আসুন, একাগ্রচিত্তে জিকির করা রপ্ত করি

আসুন, একাগ্রচিত্তে জিকির করা রপ্ত করি

আসুন, একাগ্রচিত্তে জিকির করা রপ্ত করি

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : জিকিরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া যায়, কিন্তু নিয়মিত জিকির করা কঠিন কাজ। সকাল-সন্ধ্যা একাগ্র চিত্তে মহান আল্লাহর ধ্যানে লেগে যাওয়া একেবারে সাধারণ বিষয় নয়। এতদিন দেখতাম মওদুদী পন্থীরা জিকির- আজকার নিয়ে ঠাট্টা- বিদ্রূপ করত। ওরা মুরীদানদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করত। ইল্লাল্লাহ, ইল্লাল্লাহ, জিকির জায়েজ নেই, এটা তো তারা বহু আগেই ঘোষণা দিয়েছে। মওদুদীবাদীদের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের কওমী ঘরানার কিছু লোক ও কিন্তু ইল্লাল্লাহ জিকিরকে নাজায়েয বলে।

এমনিভাবে জোরে জিকির করার ব্যাপারেও এক শ্রেণীর লোকের আপত্তি। তারা জোরে জিকির করা পছন্দ করে না। এই জোরে জিকির করা নিয়ে মুরীদ ভাইদের বিভিন্ন কায়দায় কোনঠাসা করে। তাদের কে হেয় প্রতিপন্ন করে। মানে ঐ যে ওদের ধার করা কথায় আমাদের কওমী ঘরানার কিছু লোক আমলে নিয়ে এখন বিরোধিতা শুরু করেছে।

অথচ জোরে জিকির করা না জায়েজ নয়। জোরে জিকিরের ও দলীল আছে। আস্তে জিকিরের যেমন দলীল আছে, ঠিক, জোরে জিকিরের ও দলীল রয়েছে।

আসল কথা কী? আমার বাস্তব দেখা কথা বলছি, যারা জিকির-আজকার মোটেও করেনা, ওদের কাছে শুধু জিকির নাজায়েযের ফতোয়া পাবেন। ওরা কোনদিন জিকিরের কাছেও যায় না, ওরাই এখন ফতোয়া দেয় জিকির জোরে করা যাবে না।

একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ধ্যানে লেগে যাওয়া কি কোন খারাপ কাজ? এ ব্যাপারে তো সুরা ইনশিরাহতে বলা হয়েছে, ‘ফা ইজা ফারাগতা ফানসাব, ওয়া ইলা রাব্বিকা ফারগাব” যখন তুমি ফারেগ হবে তখন তুমি আল্লাহর ধ্যানে লেগে যাও’।

একটু সময় পেলে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হওয়া বড় ভাল কাজ। সেটা তো আল্লাহর কাছে বড় পছন্দনীয়। আমাদের আকাবির আছলাফগণ জিকিরের বিরুদ্ধে এভাবে লাগামহীন বক্তব্য দেননি। বরং তারা দৈনন্দিন জিকির করেছেন।

হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রহ., হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ.সহ যত বুজুর্গ পাবেন, সবাই কিন্তু জিকিরের পাগল ছিলেন। দুনিয়ার সকল কাজ কর্ম করার পরে আবার নিয়মিত মা’মুলাত আদায় করেছেন।

বর্তমান আমাদের দেশের যে সব হক্কানী পীর আছেন, তারা কিন্তু মনগড়া কোন কাজ করছেন না। সবই পুর্বসূরী বুজুূর্গদের বাতলানো সবক পালন করেন তারা। আর সে গুলো তো কুরআন- হাদীস সমর্থিত।

এখন কথা থাকল পাগলের পাগলামী। পাগল কিন্তু মানুষ দেখলেই পাগলামী বেড়ে যায়। যখন তাকে খোঁচা দেওয়া হয়, তখন তো পাগলামী শুরু করবেই।

এসব এমন পাগল, আপনি একটা ইশকের “শের ” বলবেন, দেখবেন, ওরা লাফ দিয়ে উঠছে। এটা আমি নিজে একবার পরীক্ষা করে দেখেছি। ভরপুর মজলিসের প্রয়োজন পড়ে না। একাকি থাকলেও ওসব পাগলের সামনে ইশকের গজল টান দিলে হালাত তৈরী হয়ে যায়।

আর পাগল তো পাগলই। ওদের ব্যাপারে শরীয়াতের কোন শর্ত বর্তাবে?

অবশ্য পাগলদের এসব কাজ পীর সাহেব গণ সমর্থন করেন না। প্রত্যেক মাহফিলে বারবার সতর্ক করা হয় পাগলদের। এবং পাগল সাইজ করার জন্য বাহিনীও তৈরী আছে।

আমরা পীর সাহেবকে অবশ্যই দোষারোপ করতাম, যদি পীর সাহেব বলতেন,” এই তোরা বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠে যা” ‘তোরা লাফালাফি কর’ কিন্তু কোনদিন তারা বলেন নি। বরং এ ব্যাপারে নিষেধ করেন।

আরেকটা বিষয় দেখলাম, হাফিজুর রহমান সাহেবের মাহফিলে। হাফিজ ভাই তো কোন পীর নয়। কিন্তু তার মাহফিলেও দেখলাম, কিছু মানুষের হালাত তৈরী হতে। অথচ ওরা কিন্তু হাফিজ সাহেবের মুরীদ নয়।

আমার মাদ্রাসার বাস্তব এক ঘটনা। একবার রাজবাড়ীর ভান্ডারিয়ার পীর সাহেব আমাদের মাদ্রাসার মাহফিলে বয়ান করার পর জিকির করাচ্ছিলেন, আমাদের হেফজ বিভাগের ১০/ ১১ বছরের এক ছাত্র, জিকির করতে করতে তার এক হালাত তৈরী হয়ে গেল। জিকিরে পরে মুনাজাত হয়ে গেছে, কিন্তু তার জিকির আর থামছে না। তাকে রুমে নিয়ে আসলাম, প্রায় এক ঘণ্টা পরে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে পেলাম।

অথচ ছাত্রটি কোন মুরীদ নয়। বা এর আগে পীর সাহেবের সাথে তার কোন পরিচয় ঘটেনি। এজন্য কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু কিছু অস্বাভাবিক বিষয় ঘটতে পারে। সেটা কেউ যে ইচ্ছে করে করছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

আচ্ছা, পবিত্র হারামাইন শরীফের ইমামগণ যখন নামাজে কোরআন পড়েন, তখন তো তাদের কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। অন্য এক অবস্থার সৃষ্টি হয়। কখনো এমন হয়, আর মনে হয় সামনে যেতে পারবেন না। হয়ত তিনি কাঁদতে কাঁদতে পড়ে যাবেন।

যদিও হারামের ইমাম সাহেবদের সাথে কোন তুলনা হয় না। কোথায় আতর আলী আর কোথায় জুতার কালি। এখানে আমার এটাই বোঝানোর উদ্দেশ্য, মানুষের বিভিন্ন সময়ে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

তাই বলে পাগলদের পাগলামী সমর্থন করছি না। ওটা তাদের অবস্থার উপরে ছেড়ে দিলাম। যদি তারা ইচ্ছা করে করে তাহলে গোনাহগার হবে।

তাই আসুন! কোন বিরোধিতা না করে আল্লাহর জিকিরে মননিবেশ করি। একাগ্রচিত্তে মহান প্রভুর ধ্যানে লেগে যাই। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *