কওমীতে দুর্দিন : হেফাজতের নাজাসাত কারা?

কওমীতে দুর্দিন : হেফাজতের নাজাসাত কারা?

কওমীতে দুর্দিন

হেফাজতের নাজাসাত কারা?

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: কওমীতে দুঃসময় চলছে। দুর্দিন অতিবাহিত হচ্ছে। বড় খতরনাক। ভয়াবহ অবস্থা। আমরা আগে কখনো এমন দেখিনি। এরকম পরিস্থিতির শিকার আমাদের কওমী মাদ্রাসা হয়নি কখনো। ইতিহাসে পড়েছি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রোষানলে পড়েছিল আমাদের ওলামায়েকেরাম। কওমী মাদ্রাসাগুলোকে ধুলিস্মাত করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। হাজারো আলেমকে তারা ফাঁসি দিয়েছে। দেশব্যাপী এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তখন। হুজুর মানেই ছিল তখন বিপদ। আলেমদের টার্গেট করে করে তারা হত্যা করেছিল। তারপরেও কিন্তু আলেমগণ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বাতিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নেমেছেন।

হালজামানায় আলেমদের অবস্থা সেরকম নাজুক। এত সমালোচিত আর কখনো দেখা যায়নি। এরকম দুঃসময় আর আসেনি। আমাদের ছোট্ট জীবনে এরকম দেখিনি। এখন অবশ্য কেউ আলেমদের হত্যা করছে না। তবে হত্যার থেকেও জঘন্য।
” আল ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল কতল” ফিতনা সৃষ্টি করা হত্যার থেকেও জঘন্য।

পুরো অনলাইনে এখন হুজুরদের খবর। এক হুজুর আরেক হুজুরের বিরুদ্ধে। এক আলেম আরেক আলেমের পিছে লাগা। একটার পর একটা ফিতনার দ্বার উম্মোচন হচ্ছে। হাটহাজারী থেকে ফরীদাবাদ, এরপর বারিধারা, এখন চলছে লালবাগ।
আমি আগে একদিন বলেছিলাম, ওরা কিন্তু কাউকে বাদ রাখবে না। শুধু দু একজন মুরুব্বী ওদের টার্গেট নয়। ওরা পুরো দেওবন্দী আলেমদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। পর্যায়েক্রমে ওরা ওদের বস্তার মুখ খুলে দিচ্ছে। বেরিয়ে আসছে সব আজগুবি তথ্য। সত্যমিথ্যার যাচাই হতে হতে কাম সারা হয়ে যাচ্ছে।

এত সমস্যা, এত সমালোচনার মধ্যে আবার আগুনে কেরাসিন ঢেলে দিলেন মুহিব খান। হেফাজতে ” নাজাসাত” বেফাকে ” নেফাক” কিছু ক’বোনা সব গোল্লায় যাক”।

হেফাজতে নাজাসাত। নাপাকি। মুহিব খান ভাল কবি। নিজেকে তিনি জাগ্রত কবি দাবি করেন। কিন্তু জেহেন বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগে। এর আগে তিনি চরমোনাই সস্পর্কে এক মন্তব্য করে ঝড় তুলেছিলেন। আবার এখন হেফাজত আর বেফাক নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য তার।

হেফাজতে নাজাসাত কারা ঢোকাল? কারা সেই শাপলার মিটিংএ গাদ্দারী করেছিল? কারা সেদিন উস্কানীমূলক বক্তৃতা করেছিল? সবই কিন্তু জাতির কাছে স্পষ্ট।

হেফাজতকে নাপাক করেছিল তারা, যারা হেফাজতকে ক্ষমতার সিঁড়ি বানাতে চেয়েছিল। যারা রাস্তার দু পাশের বৃক্ষগুলো ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটে সাবাড় করেছিল। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে বায়তুল মোকাররমে অগ্নিসংযোগ করেছিল। তারাই হল, হেফাজতের নাজাসাত। তারাই নাপাকি।

মওদুদী আর তার দোসরেরা হেফাজতের আন্দোলনকে নস্যাত করেছিল। মওদুদীবাদের মদদপুষ্ট কিছুলোক উস্কানী বক্তব্য দিয়েছিল। সরাসরি মওদুদীপন্থীরা স্টেজে ছিল। তারা বক্তৃতায় বলেছিল, আমাদের ধমনীতে মওদুদীর রক্ত প্রভাহিত হয়!, অথচ অনেক হকপন্থী তুখোড় রাজনীতিবিদকে স্টেজে উঠতে দেওয়া হয়নি। নাজাসাতীদের দৌরাত্ম্যে স্টেজের কাছেও ঘেঁষতে পারেন নি।

আবার সাউন্ডগ্রেনেড দামাতবারাকাতুহুম সাহেব এমন উস্কানী মারলেন, সেটা তো কোন অরাজনৈতিক সংগঠনের বক্তৃতা নয়। মানে মওদুদীর চিন্তাধারা অক্টোপাসের মত পেঁচিয়ে ধরেছে ওনাদের। আবার উনিই সাঈদী সাহেবের মুক্তি চাইলেন। দেশব্যাপী সমালোচনা উঠল। হেফাজতের কিছু নাজাসাত আছে। সেসব মওদুদীবাদের সমর্থক।

ঐ উস্কানীদাতা টঙ্গীর ঘটনার পর ছাত্রদের নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম কাজের জন্মদিয়েছিলেন তিনি। বয়োবৃদ্ধ আলেমের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছিলেন হাজারো মানুষের সামনে। সেটা কিন্তু জাতি ভোলেনি। নাজাসাত কত প্রকার ও কী কী? সবই আমাদের জানা আছে।

কওমীর বাগানে ফুটবে না আর ফুল/ পানি ঢেলে লাভ নেই/ পচে গেছে মূল।

যারা কওমী মাদ্রাসাকে মনে প্রাণে ভালবাসে না, তাদের কথা এটা। কোন দেওবন্দী সন্তান তার মূল পঁচে গেছে সেটা বলতে পারে না।

কওমী মাদ্রাসার মূলে কারা সেটাতো আমরা জানি। এ প্রতিষ্ঠানের মূল তো আকাবির- আছলাফগণ। এর মূলে কাসেম নানুতবী রহ. শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ. শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এরকম হাজারো বুজুর্গানেদ্বীন। তাহলে ওনারা কি পচে গেছেন? আছতাগফিরুল্লাহ।

মুহিব খানের এত্ত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। আপনি কবিতা লিখতে পারেন, তাই বলে মুরুব্বীদের শানে বেয়াদবী করতে পারেন না। তা এ জাতি বরদাশত করবে বলে আমার মনে হয় না।

বিপদের সময় কিভাবে সমস্যার সমাধান হয়, সেটার পরামর্শ দিতে পারতেন। তা না করে ফিতনা সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। বড় দুঃখজনক। কওমীতে শান্তির পরিবর্তে আরো অশান্তি ডেকে আনা কাম্য নয়।

বেফাকে দুর্নীতি হচ্ছে। যেটার ব্যাপারে লেখালেখি হচ্ছে। অজ্ঞাত স্থান থেকে লিখে যাচ্ছেন। আবার আরেকজন ব্রিফিং দিলেন। ৬০ গ্রাম থেকে আশি গ্রাম। একদম কাগজের ওজন উল্লেখ করে দিলেন।

তবে তিনি আগে থেকে জানতেন। এতদিন উনি গোপন রেখেছেন, এটা ঠিক হয়নি। সেই সময়ে ব্যবস্থা নিলে ভাল হত। যাইহোক, হয়ত অন্য কোন কারণ থাকতে পারে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরাও। দুর্নীতিকে সমর্থন করি না। যে কোন মূল্যে বেফাকের অনিয়ম এবং অস্বচ্ছতা বন্ধ করা জরুরি। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে চাই। দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই। আজ দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে বেফাকের ঐতিহ্য হুমকির মুখে। শত শত বছরের সুনাম- সুখ্যাতি ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। মানুষের আস্থা – ভালবাসা ওঠে যাচ্ছে আলেমদের থেকে।

এই দুনীতির মহোৎসব এবং অনিয়মের ডালপালা যত গজিয়েছে, তার জন্য অতিভক্তিও কিছুটা দায়ী। যাকে তাকে দায়িত্বে বসানো। পারিবারিক লোককে আশ্রয়- প্রশ্রয়। নিজের কাছের লোকের মূল্যায়ন। যোগ্য লোককে পিছে ফেলা। এসব কারণেই সুত্রপাত।

এখন আবার নতুন করে কিছু হোক। সেখানে কি আমরা পারব স্বচ্ছতা বজায় রাখতে? এখনতো আঞ্চলিকতা খোঁজা হয়। সব নিজ এলাকার লোক তালাশ করা হয়। অযোগ্য হলেও সেখানে তাকে বসানো হয়। লবিং করে শেষমেষ ওরাই। যারা আমরা লেখালেখি করছি, তুলোধুনো করছি বেফাককে। তাদেরও যদি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তারা আসাবিয়্যাত খুঁজবেন। ঢাকা শহরে তো আমরা দেখেছি বহু বছর। একজন সেই এলাকার কেউ ঢুকে গেলে, পরবর্তি চেয়ার তাদের জন্য খালি হয়ে যায়। পরিশেষে সব একাকার।

যাইহোক, টাকা মেরে খাওয়া যেমন দুর্নীতি, তেমনি নিজ মতের লোককে প্রাধান্য দেওয়া আরো বড় দুর্নীতি। সবধরনের অনিয়মকে না বলতে হবে।

ফিতনার রাস্তাগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন। যেদিক দিয়ে ফাসাদ সৃষ্টি হবে, সে রাস্তা টোটাল অফ রাখা চাই। অনলাইনের এ্যক্টিভেটরগণ যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে সুফল কতদূর, আল্লাহ ভাল জানেন। বেপরোয়া গতি কিন্তু হঠাৎ থেমে যায়। মুখ থুবড়ে পড়ে।

আরেকটা বিষয় হল, তাহকিকের সাথে কথা বলা চাই। তাহকীক ছাড়া কাউকে খামাখা দোষারোপ করা গোনাহের কাজ।এই দুঃসময়ে দেওবন্দী আলেমগণের সচেতনতা জরুরি। কারো দেখাদেখি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া সমিচীন মনে করি না।  নেককে দেখছি, নিজের চিন্তা- চেতনা লোপ পেয়েছে। অন্যের দেখাদেখি দৌড় শুরু করেছেন। নিজ বুঝ থাকা চাই। নিজস্ব বুদ্ধি- বিবেককে কাজে লাগান। তাতেও অনেক ফায়দা নিহিত আছে।

আল্লাহ আমাদের সকলের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *