ইতিহাসের দেদীপ্যমান এক মশাল মাদানী পরিবার
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : মাদানী পরিবার কোন বসন্তের কোকিল নয় যে, শুধু ঋতুরাজ বসন্তে ডেকে উঠবে। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ কোন মৌসুমী সংগঠন নয়, শুধু সিজনের সময় তাদের ময়দানে দেখা যাবে।
মাদানী পরিবারের প্রধান যিনি, সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ., বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের মহা নায়ক তিনি। শত শত বৎসর ধরে গেঁড়ে বসে থাকা বৃটিশ-বেনিয়াদের যিনি পরাস্ত করে ছিলেন, যার আন্দোলন সংগ্রামে স্তব্ধ হয়ে ছিল বৃটিশদের দুঃশাসন। একেবারে বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন মাওলানা মাদানী এই ভারত বর্ষের জন্য। পরাধীন রাষ্ট্রকে স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। ভারত বর্ষের প্রতিটি ধুলিকণায় মিশে আছে তাঁর অবদান।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তগুলো তাঁর কেটে ছিল ইংরেজ সরকারের বিরোধীতায়। কখনো কোন বিষয়ে ইংরেজ শক্তির কাছে নমনীয় হননি। কাজ- কর্ম, উঠা- বসা, লেন – দেন, দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরা, এমন কি বেষ- ভুষায় ও ছিল তাঁর ইংরেজদের বিরোধীতা।
নিজ দেশের পণ্য ব্যবহারে যিনি সন্তষ্ট থাকতেন। ইংরেজদের পণ্যকে যিনি বয়কট করেছিলেন। চলাফেরায় ও ইংরেজেদের বিরোধীতা করতেন। হাতের ঘড়িটা পর্যন্ত বাম হাতে পরতেন না। ইংরেজদের বিরোধীতার জন্য ডান হাতে ঘড়ি ঝোলাতেন।
কথা বার্তায় ও ইংরেজদের বিরোধীতা করে ছিলেন। ইংরেজ তাড়াতে ইংরেজী ভাষার ব্যবহার পর্যন্ত ছেড়ে ছিলেন তিনি। সকল কাজেই তাঁর ইংরেজদের বিরোধীতা ছিল। বৃটিশ দের বিরুদ্ধে এক ধরনের ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পুরো ভারতবর্ষে।
আমি মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান( রহঃ) এর কাছ থেকে শুনেছি, মাওলানা মাদানী বলতেন, আরে যদি কোন কুত্তা ইংরেজদের ধাওয়া করে, আমিও কুত্তার সঙ্গী হয়ে ইংরেজদের ধাওয়া করব।
আপাদামস্তক যার ইংরেজী বিরোধী লেবাস শোভা পেত,যার কথপকথন থেকে নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইংরেজ বিরোধী ছিলেন। জীবনের কোন একটা সময়ের জন্য তিনি আপোস করেন নি সেই জালেম বৃটিশদের সাথে। যার জন্য তাঁকে ভোগ করতে হয়েছিল সীমাহীন জুলুম নির্যাতন। অবর্ননীয় দুঃখ- দুর্দশায় জীবন কাটাতে হয়েছে। জালিমের বন্দীশালায় বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়েছিল তাঁর।
সেই মাল্টা থেকে নিয়ে দিল্লি। ভারতের বহু জেলখানায় জীবন কেটে ছিল মাওলানা মাদানীর। এই ভারতবর্ষ কে বৃটিশদের হাত থেকে রক্ষা করার সংগ্রামে নিজেকে সঁপে দিয়ে ছিলেন। দ্বীন ইসলামের বাতিকে প্রজ্বলিত করার মানসে সহ্য করে ছিলেন জালিমের অত্যাচার।
মাওলানা মাদানীর সংগ্রাম সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌছে ছিল। বৃটিশ শক্তি লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল এদেশ থেকে। তাঁর এই কোরবানী, আত্মোত্যাগ আজো স্মরনীয় হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় জ্বল জ্বল করছে তাঁর বীরত্বের কাহিনী। এই ভারত বর্ষের মানুষের হৃদয়ে স্হান করে নিয়েছে মাওলানা মাদানীর ভালবাসা।
সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী ( রহঃ) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর স্হানে সমাসীন হন, বড় সাহেব জাদা সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী ( রহঃ)। ঠিক স্বীয় পিতার মত চলতে থাকেন তিনিও। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের হাল ধরেন আসআদ মাদানী। সেই সাথে বিশ্বব্যাপি ইসলামী রেঁনেসার কাজ করে গেছেন তিনি। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা সহ সারা দুনিয়ায় উম্মতের ফিকির নিয়ে দৌড়াতেন। বিশ্ব মুসলিমের কল্যাণে সারা জীবন আসআদ মাদানী কাজ করেছেন। বিশেষ করে মাজলুম মুসলমানদের পাশে দেখা যেত সব সময়। বিশ্বের যে প্রান্তেই মুসলিম নির্যাতিত হত, সেখানেই তাঁকে দেখা যেত।
সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী( রহঃ) এর এক বড় অবদান আমাদের এই বাংলাদেশের মানুষের জন্য। যে অবদানকে এই বাংলাদেশের মানুষ কোনদিন ভুলবেনা। সেটা ছিল,১৯৭১ সনে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে।
১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মানুষ যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে ভারতের আশ্রয় শিবিরে গিয়ে স্হান নিয়ে ছিল, ঠিক সেই দুঃসময়ে অসহায় মানুষের সেবা করতেন সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী। মাজলুম মানুষের খাওয়া- থাকা সহ বিভিন্ন উপায় খেদমত করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই খেদমত আজো বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
আমাদের বাংলাদেশ সরকার আসআদ মাদানীর সেই অবদানের কারণে মরণোত্তর পুরস্কার দিয়ে তাঁকে সন্মানিত করে ছিল। আসআদ মাদানী বাংলাদেশে বহুবার এসেছেন। এদেশের মানুষের যে কোন সমস্যায় তাঁর উপস্হিতি দেখা যেত সব সময়।
ইসলাহী কাজ নিয়ে, মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য তাঁর মিশন অব্যাহত থাকত সব সময়। পথ ভোলা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতেন তিনি।
সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী ২০০৬ সনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরে জমিয়তের হাল ধরেন, আসআদ মাদানীর বড় সাহেবজাদা সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী দামাত বারাকাতুহম।
একদম পুরোপুরি পিতার নকশে কদমে পাঁ রেখে চলেছেন, সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী। বর্তমান জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারী তিনি। পুরো মুসলিম উম্মাহ এর রাহবার বনে গেছেন তিনি। ভারতের চল্লিশ কোটি মুসলিমের দুঃখ দুর্দশায় সব সময় পাশে। বন্যা, জলচ্ছাস, খরা, ভুমিধ্বস, ঘুর্নিঝড়, যে কোন দুর্যোগে মানুষের পাশে মাহমুদ মাদানী।
আসামে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের পক্ষে লড়াই করে যাচ্ছেন। ভারতের যে কোন স্হানে মুসলমানদেন যে কোন সমস্যায় তিনি এবং তাঁর সংগঠন বুক পেতে দেন। সমাধা না হওয়া পর্যন্ত পিছপা হননা।
বেশ কিছু দিন থেকে ভারতে মুসলিমগন নির্যাতনের শিকার। মাহমুদ মাদানী হুঙ্কার দিয়ে দিলেন। মুসলিমদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানালেন। তিনি বললেন, বসে বসে মার খাওয়া নয়,আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে মাহমুদ মাদানী। বার্মার রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশে দেখা গেল তাঁকে। এভাবে যেখানেই মুসলিম নির্যাতিত নিপীড়িত, সেখানেই তাঁকে পাওয়া যায়।
ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে এই মাদানী পরিবারের সামাজিক খেদমত ছড়িয়ে আছে। দেওবন্দ, সাহারান পুর, মোজাফ্ফর নগর সহ এই মাদানী পরিবারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গঠন হয়েছে, “মুসলিম ফান্ড” যেটা একটা সুদ মুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্হা। এভাবে বিভিন্ন হসপিটাল, কারিগরী স্কুল, কলেজ।
মাদানী সাহেবগণ খৃষ্টান মিশনারী এর মোকাবেলায় মুসলিম মিশনারী চালু করেছেন। খৃস্টানদের স্কুলদের মোকাবেলায় মুসলিমদের স্কুল করেছেন ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
সামাজিক খেদমতের সাথে সাথে ইলমে হাদীসের খেদমতের সিংহাসনে বসে আছেন এই মাদানী পরিবার। সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী( রহঃ) দীর্ঘ বাইশ বছর দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস ছিলেন। তাঁর শাগরেদগন বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে আছে। মাওলানা মাদানী তিনি মদিনার মসজিদে নববীতে বহু বছর হাদীসের দরস দিয়েছেন। সেই হিসেবে আরব, আজম সব জায়গাতে মাদানী সাহেবের ছাত্র দেখা যায়।
আমাদের বাংলাদেশে বহু শীর্ষ আলেম হযরত হুসাইন আহমাদ মাদানীর শাগরেদ। বর্তমান বাংলাদেশের শ্রদ্ধা ভাজন আলেম, আল্লামা আহমাদ শফি সাহেব তাঁর একজন ছাত্র ও খলিফা। এভাবে বহু আলেম এখনো জীবিত আছেন, যারা মাদানীর খাছ শাগরেদ।
মোটকথা, মাদানী পরিবারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের অবদান এই ভারত বর্ষ সহ বিশ্বময়। এদেশের পরতে পরতে মিশে আছে মাদানী পরিবারের কীর্তি। যেখানে যাবেন সেখানেই মাদানী পরিবারের অবদান নজরে আসে।
শত বছরের থেকে বেশী সময় ধরে এই পরিবার তাদের খেদমত করে যাচ্ছে এদেশের বুকে। দেশ ও জাতির কল্যাণে তারা নিয়োজিত সব সময়।
সুতরাং বন্ধু, ভাবতে হবে। আমি কার বিরুদ্ধে লাগামহীন বক্তব্য দিচ্ছি। কার শানে কলম ধরছি। মাদানী পরিবার থেকে দেশ দরদী আমরা কেহ নই।
রতের চল্লিশ কোটি মুসলিম সহ বিশ্ব মুসলিমের প্রতিনিধিত্ব কারী তারা। আমাদের মত হুজুগী কিন্তু তারা নয়। এত অবুঝ রাজনীতি বিদ ও তারা নন। বিশ্বের ক্ষমতাশীল আলেমদের মধ্যে অন্যতম আলেম কিন্তু এখনও মাদানী পরিবার। তাদের খ্যাতি এবং দেশের জন্য তাদের অবদান এখনও জ্বল জ্বল করছে জাতির সামনে। তারা আরো এগিয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


