- আদিল মাহমুদ
আমরা তখন শিশু নই, আবার পুরোপুরি যুবকও নই। বয়স ছিলো দু’পাড়ের মাঝখানে ঝুলে থাকা সরু সাঁকোর মতো, পেছনে শৈশবের নিশ্চিন্ত হাসি, সামনে অনিশ্চিত যৌবনের ডাক। এই মাঝামাঝি বয়সেই শবে বরাত যেনো আমাদের নিজের মতো করে চিনে নিতো। মসজিদের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পরিচিত দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যেতো। যেনো কেউ বাস্তবের উপর হালকা পর্দা টেনে দিচ্ছে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো ছড়িয়ে পড়তো। ছোটো ছোটো আলোর বিন্দু, ঠিক যেনো অন্ধকারের বুকের উপর ছড়িয়ে থাকা সারাবছরের দুআগুলো। মনে হতো, আজ তাদের আলো বেশিই উজ্জ্বল। তারা যেনো ফিসফিস করে বলছে, ‘জেগে থাকো। এই রাত ঘুমানোর জন্য নয়।’ মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই সময়ের গতি বদলে যেতো। ঘড়ির কাঁটা যেনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকতো। কার্পেটের গন্ধে মিশে থাকতো শতো শতো সিজদার স্মৃতি, পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত আর হামদ-নাতের সুর বাতাসকে ভারী করে তুলতো। বয়স্কদের নিচু, ভাঙা অথচ দৃঢ় দুআর শব্দগুলো মনে হতো, জীবনের অনেক যুদ্ধ দেখে ফেলা মানুষের নীরব সাহস। সিজদায় মাথা রাখলে মনে হতো, নিজের ভেতরের সব তাড়াহুড়ো, সব প্রশ্ন, সব অস্থিরতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেছে। পৃথিবী তখন শুধু কপাল আর মাটির মাঝখানের একটুকু দূরত্ব। কিন্তু উঠে দাঁড়ালেই কৈশোরের সেই অস্থির প্রশ্নগুলো আবার ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই থামা আর ফিরে আসার মাঝখানেই যেনো শবে বরাতের আসল সৌন্দর্য। নামাজ শেষে মসজিদের উঠোনে সমবয়সীদের সঙ্গে দাঁড়ানো ছিলো অন্যরকম পৃথিবী। কেউ হালকা হাসি দিচ্ছে, যেনো হাসির ভেতরেও একটা লুকানো কৃতজ্ঞতা আছে। কেউ চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে প্রশ্ন, না কি আশাবাদ, বোঝা যেতো না। কেউ আবার বলছে, ‘চলো, একটু ঘুরি। রাত গভীর হলে নফল নামাজে দাঁড়াবো।’ এই ‘চলো’ শব্দের ভেতরেই ছিলো রাতের আসল ডাক, অজানা, অথচ আপন। আমরা হাঁটতাম, কোনো গন্তব্য ছাড়া। বন্ধ দোকানের শাটার, আধো আলো জ্বলা জানালা, দূরে শিয়ালের ডাক, সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক পরবাস্তবের দৃশ্যপট। যেখানে বাস্তবের নিয়মগুলো ঢিলেঢালা হয়ে যেতো। রাত তখন আর কেবল সময় নয়, এক ধরনের অনুভূতি। কথা হতো এলোমেলো, কিছুই খুব গভীর না, তবু অদ্ভুতভাবে সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। সেই কথার ভেতর কেবল ছিলো জান্নাত-জাহান্নামের আলাপ। এই হাঁটার ভেতরেই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখানোভূতি পাওয়া যেতো। কৈশোরের উদ্দীপনা তখন আর চঞ্চলতা ছিলো না, তা ছিলো নিজেকে টের পাওয়ার অনুভব। মনে হতো, আমরা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। বয়স বাড়ছে না শুধু, ভেতরের মানুষও আকার নিচ্ছে।
“একদিন সুবহে সাদিকে ইস্তেগফার করে
রমজানের প্রথম দশক কিংবা শেষ দশকের শুক্রবারে
জীবনকে পূর্ণতার চুম্বন দিয়ে
ধরণীকে বিদায় জানিয়ে তার ডাকে সাড়া দেবো
ইনশাআল্লাহ।”
কবি ও লেখক


