আসুন অবসরে আল্লাহর ধ্যানে মশগুল হই
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : কাকে কী বলব? নিজের মধ্যেই গাফিলতি। অলসতা যত প্রকার আছে, সব বাসা বেঁধে আছে। একেবারে গাফেল আমি। কোন ইবাদতই হয়না। আজকের এই লিখনীর উদ্দেশ্য এটাই, আমি যেন অলসতা ত্যাগ করে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতে পারি। সেই সাথে আমার বন্ধুরাও উৎসাহিত হন। একটু সময় পেলে আল্লাহর ধ্যানে লেগে যান। সাধনা করেন আল্লাহকে পাওয়ার জন্য।
এখন এমন অবস্থা আমাদের, আমরা কেউ নিরবে – নিভৃতে আল্লাহকে পাওয়ার কোন ফিকির আমাদের নেই। আল্লাহ পাকের নৈকট্য হাসিল করার মানসিকতা একেবারে কম।
আমরা দৈনন্দিন যে ইবাদত আছে, সেটার উপরেই সন্তুষ্ট। কিন্তু মহান রবের একদম কাছে চলে যাওয়ার বাসনা যেন আমাদের হয় না।
অথচ হাদীসে পাকের থেকে বোঝা যায়, বান্দা যখন নফল ইবাদতের দিকে বেশী মনোনিবেশ করবে, তখন সে আল্লাহর অতি নিকটে চলে যাবে। আল্লাহর সাথে তার গভীর সম্পর্ক তৈরী হবে।
আমরা তো ভাবি, আমি তো মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, নিয়মিত হাদীসের দরস দেই, আমি মাদ্রাসার মোহতামিম, মাদ্রাসার কত খেদমত আমার দ্বারা হচ্ছে। আমি মসজিদের ইমাম, নিয়মিত ইমামতি করে যাচ্ছি।
কেউ মাদ্রাসার তালেবুল ইলম, দৈনন্দিন কিতাব মুতালায়া হচ্ছে। কত কোরআন – হাদীস পড়ছি আমরা। আবার কেউ আছেন ইসলামী রাজনীতি করেন, নিয়মিত প্রোগ্রাম করে যাচ্ছেন। রাজপথে মিছিল- মিটিং করছেন। সবাই নিজ নিজ কাজের উপর সন্তুষ্ট। সকলেই আমরা ভাবি, আমরাতো ইবাদতের মধ্যেই আছি। আবার নিরবে – নিভৃতে ইবাদতের আর প্রয়োজন কোথায়?
কথা একেবারে সত্য। আমরা সকলেই ইবাদতের মধ্যেই রয়েছি। মাদ্রাসায় পড়ানো, ইমামতি, ওয়াজ- নসীহত, ইসলামী রাজনীতি সবই ইবাদতে শামিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু আরো কিছু বিষয় রয়েছে, যে গুলো থেকে আমরা একদম গাফেল। মহান আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার জন্য, আল্লাহর অতি নিকটে যেতে হলে যে, অবসর সময়ে মহান আল্লাহর ধ্যানে মশগুল হতে হবে, সেটা আমরা করি না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ফাইজা ফারাগতা ফানসব ( সুরা ইনশিরাহ-৭) যখন তুমি অবসর হবে সাধনায় লেগে যাও। অর্থাৎ নফল ইবাদতে মনোনিবেশ কর।
দেখুন! আমরা কিন্তু অনেকেই পিছিয়ে আছি এ বিষয়ে। নফলের ধারে কাছে নেই। তাহাজ্জুদ, ইশরাক, আওয়াবীন, নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, জিকির- আজকার, এ সব বিষয় গুলোর প্রতি একদম গুরুত্ব দেই না।
কেউ এ বিষয় গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিলে তাকে আরো উপহাস করার চেষ্টা করে অনেকে। জিকির – আজকার করলে মনে করি, ওটা মনে হয়, পীর – মুরীদদের কাজ। আমাদের ও গুলোর প্রয়োজন নেই।
কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুন তো, আমাদের আকাবির আছলাফ গণ কি করেছেন। তাদের জীবনী মুতালায়া করে দেখুন, কিভাবে তারা জীবন কাটিয়েছেন। তারা বড় বড় মুহাদ্দিস ছিলেন,ফকীহ ছিলেন, বড় রাজনীতিবিদ ছিলেন, আবার তারা আল্লাহকে পাওয়ার আশায় সাধনা করেছেন। একান্তে, নিভৃতে আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন সব সময়।
হযরত শায়খুল হিন্দ ( রহঃ) রাত ভর নফল নামাজ পড়তেন। রমজান আসলে তো সারা রমজানের রাত্রিতে নফল নামাজে কোরআন শুনতেন। সেই মহান ব্যক্তি, যাকে শায়খুল হিন্দ বলা হত। যিনি রেশমী রুমাল আন্দোলনের প্রবক্তা। একজন মর্দে মুজাহিদ। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার। তিনিই আবার মহান রবের প্রেমে পাগল থাকতেন রজনীতে।
হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. সারাদিন রাতে দুই ঘন্টার বেশী ঘুমাতেন না। একজন বিজ্ঞ মুহাদ্দিস, অসংবাদিত রাজনৈতিক। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের মহা নায়ক। তিনি আবার ছিলেন, ইলমে তাসাউফের ময়দানে মহাসম্রাট। আমাদের আকাবির – আছলাফগণ মাদ্রাসায় তা’লীম দিয়েছেন, হাদীসের দরস দিয়েছেন, রাজনীতি করেছেন, আবার রাতভর আল্লাহর ধানে পাগলপারা হয়ে যেতেন। মহান আল্লাহর সাথে তাঁদের বড় সম্পর্ক ছিল।
আসলে হাদীসের দিকে নজর করলে দেখা যায়, আমাদের পেয়ারা হাবীব সা. তাঁর জীবদ্দশায় ইবাদতেই পার করেছেন। আল্লাহর রাসুল সা. তো নিস্পাপ ছিলেন। কোন গোনাহ তাঁর ছিল না। তারপরেও তিনি এত ইবাদত করেছেন, নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা মোবারক ফুলে গেছে।
তার তো এত কষ্ট আর মুজাহাদা করার প্রয়োজন ছিল না। তারপরেও আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
সাহাবায়ে কেরাম রা. তাদের আমল- আখলাক ছিল এমনি। জিহাদ করেছেন কাফের বেঈমানদের বিরুদ্ধে। প্রাণ- পন লড়াই করেছেন, আবার সাহাবায়ে কেরাম রাত্রিতে আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন।
এজন্য ভাই বন্ধু, সব কিছু করতে হবে। মাদ্রাসার খেদমত, মসজিদের ইমামতি, রাজপথে আন্দোলন- সংগ্রাম, সেই সাথে আবার তায়াল্লুক মায়াল্লাহ চাই। মহান রবের প্রেমে পাগল হতে হবে।
সাধনা করা দরকার। একটা টাইম বের করে আল্লাহর প্রেমে পাগল হয়ে যেতে হবে। দৈনন্দিন নফল ইবাদতের পাবন্দী। তাহাজ্জুদ, আওয়াবীন, ইশরাক, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির- আজকার এর প্রতি মনোযোগী হতে হবে সকলের। আল্লাহ আমাদের সকলকে মহান প্রভুর ইবাদতে মশগুল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


