উসি এক মাওলা কি রেজাকে লিয়ে
নোয়াখালী ও ফেনীর ইসলাহী সফরের অনুভূতি
ফয়জুল্লাহ আমান : ২৩ জুলাই ২০১৯ ইং। মঙ্গলবার । ইসলাহী সফরের ধারাবাহিকতার দ্বিতীয় প্রোগ্রাম। গত মাসে খুলনা জেলায় গিয়েছিলাম। সে সফরনামা পাথেয় টোয়েন্টিফোরডটকম-এর প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকরা তাগাদা দিয়ে বলেছেন নোয়াখালী সফরের কথাও কিছু লিখতে। নোয়াখালী ও ফেনী দু দিনের সফর ছিল। ২৩ ও ২৪ জুলাই। মঙ্গলবার বেলা এগারটায় ইকরার মসজিদে ছাত্রদের নিয়ে দুআ হলো। বের হতে আরও সময় লাগবে। বেলা বারটায় গাড়িতে উঠলাম। ঢাকার যানজট কাটিয়ে কুমিল্লা পৌঁছলাম দুটার কিছু পর। সেখানে মরহুম মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ সাহেবের সাহেবজাদা বর্তমান মুহতামিম মাওলানা তালহা আমাদের সাদর আপ্যায়ন করলেন।
নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে ছয়টি গাড়িতে আমরা প্রায় ৪০ জনের একটি কাফেলা। লাকসাম পেরিয়ে সোনাইমুড়ি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল মাওলানা আহমাদ সিরাজি। সঙ্গে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার তরুণ কর্মীরা।
মাওলানা আহমাদ সিরাজি আট দশ বছর আগে মালিবাগ জামিয়ায় পড়াশোনা করতেন। তখন প্রায় জামিয়া ইকরায় আসতেন। আমার সঙ্গে তার সখ্যতা তখন থেকেই। পরে পড়াশোনা শেষ করেছেন জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ায়। এখন কলেজে অনার্স করছেন। কলেজে তার অনেক বন্ধু রয়েছে। সবাইকে তিনি জমিয়তুল উলামার কাজে যুক্ত করেছেন। নোয়াখালীর মত জায়গায় তিনি জমিয়তের একটা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। গত বছর কর্মী সম্মেলনে তার বন্ধুদের ইকরা এনেছিলেন। তখন থেকেই আমাদের আগ্রহ ছিল এখানে আসার।
বেগমগঞ্জ প্রবেশের আগেই আমরা মঞ্জিল করলাম। সেখানে দুআ করলাম। হে আল্লাহ! এই নগরের কল্যাণ আমাদের দান করো। এ স্থানের অকল্যাণ থেকে আমাদের রক্ষা কর। নগরবাসীর যত ভালো গুণ আছে তা আমাদের দান করো। আমাদের ভেতর যা কিছু মন্দ আছে তা থেকে নগরের লোকজনকে হেফাজত করো।
হুজুর বললেন, যে কোনো শহরে বা জনপদে প্রবেশের পর অঞ্চলটির জন্য দুআ করা নবীজীর সুন্নাত। ছোট ছোট সুন্নাতগুলি আমাদের জিন্দা করতে হবে। নবীজীর কোনো সুন্নাতই মূলত ছোট নয়। প্রতিটি আমলকে গুরুত্ব দেওয়া শিখতে হবে।
চির হরিৎ বঙ্গের সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নোয়াখালীতে আমার এই প্রথম সফর। বাংলাদেশ পুরোটাই সুন্দর। অখ- সুন্দর আমার প্রিয় মাতৃভূমির মানচিত্রের প্রতিটি অংশ। চৌমুহনি বাসস্ট্যান্ড মসজিদে আমরা অবস্থান গ্রহণ করলাম। এ অঞ্চলে আমাদের জামিয়া ইকরার অনেক ফুজালা রয়েছে; কিন্তু তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। এজন্য কোনো মাদ্রাসায় নয়; এবার আমাদের প্রোগ্রাম সাজানো হয়েছে মসজিদে। সত্যি বলতে খুলনার চেয়ে আমরা এজন্য ইসলাহী দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি উপকৃত হয়েছি। কাফেলার প্রত্যেক সদস্য পুরোটা সময়জুড়ে আমলে নিমগ্ন ছিল। রাতে বয়ান ও দুআ শেষে বাসস্ট্যান্ড থেকে অদূরে এগ্রিকালচার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সরকারি কোয়ার্টার মসজিদে গেলাম। বিরাট এক দিঘির সাথে সুন্দর একটি মসজিদ। নিঝুম নিরব গ্রামীণ এক পরিবেশ। সবুজ গাছপালায় পূর্ণ।
রাতে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হলো। রহমতের বাতাস বয়ে গেল। সমস্ত আমল শেষ করে অনেক রাতে ঘুমুতে গেলাম। কারো মাথার নিচে বালিশ আছে কেউ বা একটা ইট মাথার নিচে দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। মাওলানা নূরুদ্দিন, মাওলানা শেখ মুহাম্মাদ, শেখ মাহমুদুল ইসলাম মিজু আর মুফতি আদিল হয়ত ইটও পায়নি। যে কটি বালিশ বা কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি মানুষ থাকায় এভাবে মুজাহাদা করতে হচ্ছে। আল্লাহর নুসরতের জন্য মেহনত, মুজাহাদা ও ইখলাস প্রয়োজন; তার চর্চা যেন এভাবেই হলো। হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা কেবল তোমার জন্যই। তোমার দ্বীনের পথে আমাদের দিয়ে এমন কুরবানি করিয়ে নিচ্ছ। লক্ষ কোটি শুকরিয়া মাবুদ।
ভোর রাতে সবাই একসাথে যিকির করলাম। প্রথমে বারো তাসবিহ। তারপর ফজর নামাজ বাদে ছয় তাসবিহ ও সুরা ইয়াসীনের আমল। এলাকার মুসুল্লি সংখ্যা খুবই কম। আমরা যারা ঢাকা থেকে গিয়েছি কেবল তারা। সঙ্গে নোয়াখালী জেলার তরুণ জমিয়ত কর্মীরা আছে। বহুদিন পর এমন প্রাণ খোলে জিকির করলাম। মনে পড়ে দারুল উলুম দেওবন্দে ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সায়্যিদ আসআদ মাদানি রহ.-এর খানকায় এমন জিকিরের শব্দ শুনতে পেতাম। রাতের আঁধার চিরে আমাদের জিকিরের শব্দ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আমাদের আহাজারিগুলি বাতাসে অনিন্দ্য ছন্দ তোলে। আমাদের অন্তরের আবরণগুলো দূর হতে থাকে।
একটা পাখি যেমন তার বাচ্চার চোখ ফোটাতে শক্ত চঞ্চু দিয়ে আঘাত করে। চোখের মত নরম জায়গায় ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে চোখ ফোটায়। কী মমতা আর ভালোবাসায় সে ঠোকরাতে থাকে। একসময় চোখ ফুটেই ছাড়ে। আমরাও হৃদয়ের চোখ উন্মিলিত করার প্রয়াস চালিয়ে যাই। যেন আরশে আযীম দেখতে পাই। যেন মহান মালিককে অনুভব করতে পারি। উপলব্ধি করতে পারি। আল্লাহু আল্লাহু আল্লাহু। কোকিলের কুহু শব্দের মত কী মধুর আর মায়াবি একেকজন সালিকের উচ্চারণ। রংপুরের মাওলানা হুসাইন আহমাদ বারো তসবিহর আমল করান। আর ছয় তসবির আমল করান ফরীদপুরের মাওলানা মাসরুর ভাই।
ইশরাকের নামাজ পড়ে পুকুরপাড়ে দুটি সুদৃশ্য লাল ফরাশ বিছিয়ে বসি। বেশ কজন সালিকিন পবিত্রতা বুকে নিয়ে সূর্যোদয়ের পর এই পবিত্র সময়ে বসে আছে পুকুরের ধারে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে অবগাহিত হয়ে চা নাশতা খাই তাদের সঙ্গে। মিষ্টি মধুর আলাপ আলোচনায় সময় বয়ে যায়। আজ আরও কিছু আমল সেরে আমাদের যেতে হবে ফেনী। ভাই কায়েস ডাব এনেছে। সবাইকে ডাব খাওয়ালো নাস্তার পর। আমাদের জামিয়া ইকরার কৃতি ছাত্র মাওলানা তাওহীদ আমাদের খোঁজ খবর রাখছে। আমাদের পেয়ে এরা যারপর নাই খুশি। আনন্দে আত্মহারা অবস্থা। আর কেবলই এসে ক্ষমা প্রার্থনা। হুজুর! আপনারা এসেছেন আপনাদের কোনো খেদমত করতে পারছি না। সত্যি এমন আদর আপ্যায়ন আর এমন আন্তরিকতা ভালবাসা একমাত্র দ্বীনের নিসবতেই সম্ভব।
রাতে বাসস্ট্যান্ড মসজিদে হুজুরের ইসলাহি আলোচনা শুনছিলাম। এক ভদ্র লোক পাশের মাদরাসার শিক্ষক। আমার পাশেই বসে কথা শুনছিল। আমাকে বলল, আপনি কী কলেজে পড়েন? আমি বললাম, না হযরত! কলেজে না স্কুলেও পড়িনি। তিনি বললেন, আপনি কি শিক্ষিত না? আমি বললাম, আমি খুব গ- মূর্খ। কিছুই জানি না। কিছুই পারি না। লোকটি বলল, এমনিতে দ্বীনদার, তাই তো? আমি বললাম, না মুহতারাম, চরম বদদীন। দ্বীনদারীর কিছুই নাই। সে বলল, আপনার লেবাস দেখে তো মনে হয় দ্বীনদার আপনি। এবার আমি কিছুটা রুক্ষ স্বরেই বললাম, দ্বীনদারী লেবাসে বা দাড়িতে নয়। দ্বীনদারি হচ্ছে হৃদয়ে। আমি নিজেকে দ্বীনদার দাবী করলে বা আপনি আমাকে সার্টিফিকেট দিলেই দ্বীনদার হতে পারব না।
আল্লাহ যদি কবুল করেন কেবল তবেই আমরা বলতে পারব ঠিক দিনের পথে আছি কি না।’ এই মাওলানা আমাদের সম্পর্কে অনেক মন্দ কথা শুনে এসেছেন। আমার সঙ্গে কথা বলে তিনি আমাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার ভেতর সারল্য ছিল। আমার কথা তার পছন্দ হয়েছিল মনে হয়। সকালে দেখলাম- আমাদেরকে দেখতে এ মসজিদেও এসেছেন। আমলেও শরিক হলেন। এভাবে একজন দুজন করে কাফেলা বড় হতে থাকবে আর প্রদীপ থেকে প্রদীপ জ্বলতে থাকবে ইনশাল্লাহ। আমাদের ডাকে কেউ সাড়া দিক না দিক আমাদের তো কোনো ব্যর্থতা নেই। পরাজয় নেই। হারানোর কিছু নেই। আমরা তো কাজ করছি মাওলায়ে পাকের জন্য। কেউ আমাদের কথা শুনলেও মালিক দেখছেন, কেউ না শুনলেও মালিক দেখছেন। মাওলানা ইসমাইল শহীদ রহ. একবার দিল্লির জামে মসজিদে দীর্ঘ সময় বয়ান করলেন। সুন্দর আলোচনার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। বয়ান শেষ করে মসজিদ থেকে বের হবেন। মসজিদের সিঁড়ির কাছে দেখলেন এক লোক দৌড়ে আসছে। শাহ শহীদকে দেখে সে খুব আক্ষেপ করে বলল, হযরত! আমি তো আপনার বয়ান শোনার জন্যই এসেছিলাম।
আপনার বয়ান শেষ হয়ে গেল? মাওলানা শাহ ইসমাইল শহীদ তার আগ্রহ দেখে বললেন, তুমি আমার বয়ান শুনতে এসেছ? আচ্ছা দাঁড়াও। আমি মসজিদে এতক্ষণ যে বয়ানটি করেছি তা তোমাকে হুবহু এখানেই শুনিয়ে দিচ্ছি। এই বলে মসজিদে সদ্য করে আসা পুরো বয়ানটি আগন্তুককে শুনিয়ে দিলেন। অন্য লোকেরা বলল, হযরত! মসজিদে তো বহু মানুষ ছিল তাই এত সময় দিয়েছেন, এখানে একটি লোকের জন্যই আবার আপনি এতটা সময় নষ্ট করলেন? শাহ শহীদ রহ. তখন তার বিখ্যাত উক্তি করেন। তিনি বলেন, মসজিদে ভরা মজমায় যেই একজনকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে বয়ান করেছি এই একজনকেও সেই এক মাওলার রেজামন্দির উদ্দেশ্যেই পুরো বয়ান শুনিয়েছি। উসি এক মাওলা কি রেজা কে লিয়ে।
সুবহানাল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার। দরুদ শরীফ ও ইসতিগফার। এই হলো ছয় তাসবিহ। একশ বার একশ বার করে ছয়শ বার। বার তসবিহতে আছে নফী ইসবাত। শুধু ইসবাত এবং ইসমে জাতের যিকির। অন্তরের শুদ্ধির জন্য খুবই উপকারি আমল। তাসাউফের যত তরীকা বর্তমান দুনিয়ায় আছে তাদের আমলের মাঝে একধরনের সাজুয্য রয়েছে।
সব মাশায়েখ এসব আমল সালিকিনদের দিচ্ছেন। বার তাসবি, ছয় তাসবিহ, মুরাকাবা, পাস আনফাস ইত্যাদি ওয়াজিফা সবাই করছে, করাচ্ছে। তবু আমাদের আমলে ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। খুলনা রংপুর দিনাজপুর গাজিপুর চিটাগাং কুমিল্লা ফরিদপুর ময়মনসিংহ ঢাকাসহ বেশ কটি জেলা থেকে আমরা প্রায় চল্লিশ জন এবারের ইসলাহী প্রোগ্রামে শরীক হয়েছি। মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী, মাওলানা আইয়ুব আনসারি, মাওলানা হুসাইন আহমাদ, মাওলানা তাজুল ইসলাম কাসেমী, মাওলানা ইহতিশামুল হক, মাওলানা শোয়াইব, মুহতারাম আখতার সাহেবসহ অনেক প্রখ্যাত আলেম উলামা রয়েছেন কাফেলায়।
নোয়াখালীর আমল শেষ হলে আমরা বেলা ১১টায় আবার গাড়িতে চেপে বসলাম। ফেনীর উদ্দেশ্যে। ফেনী শহরের কেন্দ্রিয় মসজিদে আমাদের অবস্থান। অনেক বড় মসজিদ। মার্বেল পাথরের ফ্লোর। অনেক দিন পর একটা সুন্দর মসজিদ দেখলাম। এখানেও পরিবেশ আমাদের জন্য অনুকূল নয়। যত প্রতিকূল হয় ততই আমাদের ভালো লাগছে। রূহানিয়াত অর্জন যেন ততই সহজ হচ্ছে। এখানে এক মাওলানার সঙ্গে আমার একান্তে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হলো। সে-ই জিজ্ঞস করলো, আপনাদের ভিন্নতা কোথায়? এসব আমল তো সব মাশায়েখই করেন? তাকে যে কথাগুলি বলেছিলাম তা পাঠকের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
একই বস্তু দৃষ্টিকোণের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন রকম হয়ে যায়। আপনাকে আমি সামনাসামনি দেখছি। আরেকজন পেছন থেকে দেখছে। দুজন একই বস্তু দেখছে কিন্তু দুজনের দুরকম দেখা। আরেকজন আপনাকে দোতলা থেকে দেখল তার দেখাটা আরও ভিন্ন। এখন কেউ যদি আকাশ থেকে দেখে। তাহলে তার যে ব্যাপ্তি তা তো আমার দেখায় থাকবে না। অথচ আমরা সবাই একই বস্তু দেখছি। কিন্তু যে ব্যক্তি ব্যাপ্তী নিয়ে গভীরভাবে দেখতে পাচ্ছে; আপনার আশপাশ এবং সার্বিক পরিস্থিতি যে দেখতে পাচ্ছে তার দেখাটা অন্যরকমই হবে। তার দেখার ওজন অন্য সাধারণ দেখার চেয়ে বেশি হবে কি না? একই কথা আপনি আমি বা লক্ষ কোটি আলেম বলে। সেই কথাটিই নবীজীর জবান মুবারক থেকে বের হলে সেটার ওজন কত বেশি হয়! তাই না? আমরা যে আমলগুলো করছি তা আরও অনেক খানকায় বা খানকা ছাড়াও আছে তবু আমাদের আমলগুলো অবশ্যই ভিন্ন। আমাদের আওরাদ ওয়াজাইফের রং অন্যরকম। আমরা যখন বের হই আল্লাহর রাস্তায় আমাদের চোখের সামনে তখন সারা বিশ^। পুরো উম্মত। সকল বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে এক জিহাদের উদ্দেশ্যে আমাদের এই ইসলাহী সম্মেলন। সারকথা, দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের কারণে একই বস্তুর মাপ বিভিন্ন হয়ে যায়।
অনেক জ্ঞানের পথ এ সফরে আমার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে আমার সামনে ইলমের একেকটি অধ্যায় খুলেছে। আমি যেন চোখের সামনে খোলা পাতা দেখতে পেয়েছি। এমনকি আমার জন্য লেখাটা অগ্রসর করা অসম্ভব মনে হয়েছে। আমাদের আধ্যাত্মিক রাহবার এই মহান মুজাদ্দিদ যখন একেকটি আয়াত তেলাওয়াত করেছেন নতুন নতুন রং নিয়ে আয়াতটি যেন আমাদের সামনে বিকশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় এই ইসলাহী সফরে বেরিয়ে আমার ভেতর যে অনুভূতি জমা হয়েছে আমি তার সব কিছু অক্ষম ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। যদি ৬৩ জেলায় আমরা ৬৩ টা সফর করতে পারি তাহলে আশা করি আমাদের অনুভূতিগুলি লিখে কিছু কিছু প্রকাশ করতে পারব। নূরানি সফরগুলির বারাকাত মূলত উপলব্ধির বিষয়। অব্যক্ত সেই উপলব্ধি কেবল অংশগ্রহণেই বুঝে আসবে।
একটি বিশেষ দিকের কথা বলব। যা এই নোয়াখালীর সফরে আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। তাসাউফের ভাষায় একে ইলহামও বলা যায়। ইলহাম ও কাশফের কথা আমরা আগে বইয়ের পাতায় পড়েছি। পাঠককে দাওয়াত দেব এধরনের নুরানি কাফেলায় শরিক হয়ে আধ্যাত্মিকতার স্বাদ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধির সুযোগ গ্রহণ করুন। অনেক পরিভাষা আপনার সামনে নতুনভাবে উন্মোচিত হবে। ইলমের নতুন নতুন অধ্যায় বিকশিত হবে আপনার হৃদয়ে। আকাবির আসলাফের রূহানিয়াতের কিয়দাংশ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আপনাকেও দিবেন। ইনশাল্লাহ।
ইসলাম সহজতার ধর্ম। সহজতা এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধর্ম অর্থ জীবন-দর্শন হলে ইসলামও একটি জীবনদর্শন। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে তা জটিল থেকে জটিল হয়ে যায়। ইসলাম এসেছে প্রকৃতির কাছে মানুষকে ফিরিয়ে নিতে। সেই চিরন্তন সহজতায়। যা মানুষের ওপর বিরাট বোঝা হয়ে পড়েছিল। দীনুল ফিতরাত দিনুল ইসলাম সব বোঝা সরিয়ে দিয়ে মানুষের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। নবীজী বলেন, আদদীনু ইসরুন। দ্বীন পরম সহজ বিষয়। ইয়াসসিরু। তোমরা মানুষের সামনে দীনদারিকে সহজ কর। কঠিন করো না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, মা জাআলা আলাইকুম ফিদদীনি মিন হারাজ। কোন কষ্ট রাখেননি আল্লাহ তোমাদের ধর্মে। সমাজ বদলের মত কঠিন কাজটিও করতে হবে সহজ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নিজ থেকে শুরু করতে হবে। তুমি তোমাকে বদলাও।
সবাই যদি অন্যকে বদলানোর ফিকিরেই নিজেকে বদলানো শুরু করে তাহলেই তো সমাজের আমূল সংস্কার হয়ে যায়। আর যদি নিজে সামান্য পরিবর্তন না হয়ে অন্যকে ইসলাহের ফিকির করে তাহলে বিরাট বোঝা তার মাথায় চলে আসে আর এভাবে সত্যিকারার্থে কোনো ফায়দা ই হয় না। দিন দিন অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সমাজে বিশৃংখলা বাড়তে থাকে। হানাহানি, মারামারি, ধর্মের নামে, কাটাকাটি শুরু হয়ে যায়। বর্তমান দুনিয়ার সমস্ত বাতিল সংগঠন থেকে দেওবন্দি ধারার পার্থক্য এখানেই। আমাদের লক্ষ্য সেই সহজ ধারাটির চর্চা শুরু করা। কারো দোষ চর্চা নয়। অন্যকে নয়। নিজেকে সংশোধন করার মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ করা। অন্তত আমি যদি অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারি তাহলে সমাজ অনেক অনাচার থেকে বাঁচতে পারবে। ব্যক্তি জীবন ঠিক হলেই সমাজ ও রাষ্ট্র ঠিক হবে। সামগ্রিকতার চিন্তা ইসলামে অবশ্যই আছে কিন্তু তার পদ্ধতি এই।
ইসলামি হুকুমত কায়েমের নামে ইসলামের চিরন্তন জীবন দর্শনকে খুব জটিলভাবে উপস্থাপন করা হয় আমাদের সমাজে। এতে করে মানুষ দিন দিন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সেই আকর্ষণী ক্ষমতা আর থাকছে না ইসলামের। একজন নীতিবান প্রীতিপূর্ণ মুসলমানের ভেতর যে আকর্ষণী ক্ষমতা রয়েছে তা এই বুভুক্ষু সমাজ খুব একটা দেখতে পায় না। ইসলাম কী? কীভাবে আমার ভেতর ইসলাম আসবে? কেবল আল্লাহ নামের উচ্চারণ দিয়েই যে আমি খাটি মুসলমান হতে পারি তা যেন বিশ^াস হতে চায় না। বিশ্বাস না হলে নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহ শব্দের উচ্চারণ করে দেখুন। প্রত্যেকে নিজেকে দিয়ে পরিবর্তন শুরু করুন। প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম কায়েম করুন। অবশ্যই আপনি এর সুফল পাবেন। দেখবেন পুরো সমাজ ঠিক হয়ে গেছে।
আবু বকর রা. নবীজীর তিরোধানের অব্যবহিত পর চরম দুঃসময়েও এ শিক্ষাটিই দিয়েছেন। যখন আরবের বহু কবিলা কাফের হয়ে গেল। কাফারা মান কাফারা মিনাল আরাব। অনেক ভ- নবী দাবিদার নবুওয়াত দাবি করে বসল। অপর দিকে রোম ও পারস্যের পরাশক্তি হুমকি দিচ্ছিল। যে কোনো সময় মদীনা মুনাওয়ারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ছিল। এ সময়ের ঘটনা। যাকাত অস্বীকারকারীদের সাথে তখন কিছু শিথিল আচরণের কথা বলছিলেন হযরত উমর। চরম এই পরিস্থিতিতে তখন সিদ্দিকে আকবর বলেননি এত এত মুসলমান থাকতে কি ইসলামের এমন ক্ষতি হতে পারে? সবার দায়িত্ব তিনি নেননি।
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, আমি আবু বকর বেঁচে থাকতে দ্বিনের সামান্য ক্ষতি হবে? আমি তা হতে দিব না। তার এ দৃঢ় উচ্চারণ সবার মনে বসে যায়। প্রত্যেকেই তখন নিজেকে দায়িত্বশীল জ্ঞান করতে শুরু করে। উম্মতের প্রথম মুসলমান হযরত সিদ্দিকে আকবর আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন একথা। চরমতম সময়েও অস্থির না হয়ে নিজের থেকে শুরু করতে হবে দ্বীনদারির চর্চা। আজ আমাদেরও উচ্চারণ করতে হবে সেই সুন্দর প্রাণদায়ি বাক্য। আ ইয়ানকুসুদ্দিন ওয়া আনা হাই। আনতা আনতুম বা হুম এমনকি নাহনুও নয়; আনা অর্থাৎ আমি আমার কাছ থেকেই শুরু করব মেহনত। অন্যকে বদলাতে হলেও নিজেকে বদলাতে হয়। না হলে কথার কোনো আছরই হয় না।
রূহানিয়াত ছাড়া অন্যকে প্রভাবিত করার আত্মিক শক্তি কিভাবে লাভ করা যায়? বাতাসে আল্লাহর নামের ঢেউ তুলব আল্লাহ নামের ঢিল ছুড়ব আর নেক আমল দিয়ে বাতাসকে ভারি করব। এভাবেই কায়েম হবে দ্বীনী সমাজ। আল্লাহর কালিমা সর্বত্র বুলন্দ হবে। এই জিহাদে তাহলে পরাজয় বা পরাভব কীকরে আসবে? ইহকাকে হক ও ইবতালে বাতিলের মেহনত এভাবে জারি থাকলে কেয়ামত পর্যন্ত চলমান হকের এ কাফেলাকে বাতিল কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। হাদীসে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে- আমার উম্মতের একটি ছোট্ট দল কেয়ামতের আগ পর্যন্ত হকের পথে অবিচল থাকবে। তাদের বিরোধীরা তাদের সামান্য ক্ষতিও করতে পারবে না।
চিটাগাং থেকে মাওলানা আসাদ এসেছিলেন। চিটাগাং শহরের একটি মাদরাসার মুহতামিম তিনি। ফেনীতে আমাদের সাথে আমলে শরীক হলেন। আমাকে বললেন, আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে আপনারা চিটাগাং আমার মাদরাসায় প্রোগ্রাম করবেন। আমি বললাম, ছয় মাসের প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে আছে। পরের ছয়মাসের ব্যাপারে যখন পরামর্শ হবে তখন প্রথমেই আপনাকে অগ্রাধিকার দেবার কথা প্রস্তাব করব। রব্বে কারীম মানুষের মন প্রস্তুত করে দেন। যেখানে বহু মানুষ খেয়ে না খেয়ে আমাদের থেকে সাধারণ মানুষকে বিরূপ করার চেষ্টায় লেগে আছে সেখানে আল্লাহ গায়েব থেকে আমাদের জন্য অনেকের মনে নির্মল নিখাঁদ ভালোবাসাও সৃষ্টি করে দিচ্ছেন। এ সবই তাঁর লীলা। তাঁরই কুদরত। আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু কুল্লুহু। ওয়া লাকাশশুকরু কুল্লুহু।
নোয়াখালি এবং ফেনিতেও আমাদের বিরুদ্ধে প্রচুর অপপ্রচার হয়েছে। এমনও শুনেছি জামাত শিবির ও দেশবিরোধী নানান অপশক্তি সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতেও নানান কৌশল অবলম্বন করেছে। আমাদের তো কোনো ভয় নেই। যদি এপথে মৃত্যু আসে তবে তো আমরা ভাগ্যবান। হুজুরের মুখে সেই আয়াত শুনে আমাদের সব ভয় দূর হয়ে যায়। লা তাহযান। হযরত আবু বকরকে নবীজী হিজরতের পথে বলেছিলেন। লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মাআনা। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হুজুরের কথামালা তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। হুজুরের মুখে এ সফরে কয়েকবারই আয়াতটির তাফসীর শুনলাম। কতবার এ আয়াত পড়েছি। কিন্তু এমনভাবে মনে হয় কখনওই ভাবা হয়নি। সত্যি হুজুরের মুখে শোনার পর মনে হয়েছে মাত্রই বুঝি জিবরাইল আয়াতটি নিয়ে নাযিল হয়েছেন। হুজুর উদহারণ দিয়ে বলেন, বাচ্চা বাবার সাথে বাজারে যায়, তার কোন দুশ্চিন্তা থাকে না। কারণ বাবা তার সঙ্গে আছে। বাইরে যেখানেই যাক তার চিন্তার কোন কারণ নেই। টিকেট কাটতে হবে, গাড়ি ঠিক করতে হবে, কী খাবে, কী করবে, কোনো কিছুরই কোনো চিন্তা হয় না। হ্যাঁ, দুশ্চিন্তা হয় তখন, যখন নাকি সে তার বাবাকে কিছু সময়ের জন্য হারিযে ফেলে। তখন তাকে চকলেট দিয়েও থামানো যায় না। চিপস বা আইসসক্রিম কিছুতেই তাকে বশে আনা যায় না। তার কান্না এতই বেড়ে যায় যে, তাকে আর শান্ত করা যায় না। তো মুমিনেরও দুশ্চিন্তার কিছু নেই; কারণ আল্লাহ তার সঙ্গে আছে। তাহলে আর তার চিন্তার কি আছে? লা তাহযান। চিন্তা করো না। ইন্নাল্লাহা মাআনা। শাহাদাতের মৃত্যু সে তো মুমিনের চির দিনের তামান্না। আমরা সব সময় এ দুআই করেছি- হে আল্লাহ তোমার পথের মৃত্যু দাও। শাহাদাতের মৃত্যু দাও।
ফেনিতে দরুদ সালামের আমল করলাম। মাশওয়ারায় ঠিক হয়েছিল মাওলানা মাকনুন ভাই দরুদ সালাম পাঠ করবেন। অসুস্থ বোধ করায় আমাকে দরুদ শরীফের আমল করতে বললেন। খুব অন্তর দিয়ে নবীজীর উপর দরুদ পড়লাম। সালাত ও সালাম পাঠালাম মদীনা মুনাওয়ারায়। তারপর রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত হযরতের বয়ান ও বাইআত হলো। মসজিদের দোতলায় খাওয়া দাওয়া শেষে আবারও মুনাজাত হলো। রাত বারোটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। অন্য রকম রূহানিয়াত নিয়ে আমরা গাড়িতে বসেছি।
গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্র জামিয়া ইকরার দিকে। পেছনে ফেলে যাচ্ছি দু দিনের সুন্দর কিছু স্মৃতিময় মুহূর্ত। হে খোদা! তুমি আমাদের এই ক্ষুদ্র আমল কবুল করো। মানুষের হেদায়েতের জরিয়া বানাও। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবেই তোমার দ্বীনের কাজ করে যাবার তাওফিক দাও। মানুষের কল্যাণে আল্লাহর রেজামন্দির তরে ব্যয় হোক আমাদের জীবন মন মনন ধন দৌলত স্বাস্থ্য শক্তি ও সুস্থতা। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আমীন। ওয়া সাল্লাল্লাহু আলা সায়্যিদিনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া বারাকা ওযা সাল্লামা।
লেখক : শিক্ষক ও ফিকহে ইসলাম বিশেষজ্ঞ-দাঈ


