর করছে আকামার মেয়াদের ওপর। সৌদি কর্তৃপক্ষ মেয়াদ বাড়ালে অনেকেই যেতে পারবেন। নয়তো খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে কর্মীদের ভাগ্যে।
সোমবার ভিড় করা কর্মীদের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, দূতাবাস নয়, ৩১টি সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে নবায়নের আবেদন নেওয়া হবে। অনুমোদিত সেন্টারের একটি ‘আল মারজান কনসালটেন্সি সেন্টারের’ ম্যানেজার সালেহ আহমদ বলেন, গতকালও তারা দূতাবাসে গিয়েছিলেন। দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। ভিসার নবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশনা এখনও দূতাবাস দেয়নি। তিনি জানান, দূতাবাসের নির্দেশনা না পেলেও তারা কর্মীদের কাছ থেকে নবায়নের আবেদন নিচ্ছেন। সঙ্গে বলে দিচ্ছেন, নবায়ন হবে কিনা, তার নিশ্চয়তা নেই।
দূতাবাসের সামনে ভিড় করা কর্মীদের একজন হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের দিদারুল ইসলাম জানান, একটি সার্ভিস সেন্টার প্রতিনিধি তার কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেছেন ভিসা নবায়ন করে দিতে। তিনি কাগজপত্র দেননি। তবে অন্য কয়েকজন দিয়েছেন। সার্ভিস সেন্টার মালিকদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, দূতাবাস যে ফি নির্ধারণ করে দেবে, তারা তাই নেবেন। এর বাইরে কেউ টাকা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একাধিক ভিসা সেন্টার মালিক জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে আকামার মেয়াদ ২৪ দিন বাড়লেও ফ্লাইট সংকটে সব কর্মী যেতে পারবেন না। কমপক্ষে তিন মাস মেয়াদ বাড়াতে হবে। আগের দিনগুলোর মতো গতকালও কারওয়ান বাজার ও মতিঝিলে বিমানের টিকিটের জন্য ভিড় করেন কর্মীরা। অনেকেই সপ্তাহখানেক ধরে রাতদিন কাটাচ্ছেন সোনারগাঁও হোটেল চত্বর, সৌদি এয়ারলাইন্স কার্যালয়ের সামনে এবং রাস্তায়।
তাদের একজন গাজীপুরের কালীগঞ্জের আবদুল মোতালেব সাত দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রাতদিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, আট মাস ধরে দেশে আটকে আছেন। সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন। আর পারছেন না। স্ত্রী, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে কাজে ফিরতেই হবে। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আবদুল মোতালেব বলেন, তিনি কূটনীতি বোঝেন না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার আবেদন, তিনি যাতে এমন একটা কিছু করেন, যাতে সৌদি সরকার আটকেপড়াদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ বাড়ায়। যাতে তারা দুমুঠো খেয়ে পরে বাঁচতে পারেন।


