- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
শীত উপেক্ষা করে শুরু হয়েছে ওয়াজ মাহফিল। গ্রাম থেকে শহর, সবখানে। বিভিন্ন দ্বীনি মাদ্রাসা, মসজিদ এবং এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওয়াজ মাহফিলে যুবকদের আবেগ-উচ্ছাস। বৃদ্ধদের মাঝেও কাজ করে চরম অনুভূতি। কিশোরদের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। কোথাও ওয়াজ মাহফিল আয়োজন হলে এই তিন শ্রেণী। যুবক-বৃদ্ধ কিশোর এদের উপস্থিতি। তবে যুবকদের থাকে সংখ্যাধিক্য। দলে দলে ছুটে যায় তারা। পুরো ময়দান তাদেরই দখলে। ওয়াজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জমিয়ে রাখে তারা।
ওয়াজ মাহফিল কিন্তু আগের থেকে তুলনামুলক বেশী হচ্ছে। মাহফিলের সংখ্যা কম নয়। পাড়ায় পাড়ায় ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে এখন। লোক সমাগমও বেশী হচ্ছে। আবার ওয়াজ মাহফিলে বক্তাও বেশী। ঘরে ঘরে এখন বক্তা। যেখানে সেখানে এখন বক্তা পাওয়া যাচ্ছে। হিসাব করলে দেখা যাবে হাজার হাজার বক্তা ময়দানে বক্তৃতা করছেন।
তবে পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি ময়দানে যারা বক্তৃতা করছেন, অধিকাংশ ওয়ায়েজের ইলম-কালাম কম। কেউ আছেন, অল্প ক্লাশ পড়াশুনা করা, কেউ মোটেও পড়েননি। তারা কোরআনও বুঝেন না হাদীসও বুঝেন না। কারো কোরআন পড়াই সহী নেই। গলদ কোরআন পড়া তাদের। এরকম মূর্খ মানুষ ওয়াজ নসীহত করে যাচ্ছেন। কেউ তো ওয়াজের ময়দানের বড় বড় চেয়ার দখল করে আছেন।
সংগীত শিল্পি থেকে আস্তে আস্তে এখন ওয়াজের ময়দানে চলে এসেছেন। ইউটিউব চ্যানেল দেখে বক্তাদের ওয়াজ নকল করে এখন তিনি বড় বক্তা সেজে বসে আছেন।
আবার কিছু কিছু মাদ্রাসা পড়ুয়াও আছে। তবে তাদের যোগ্যতা মোটেও নেই। তার কারণ, ছাত্রজীবন কেটেছে পিছনের টেবিলে বসে। কোন কিতাব বুঝে পড়ার সময় হয়নি। পরীক্ষায়ও তারা ডাব্বা মেরেছিলেন। কিন্তু গলায় ছিল ভাল সুর। গজল বা ইসলামী সংগীত গাইতে পারতেন। সেই সংগীত শিল্পি থেকে আস্তে আস্তে এখন ওয়াজের ময়দানে চলে এসেছেন। ইউটিউব চ্যানেল দেখে বক্তাদের ওয়াজ নকল করে এখন তিনি বড় বক্তা সেজে বসে আছেন। মুখস্থ ওয়াজ আবার তার সাথে কিছু কেচ্ছা-কাহিনী জুড়ে দিয়েছেন। সাথে কিছু চুটকি রপ্ত আছে তার। মোটকথা ময়দানে এখন ভালই কদর পাচ্ছেন।
এরকম শত শত বক্তা বেরিয়েছে। আজগুবি কেচ্ছা কাহিনীতে ভরপুর। কোরআন-হাদীসের তাফসীর বা ব্যাখ্যাতে না গিয়ে কেচ্ছা আর গান গেয়ে গেয়ে সময় পার করেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, ভুল ব্যাখ্যা। ওসব অল্প শিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত বক্তারা জনগণকে ভুল মেসেজ দিচ্ছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে কোরআন পড়ছেন ঠিকই, তেলাওয়াত সহী, কিন্তু ব্যাখ্যা দিচ্ছেন আরেকটা। যেটা জাতির জন্য বড় ক্ষতিকর।
আবার কিছু লোক যে আজগুবি কাহিনী মঞ্চস্হ করেন, বিষয়টা অনেক খতরনাক। কেননা, মিথ্যা কাহিনী বা কল্প কাহিনী শুনে মানুষ গোমরাহীতে লিপ্ত হচ্ছে। এজন্য মুর্খ বক্তা বা ওয়ায়েজ বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বিজ্ঞ আলেম আছেন, যারা কোরআন-হাদীসে পারদর্শি। তারা কিন্তু ওয়াজ মাহফিলে আসছেন না। যারা আসছেন তাদের সংখ্যা সীমিত। দু-চারজন যোগ্য আলেম পাওয়া যাবে যারা ময়দানে কথা বলেন। কেননা, ওয়াজের ময়দানের ভেল্কিবাজ বক্তাদের কারবার দেখে মুলত যোগ্য আলেমগণ ময়দানে নামতে চান না। তারা দূরে দূরে থাকেন।
আবার যে সমস্ত আলেম দীর্ঘদিন পড়ালেখার পরে এখন কোরআন-হাদীস চর্চা করে থাকেন। এমন আলেমদের দরকার ওয়াজের ময়দানে।
কিন্তু সমস্যা হলো, যোগ্য আলেম না আসার কারণে ময়দানে ওই সব মূর্খ লোক ওয়াজ করে পুরো ওয়াজের ময়দান তাদের দখলে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা যা বলছে, যা করছে, পাবলিকও সেই দিকে দৌড়াচ্ছে। ওরা ভুল বলুক আর মিথ্যা বলুক, সাধারণ জনতা সেটা গ্রহণ করে নিচ্ছে। এজন্য ওয়াজের ময়দানে প্রয়োজন যোগ্য আলেমের। যাদের ইলম আছে, যারা কোরআন-হাদীসের সহী ব্যাখ্যা দিতে পারেন। যারা মাদ্রাসাতে উস্তাদের নিকটে কোরআন হাদীস শিখেছেন। যারা বিশুদ্ধ কোরআন জানেন, যাদের চিন্তা-চেতনা সহী আছে। আবার যে সমস্ত আলেম দীর্ঘদিন পড়ালেখার পরে এখন কোরআন-হাদীস চর্চা করে থাকেন। এমন আলেমদের দরকার ওয়াজের ময়দানে। যদিও ওসব আলেমদের সময় কম তারপরেও যতটুকু সময় পান তাদের একটু ময়দানে নামা প্রয়োজন। নচেৎ গোমরাহ ওয়ায়েজ বা বক্তাগণ মানুষকে আরো গোমরাহীতে নিয়ে যাবেন।
প্রয়োজন বোধে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা কমাতে হবে। ঘরে ঘরে মূর্খ বক্তাদের দিয়ে শত শত ওয়াজ না দিয়ে যোগ্য আলেমদের দ্বারা দু একটা ওয়াজ মাহফিল দেওয়া শ্রেয়। এজন্য সকলের আওয়াজ তোলার দরকার। ওয়াজ মাহফিলে যোগ্য আলেম চাই। আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট
আরও পড়ুন: মূর্খ ওয়ায়েজ জাতির অভিষাপ


