উম্মাহ দরদিরাই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু

উম্মাহ দরদিরাই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু

উম্মাহ দরদিরাই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : উম্মাহ এর দরদী ও বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষগুলো সবচেয়ে জলুমের শিকার হয়। তিনিই হন সবচেয়ে আক্রমণের লক্ষ্য বস্তু।চতুর্মুখি আক্রমণ তাঁকে সহ্য করতে হয়। এটা নতুন কোন কথা নয়। ঘটনাগুলোও নতুন নয়।আবহমান কাল থেকে এ ধারা অব্যহত রয়েছে।

আমাদের আকাবির- আছলাফের জীবনীর দিকে তাকালে হুবহু মিল পাওয়া যাবে। সহী দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে উম্মতের দরদী হয়ে যখন ময়দানে নেমেছেন, তখনই পিছন থেকে জামার আস্তিন টেনে ধরা হয়েছে। নানাবিধ সমালোচনায় জর্জরিত করা হয়েছে। পদে পদে বাঁধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এক পা সামনে গিয়েছেন তো তিন পা পিছু আসতে বাধ্য করা হয়েছে।
কতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী( রহঃ) এর কথা চিন্তা করুন, উম্মতের কত দরদ নিয়ে ময়দানে নেমে ছিলেন। তাঁর দৃষ্টি ভঙ্গি ছিল শত ভাগ সহি। এদেশ ও জাতির প্রতি তাঁর ছিল সীমাহীন দরদ আর ব্যাথা। যে আবেগ নিয়ে তিনি এই দেশের মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির পথ বাতলে ছিলেন। কিন্তু কজন বুঝল তাঁর চিন্তা চেতনা? আর কত লোক বা এগিয়ে আসল তাঁর সাহায্যে?

মাওলানা মাদানী যে দৃষ্টি ভঙ্গি লালন করতেন, তাঁর যে চিন্তা- চেতনা ছিল, আজ আমাদের এখন বুঝে আসে। এখন আফসোস হয়। এখন এ কথা বলতে বাধ্য হই, মাওলানা মাদানীর চিন্তা – চেতনাই সবচেয়ে শ্রেয়। অথচ সে সময় কত যে গালমন্দ শুনতে হয়েছিল তাঁকে। কত ফতোয়ার ঝড়- তুফান এ নিমজ্জিত হতে হয়ে ছিল, তার কোন হিসেব নেই। মাদানীকে কাফের পর্যন্ত ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। কত জন গোমরাহ বলেছে।

তবে শত বাঁধা- বিপত্তির মাঝে তিনি ছিলেন হক- হক্কানিয়্যাতের উপর অটল- অবিচল। তিনি তাঁর মিশন অব্যাহত রেখে ছিলেন। সকল বাঁধা ডিঙিয়ে এগিয়ে গিয়ে ছিলেন সম্মুখ পানে। দেশ ও জাতির মুক্তির সংগ্রামে কত লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে। কত দুর্ভোগ- দুর্দশা এর মাঝে কালাতিপাত করে ছিলেন। নিজ পরিবার, নিজের জীবন ছিল হুমকির মুখে। তবুও পিছু হটেন নি।

কিন্তু দুঃখ জনক বিষয় হল, নিজের জাতি, গোষ্ঠি থেকে শেষ পর্যন্ত আক্রমণের শিকার হলেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে। সারা জীবন যখন মুক্তির সংগ্রাম করে জালেম হটালেন। শেষমেষ আক্রমণের শিকার হলেন নিজের লোকদের মাধ্যমে। উম্মাহ এর দরদ ব্যাথা নিয়ে যেভাবে কাজ করছিলেন, কিন্তু পরিসমাপ্তি হলো দুঃখ ব্যাথার।

বর্তমান সময়ে ঠিক সেই নিয়ম- পদ্ধতির ধারা এখন বিদ্যমান। যারাই উম্মতের দরদ নিয়ে ময়দানে যায়, তারাই সবচেয়ে বেশী আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তাদেরকে পিছন থেকে টেনে ধরা হচ্ছে।

হালজামানায় মাওলানা মাদানী ( রহঃ) এর চিন্তা- চেতনার ধারক – বাহক, একেবারে মাদানী দৃষ্টি ভঙ্গি লালনকারী হলেন, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দামাত বারাকাতুহুম। মাদানী ( রহঃ) যে দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে চলেছেন, হুবহু যেন তাঁর ফটোকপি ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব। তিনি মাদানী সাহেবের সেই বাতলানো পথে চলার চেষ্টা করেন।

মাদানী সাহেব উম্মাহ এর দরদ নিয়ে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ার দরুন, যত প্রতিকুলতা সইতে হয়ে ছিল, ঠিক, ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের একই অবস্থা। মাওলানা মাদানী যেভাবে গালমন্দ শুনেছেন, নিজের জাতি ভাইদের দ্বারা যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, ঠিক, ফরীদ সাহেব ও আজ আক্রান্ত নিজ জাতি আলেম- উলামার দ্বারা।

একজন মজলুম আলেম বলা যায় ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবকে। এ যুগে এত আক্রমণ আর কোন আলেমের উপর দিয়ে গেছে বলে মনে হয় না।

বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা অপবাদ, গালিগালাজ, নানাবিধ ফতোয়া বর্ষন করা হয়েছে তাঁর উপর দিয়ে। অথচ ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের এই জাতির জন্য যে অবদান, এই উম্মাহর মুক্তির জন্য তাঁর কোরবানী চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ আমরা কোন দিকে যাচ্ছিলাম আলেম সমাজ? আলেমদের জঙ্গী তকমা লাগিয়ে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল?
আল্লাহর বড় মেহেরবানী। আল্লামা মাসউদের সমপোযোগী পদক্ষেপ। লাখো আলেমের জঙ্গী বিরোধী ফতোয়া প্রকাশ করে আলেমদের কে নিরাপদ দুরত্বে নিয়ে গেলেন।

এই চিন্তা- চেতনা কয়জনের আছে? কিন্তু ফরীদ সাহেব কি তাঁর কৃতিত্বের কোন মর্য্যাদা অদ্যবধি পেয়েছেন? কিছুই পাননি। পেয়েছেন কিছু গালি! কওমী সনদের স্বীকৃতি, একদম বুক চিতিয়ে সামনে ছিলেন তিনি। কত কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। সবচেয়ে বড় কাজটি তাঁর। আলেমদেরকে এই ব্যাপারে এক প্ল্যাট- ফরমে নিয়ে আসা। যদিও আল্লামা আহমাদ শফি দাঃ বাঃ এর মাধ্যমে হয়েছে। তবে আল্লামা আহমদ শফিকে কনভার্ট করে এই ময়দানে নিয়ে আসা তো তাঁরই অবদান।

মওদুদী জামাতের সাথে আলেমদের যে সখ্যতা হয়েছিল, তাতে আলেমরা যে কোথায় গিয়ে পৌছাত আল্লাহ ভাল জানেন। এখন মানুষ ভাল করে জানে, কারা মওদুদীর অনুসারী আর স্বাধীনতার দুশমন। আর কারা দেশ প্রেমিক। কারা এদেশের জন্য লড়াই করেছেন। ফরীদ মাসউদ সাহেবই আলেম সমাজকে বাতিলের রাহু- গ্রাস থেকে মুক্ত করেছেন। এখন আর কেউ আলেমদের স্বাধীনতা বিরোধী বলে গালি দেয় না।

এদেশের কওমী মাদ্রাসার আধুনিকরণ এবং যুগের চাহিদা অনুসারে ছাত্রদের পাঠদান পদ্ধতির আবিস্কারক কিন্তু ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব। সেই প্রাচীনতম পদ্ধতি থেকে মাতৃভাষা বাংলা রুপান্তর করে ছাত্রদের পড়ানো এবং পড়া তাঁরই অবদান।

এক সময় কওমী মাদ্রাসাতে বাংলা ভাষা চর্চা দোষনীয় ছিল। আমি নিজেও এর ভুক্ত ভোগী। কিন্তু আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব এবং ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব সর্ব প্রথম কওমী মাদ্রাসা গুলোতে বাংলা ভাষা চর্চা শুরু করেন।

তাঁদের অবদানে আজ বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে বাংলা মাধ্যমে পাঠদান পদ্ধতি এবং মাতৃভাষা চর্চা। এরকম বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবদান ফরীদ সাহেব হুজুরের। উম্মাহ এর জন্য জান কোরবান করে দিয়েছেন। কিন্তু বিনিময়ে কিছুই পাননি। বরং না বুঝে মানুষ সমালোচনায় তুলোধুনো করেছে তাঁকে। চতুর্মুখি আক্রমনের শিকার হয়েছেন তিনি।

যাইহোক, অবশ্য যারা সকল প্রকার বাঁধা উপেক্ষা করে উম্মাহ এর জন্য ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে, উম্মতের দরদ নিয়ে কাজ করে যায়, নিশ্চয় তারা জামানার মুজাদ্দেদ। তারা চির স্সরনীয় থাকবে। আল্লাহ তাঁর মাকাম আরো বৃদ্ধি করে দিবেন।
যেমনটি সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী ( রহঃ)। আল্লাহ তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দায়ী, সমাজ সংস্কারক, বিশ্ব নেতা , খাতামুল মুহাদ্দিসীন হিসেবে কবুল করে ছিলেন। আল্লামা মাসউদ সাহেবের ইজ্জত আল্লাহ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর কোরবানী আর মোজাহাদার কারণে তিনিও বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে উঠছেন। আল্লাহ তাঁর ইজ্জত আরো বৃদ্ধি করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *