ইতেকাফ সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানা জরুরী

ইতেকাফ সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানা জরুরী

মাহমুদ এলাহী : মাহে রমজানের আজ বিশতম দিন। মাগফেরাতের দশকের শেষ দিন। আগামীকাল থেকে শুরু হবে নাজাতের দশক। আজ সূর্যাস্তের আগেই ইতেকাফ শুরু করতে হবে। ইতেকাফের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, কোনো জিনিসকে আঁকড়ে ধরা এবং এর উপর নিজ সত্তা ও আত্মাকে আটকে রাখা। আর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির মসজিদে বাস ও অবস্থান করা। ইতেকাফ সবসময়ই করা যায়।

তবে রমজান মাসে উত্তম এবং রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশের উদ্দেশ্য তা সর্বোত্তম। ইতেকাফ এমন এক নির্জনতা যেখানে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত, জিকির ও আনুগত্যের উদ্দেশ্য নিজের আত্মা ও সত্তাকে একান্তভাবে নিয়োজিত করে এবং নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামি জ্ঞান চর্চা ও গবেষণায় নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যস্ত রাখে। একই কারণে তিনি দুনিয়ার সব কাজ ও ব্যস্ততা থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দূরে থাকেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের পথে যেন কোনো দুনিয়াবি চিন্তা ও কাজ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।

ইতেকাফের উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক কায়েম করা। আল্লাহর সাথে পরিচয় যত গভীর হবে, সম্পর্ক ও ভালোবাসা তত গভীর হবে এবং তা বান্দাকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছে নিয়ে যাবে। আল্লাহর পথে যাত্রা অব্যাহত রাখা নির্ভর করে যোগ্য ও সঠিক মনের ওপর। মন শত বিচ্ছিন্ন থাকলে সে পথে অগ্রসর হওয়া যায় না।

আজ সন্ধ্যায় ইতেকাফ পালনে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নেবে মুমিন মুসলমান। ইতেকাফ পালনে নারী-পুরুষের রয়েছে আবশ্যক করণীয় কিছু জরুরি বিষয়। আর তা হলো-

১. ২০ রমজান ইফতারের আগে ইতেকাফের নিয়তে মসজিদের সুনির্দিষ্ট স্থান বা ঘরের নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা আবশ্যক। সে হিসেবে এ বছর ২৬ মে (রোববার) ইফতারের আগেই মসজিদে চলে যাওয়া।

২. ইতেকাফের স্থানে গিয়েই ১০ দিন মসজিদে অবস্থানে ইতেকাফের নিয়ত করা আবশ্যক। ১০ দিনের কমে সুন্নাত ইতেকাফ আদায় হবে না। ১০ দিনের কম হলে তা নফল ইতেকাফে পরিণত হবে।

৩. যদি কেউ ১০ দিনের জন্য সুন্নাত ইতেকাফের নিয়ত করে; তবে তার জন্য ইতেকাফ আদায় করা আবশ্যক। ওজর ছাড়া তা থেকে বিরত থাকা বৈধ নয়।

৪. ইতেকাফকারীর জন্য মসজিদে অবস্থানকালীন সময়ে স্ত্রী সহবাস করা হারাম। কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-‘আর যতক্ষণ তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর; ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মেলমেশা কর না। এটা হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমারেখা।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৭) এমনকি স্ত্রীকে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করাও বৈধ নয়।

৫. মাসনুন ইতেকাফ শুরু করার পর কোনো ব্যক্তির যদি ২/১ দিন ইতেকাফ ভঙ্গ হয় তবে ভঙ্গ হয়ে যাওয়া দিনের ইতেকাফ পরে কাজা আদায় করে নিতে হবে।

৬. পারিশ্রমিকের বিনিময় বা ইফতার-সেহরির বিনিময়ে ইতেকাফ করা ও অন্য কাউকে দিয়ে ইতেকাফ করানো; কোনোটিই বৈধ নয়।

৭. ইতেকাফকালীন সময়ে কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল করা, দ্বীনি মাসআলা-মাসায়েল আলোচনা করা, নিজের শিক্ষা অর্জন করা এবং অন্যকে শিখানো বৈধ এবং সর্বোত্তম কাজ।

৮. ইতেকাফকালীন সময়ে চুপচাপ থাকাকে ইবাদাত-বন্দেগি মনে করে চুপ থাকা উচিত নয়, বরং তাতে ইতেকাফ মাকরূহ হবে। তবে মুখের গোনাহ থেকে বিরত থাকতে চুপ থাকা অবশ্যই বড় ইবাদত।

৯. ইতেকাফের স্থানকে ব্যবসাস্থল বানানো মাকরূহ। ওয়াজিব ইতেকাফ ফাসিদ বা বাতিল হয়ে গেলে পরবর্তীতে তা কাজা আদায় করাও ওয়াজিব।

১০. ইতেকাফ নিজের কারণে ফাসিদ/বাতিল হোক অথবা হায়েজ (ঋতুস্রাব) বা নিফাসের (রক্তস্রাব) কারণে বাতিল হোক। পরবর্তীতে তা আদায় করা ওয়াজিব।

১১. মহিলারা নিজেদের বাসস্থানের নির্ধারিত স্থানে কাপড় দিয়ে পর্দা টেনে ইতেকাফে বসতে পারবে। তবে সেখানে যেন কোনো গায়রে মাহরাম তথা বেগানা পুরুষ না আসে।

১২. যে সব নারীদের স্বামী আছে, অবশ্যই তাদেরকে ইতেকাফের আগে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। স্বামীর অনুমতি না থাকলে সে নারীর জন্য ইতেকাফ বৈধ নয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব পুরুষ ও নারীকে ইতেকাফ পালনে উল্লেখিত বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *