কোটি বাঙালির তপস্যায় জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধু
আদিল মাহমুদ ● জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সময়ের তটে আপন মহিমায় উন্নীত বিশাল এক মহিরুহ। সফল এক ব্যক্তিত্ব—সফল ব্যক্তিগণের অনন্য এক কারিগর। শেখ মুজিবুর রহমান! শুধু কী একটি নাম? একটি জাতির পিতা—নাকি অন্য কিছু! শেখ মুজিব নামটির সঙ্গে মিশে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনার পলল ভূমির পরিচয়। শেখ সাহেব ডাকটি যেন হাজার বছরের পরাধীন বাঙালির আত্মপ্রত্যয়ের ধ্বনি। বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে শেখ মুজিব ধ্রুবতারা—উজ্জ্বল নক্ষত্র।
সমগ্র বাঙালি কাছে তিনি অবিসংবাদিত নেতা। হাজার বছরের পরাধীনতা, নিপীড়ন, নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠের কর্ণধর বীর বাঙালির নেতা। তাঁর প্রশস্ত বুকে ছিল অসীম সাহস—ছিল পাহাড়ের মতো দৃঢ় প্রত্যয়। শোষণ, বঞ্চনায় দ্বি-খণ্ডিত মানুষের ব্যথায় তাঁর আহত হৃদয় নৈঃশব্দে কেবলই কেঁদে উঠত। অন্যায় ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বরও এমন—মৃত্যুভয়ও তাঁকে কুণ্ঠিত করতে পারেনি। জেল-জুলুম নিপীড়নের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাঁকে দমাতে পারেনি। তিনি তো সেই পুরুষ—যিনি কবির ভাষ্যে নদীর সাঁতার পানি থেকে উঠে আসেন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসেন প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়। হৈমন্তিক বিল থেকে উঠে আসেন রঙ-বেরঙের পাখি উড়াতে উড়াতে। কাহাতের পর মই-দেয়া ক্ষেত থেকে ছুটে আসেন ফসলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে।
শেখ মুজিবকে নিয়ে যত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছড়া ও গান ইত্যাদি রচিত হয়েছে—পৃথিবীর আর কোন নেতাকে নিয়ে এত হয়নি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিক তাদের লেখায় বঙ্গঁবন্ধুকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বঙ্গঁবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোতে শুধু ব্যক্তি মুজিবই প্রতিফলিত হয়নি—কোন কোন কবিতা সময়কে অতিক্রম করে বঙ্গঁবন্ধুকে করে তুলেছে কালাতিক্রমী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছেন— ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি/ বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’
অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা তো বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। তিনি তার কবিতায় লিখেছেন— ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা/ গৌরী যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান।’
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করেছেন এভাবে— ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি/ আমি আমার পূর্বপরুষের কথা বলছি/ আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি/ গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি/ আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।’
শামসুর রাহমানের ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে বঙ্গঁবন্ধুর ভূমিকা উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন- ‘ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পতাকার মতো দুলতে থাকে স্বাধীনতা/ ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে মুক্তোযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’
বঙ্গঁবন্ধুকে নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তিনি এই কবিতায় লিখেছেন— ‘কে রোধে তাঁহার বজ্র কণ্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনলেন তাঁর অমর কবিতাখানি/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
মহাদেব সাহা লিখেছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কবিতা ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’? তাতে তিনি বলেছেন— ‘তাই আমার কাছে বার্লিনে যখন একজন ভায়োলিনবাদক/ বাংলাদেশ সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিল/ আমি আমার দুপকেট থেকে ভাঁজ করা একখানি দশ টাকার নোট/ বের করে শেখ মুজিবের ছবি দেখিয়েছিলাম/ বলেছিলাম, দেখো এই বাংলাদেশ।’
এছাড়াও জসীম উদদীন, সুফিয়া কামাল, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, হাসান হাফিজুর রহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবুল হোসেন, রোকনুজ্জামান খান, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, রুবী রহমান, মুহম্মদ নুরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কাজী রোজী, নাসির আহমেদ, অঞ্জনা সাহাসহ অনেক বিখ্যাত কবির কবিতায় বঙ্গঁবন্ধু চিত্রিত হয়েছেন আকাশচুম্বী মহিমা নিয়ে।
বাংলাদেশের মতো সারাবিশ্বের কবিদের কবিতায় বঙ্গঁবন্ধু সমহিমায় উজ্জ্বল। যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি। তাদের বর্বরতা আর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি। সে পাকিস্তানের কবিরাও বঙ্গঁবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। বিখ্যাত ঊর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, আহমদ সালিম, সৈয়দ আশিক শাহকার প্রমুখ কবিদের কবিতায় বঙ্গঁবন্ধু জীবন চরিত্র ফুটে ওঠেছে— ‘এই স্বাধীনতা অনেক মূল্য দিয়ে পাওয়া/ এই মূল্য জীবন দিয়ে শোধ করেছে তোমার সন্তানেরা/ তারাই ছিনিয়ে এনেছে তোমার জন্য এ গৌরব।’
পাকিস্তানের সিন্ধি কবি আরজ বালুচ,কবি আজমল খটক, পাঞ্জাবি কবি হাবিব জাহেলসহ পাকিস্তানের অসংখ্য কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। এভাবে ভারতের অনেক কবিও বঙ্গঁন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে অমিয় চক্রবর্তী, অন্নদাশংকর রায়, কাইফি আজমি, নন্দেশ্বর সিংহ, এ কে শেরাম উল্লেখযোগ্য।
পরিশেষে আমার কবিতাংশ দিয়েই শেষ করছি— ‘কোটি কোটি বাঙালির তপস্যায় জন্মেছিলেন বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’


