বিপৎসীমার উপর নদী-নদীর পানি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

বিপৎসীমার উপর নদী-নদীর পানি, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

বিপৎসীমার উপর নদী-নদীর পানি

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

* নওগাঁয় ১০টি ইউনিয়ন সম্পূর্নভাবে প্লাবিত * গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ধস
* টাঙ্গাইলে মসজিদ-মাদরাসাসহ শতাধিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন * কুড়িগ্রামের ৫টি
উপজেলার ১২০টি চরের নিম্নাঞ্চলে পানিবন্দি প্রায় ৪০ হাজার মানুষ *

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছেই। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অসময়ের এই বন্যায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন। ডুবে গেছে ক্ষেতের ফসল, ভেসে গেছে পুকুর ও জলাশয়ের মাছ। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে মানুষ। উত্তরের বেশ কয়েক জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দেশের প্রধান নদ-নদীর পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়বে। এই সময়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। এ সংক্রান্ত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন-

নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁ’র আত্রাই এবং মান্দা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। নওগাঁ’র সব ক’টি নদীর পানি বৃদ্ধি হয়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে বন্যা পরিস্থিতির এই ভয়াবহ অবনিত। এই দুই উপজেলার কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আরিফ উজ্জামান খান জানিয়েছেন বিশেষ করে প্রধান দু’টি নদী আত্রাই ও যমুনা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নওগাঁ’র আত্রাই নদীর পানি মঙ্গলবার সকাল ৯টায় মহাদেবপুর পয়েন্টে বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার, ধামইরহাট উপজেলার শিমুলতলি পয়েন্টে ২৭ সেনিটমিটার, মান্দা উপজেলার জোতবাজার পয়েন্টে ৬২ সেনিটটমিটার এবং আত্রাই উপজেলায় আত্রাই রেলওয়ে ষ্টেশন পয়েন্টে ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সকাল ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘন্টায় মহাদেবপুর পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার, শিমুলতলি পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার, আত্রাই রেলওয়ে শ্টেশন পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

নওগাঁ’র ছোট যমুনা নদীর পানি নওগাঁ শহরের লিটন সেতু পয়েন্টে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সকাল ৬টায় এই নদীর পানি বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হ্িচ্ছল। আত্রাই নদীর পূর্বের ভাঙন দিয়ে জনপদে পানি প্রবেশ করায় আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া, কালিকাপুর, আহসানগঞ্জ, শাহাগোলা, বিশা, পাঁচুপুর ও ভোঁ-পাড়া এই ৭টি উনিয়ন এবং মান্দা উপজেলার কসব, বিষ্ণপুর ও নুরুল্যাবাদ ইউনিয়ন সম্পূর্নভাবে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মাঠের সমুদয় আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। প্রচুর সংখ্যক মাটির বাড়িঘর ভেঙ্গে গেছে।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল হালিম বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ উল্লেখ করে বলেছেন এখন পর্যন্ত সঠিক হিসাব না করা গেলেও এই ৩ ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তাদের সরকারী সহযোগিতা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে ইতিমধ্যেই ত্রান সহযোগিতা বিতরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ছানাউল ইসলাম জানিয়েছেন তাঁর উপজেলার ৮টির মধ্যে ৭ উপজেলাই বন্যা কবলিত হয়েছে। তবে হাটকালুপাড়া, কালিকাপুর ও আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। এই উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সম্পূর্নভাবে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ইতিমধ্যে প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় হাটকালুপাড়া ও কালিকাপুর রইউনিয়নে প্রায় ৫ শতাধিক পরিবারের মধ্যে চাল ডাল তেল চিড়া মুড়ি বিস্কুটসহ নানা শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি : গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নে করতোয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে টোংড়ারদহ এলাকায় বাঁধটির প্রায় ৩০ মিটার (৬০ হাত) অংশ ধসে যায়। কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম রিন্টু বাংলানিউজকে জানান, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পানির তীব্র স্রোতের কারণে টোংড়ারদহ এলাকায় বাঁধটির প্রায় ৩০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগাড়ী, বড়শিমুলতলা, কাশিয়াবাড়ী, চকবালা, সগুনা, কেশবপুর গ্রাম উল্লেখযোগ্য। এদিকে, গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, সোমবার করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি : যমুনা নদীতে পানি কমতে থাকায় তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চরপৌলী, কাকুয়া, হগড়া গয়রাগাছা, চকগোপাল, কাতুলি ও মাহমুদনগর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম। গত এক সপ্তাহে মসজিদ মাদরাসাসহ প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ অবস্থায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভাঙনকবলিতরা। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই যমুনা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভেঙে গেছে ইউনিয়নের শত বছরের পুরোনো চরপৌলী এলাকার একটি মসজিদ, মাদরাসাসহ কবরস্থান। নদী ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে মানুষজন।

মাহমুদনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুর রহমান তালুকদার বলেন, ভাঙনকবলিত মানুষ ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তবে এখন পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের মানুষকে যমুনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম ৫ম দফা বন্যা পরিস্থিতি অপরির্বতিত রয়েছে। পানি কমতে শুরু করলেও এখনো ধরলা নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার ৫টি উপজেলার ১২০টি চরের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চলতি টানা ৫ম দিনের মতো বন্যার পানি অবস্থান করায় বন্যা দুর্গতদের মধ্যে নিরাপদ পানি, শুকনো খাবার, গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা যায়, চলতি বন্যায় ১৬ হাজার ৭৭৯ হেক্টর ফসল নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে রোপা আমন ১৫ হাজার ৬৯৭ হেক্টর, মাসকালাই ৬৫৪ হেক্টর, শাকসবজি ৩৫০ হেক্টর এবং চিনা বাদাম ৮০ হেক্টর। বানভাসীদের মধ্যে সরকারি বেসরকারি ভাবে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি : সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বেড়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এতে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

দিনাজপুর প্রতিনিধি : দিনাজপুরের তিনটি প্রধান নদীর পানি বাড়তে থাকায় সাবিক বন্যা পরিস্থিতি একই রকমের আছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকায় দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। জেলার বিরল কাহারোল বীরগঞ্জ চিরিরবন্দর এলাকার নিচু এলাকার আমনের ক্ষেত তলিয়ে গেছে অনেক ফসলি জমি।

বগুড়া প্রতিনিধি : বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি এবং কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে জেলার কৃষকেরা পিছিয়ে পড়ছেন। বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় খেত বীজ বপনের অনুযোপযোগী হয়ে পড়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় বগুড়ার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি আরো বাড়তে পারে। নদীর পানি বেড়ে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় চতুর্থ দফায় বন্যা দেখা দিয়েছে। ওই সব এলাকায় বাড়িঘরে পানি প্রবেশ না করলেও চরাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এদিকে, জেলার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে কৃষকরা চাইলেও খুব সহসাই চাষ শুরু করতে পারছে না। বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, ধুনট, শেরপুর, গাবতলী, শাজাহানপুর, নন্দীগ্রাম, আদমদীঘির নিচু জমিতে চাষ করা ১ হাজার ৮৫ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৪৫ হেক্টর জমির মাশকালাই, আগাম চাষ করা ৩২ হেক্টর জমির শীতকালীন সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে আরো জানা গেছে, এবার জেলায় ১২ হাজার ৮১৩ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এখনও পর্যন্ত আগাম চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে ৩২ হেক্টর জমির সবজি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *