ইসলামী আইন, বর্তমান আইন ও অজ্ঞতা অসারতার গল্প

ইসলামী আইন, বর্তমান আইন ও অজ্ঞতা অসারতার গল্প

ইসলামী আইন, বর্তমান আইন ও অজ্ঞতা অসারতার গল্প

সগীর আহমদ চৌধুরী : পবিত্র কুরআনের حكم (হুকম) শব্দটি শুধু আল্লাহর জন্য খাস (নির্দিষ্ট) নয়, তাঁর বান্দাদের প্রতি সম্বন্ধিত করেও শব্দটি পবিত্র কুরআনে এসেছে। কাজেই إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে যারা “আল্লাহই একমাত্র আইনদাতা” এ ধারণা পোষণ করে, তাদের সেই ধারণা আহলে ‍সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। তাদের এই ধারণা মূলত খারেজি চিন্তাপ্রসূত।

আল্লাহর আইন বলতে কী বুঝি? আল্লাহর আইন দ্বারা দুটো উদ্দেশ্য হতে পারে:
১. পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহ (মুজতাহিদ ইমামগণের মতামত এবং ওলামায়ে কেরামের ফতওয়ার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা) সমগ্র ইসলামি আইন।
অথবা
২. শুধুমাত্র কুরআনে বর্ণিত কতয়ী নুসুস দ্বারা সুসাব্যস্ত কতিপয় হুদুদ-কিসাসের বিধি-বিধানসমূহ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ আয়াত দিয়ে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকাজ পরিচালনা না করলে কুফরি আখ্যা দেয়া হয়, এই কুফরি উপর্যুক্ত দুইয়ের মধ্যে কোন প্রকারের আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

পবিত্র কুরআনে শাসন-পরিচালনার সঙ্গে بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ ছাড়াও আরও দুটো শব্দ এসেছে, যথা- (১) بِالْعَدْلِ ও بِالْقِسْطِ; শাসনপরিচালনায় ইনসাফ কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। কেউ যদি এ নির্দেশনা না মানে এবং জুলুম-অবিচার করে তবে কি তারা কাফির? বহু মুসলিম খলীফা জালিম ছিলেন, অত্যাচারী নিপীড়ক ছিলেন, সাহাবায়ে কেরামের হত্যাকারীও ছিলেন, তবে কি তারা কাফির ছিলেন? আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস মতে তাদেরকে কি কাফির মনে করা হয়?

মানব-রচিত বলতেই কুফরি এই বক্তব্য খারেজি চিন্তাপ্রসূত। আর আল্লাহর আইন বলতে শুধুমাত্র কুরআন বা কুরআনের কতিপয় বিধি-বিধানই একমাত্র আল্লাহর আইন মনে করা; এটা আহলে কুরআন ও মুনকিরে হাদীসদের ভ্রান্ত দর্শন থেকে প্রসারিত। বস্তুত সমগ্র ফিকহই হচ্ছে আল্লাহর আইন। আর এই ফিকহও কিন্তু কোনো না কোনোভাবে মানব-রচিত।

মহান আল্লাহই মানুষকে দুনিয়ায় শাসন-পরিচালনা এবং আইন-প্রণয়নের যোগ্যতা ও দায়িত্ব দান করেছেন। তবে শর্ত হচ্ছে তা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহের সাথে সাংঘর্ষিক না হতে হবে। সাঘর্ষিক হওয়াটা ফাসিকি, যদি এই ফাসিকি ইসলামকে অস্বীকার কিংবা বিদ্বেষপ্রসূত হয় তবেই সেটাকে কুফরি আখ্যা দেওয়া যায়। এটা ছাড়া কোনো ব্যাবস্থাকে গড়পড়তা কুফরি আখ্যা দেওয়াটা আহলে সুন্নাত ওযাল জামায়াতের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বিপরীত।

প্রচলিত গণতন্ত্র, সংবিধান ও আইন এসবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক অনেক ধারা-উপধারা ও বিধি রয়েছে। প্রচলিত রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা সজ্ঞানে ইসলাম বিদ্বেষ থেকে আইনকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক করে প্রণয়ন করেননি। এটা হয়েছে ইসলাম সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা, ইসলামের সৌন্দর্যের ব্যাপারে অস্পষ্টতা ও ফিকহের উপযুক্ততা বিষয়ে মূর্খতার কারণে। করণীয় হচ্ছে, রাজনীতিবিদদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে এসবের সংশোধনের চেষ্টা করা। তা না করে কুফরি আখ্যাদান এবং সংঘর্ষের প্রক্রিয়া সমস্যা বাড়াবে, সমাধানে পৌঁছাবে না।

আর ইসলামি রাষ্ট্রের লক্ষ্যে শরীয়া আইন প্রণয়নের চেয়ে ইনসাফ কায়েমই মুখ্য। ইনসাফ না থাকলে তো ইসলামি রাষ্ট্রকেও আল্লাহ ধ্বংস করে দেন, আর ইনসাফের কারণে কুফরি রাষ্ট্রকেও আল্লাহ স্থায়িত্ব দান করেন। কুফফারদের কাছে শরীয়া রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রই বেশি মাথাব্যথার কারণ। সৌদি আরবে তো শরীয়া আইন আছে, কিন্তু কুফফার শক্তি সৌদিকে কি দু’পয়সার মূ্ল্য দেয়? এরা বরং ভয় পায় তুরস্ককে। শরীয়া প্রতিষ্ঠার নামই ইসলামি রাষ্ট্র নয়, ইসলামি রাষ্ট্র হচ্ছে, যেখানে মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ট, যেখানে ঈমান-বিশ্বাস ও স্বাধীনভাবে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও হচ্ছে, নামায প্রতিষ্ঠা ও যাকাত আদায় ইত্যাদি।

লেখক : বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *