করের আওতায় আসছে বিদেশি টিভি চ্যানেল

করের আওতায় আসছে বিদেশি টিভি চ্যানেল

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রায় ১০ কোটি মানুষ টিভি-চ্যানেল দেখে, তবে বেশিরভাগ মানুষ বিদেশি চ্যানেল দেখতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশি চ্যানেল দেশের বাইরে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফি পরিশোধ করতে হয়, কিন্তু বাংলাদেশে বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো তদারকি না থাকায় সেভাবে ফি আদায় হয় না। এছাড়া বিদেশি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন থেকে মূসক আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। সেজন্য আগামী বাজেটে বাংলাদেশে বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারে ন্যূনতম ফি, কর ও ভ্যাট বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

বিদেশে বাংলাদেশি চ্যানেল সম্প্রচারে কী পরিমাণ ফি, কর ও ভ্যাট দিতে হয়, তা জানতে চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি বলছে, ন্যূনতম ফি, কর ও মূসক থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হবে। সম্প্রতি এনবিআরের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) পক্ষ থেকে বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারে ফি নির্ধারণ এবং কর ও ভ্যাট বসানোর সুপারিশ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি এনবিআরের প্রথম সচিব (মূসক নীতি) হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাভদার সই করা একটি চিঠি তথ্য সচিবকে পাঠানো হয়। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চিঠিতে বলা হয়, অ্যাটকো বাংলাদেশে সম্প্রচার করে এমন বিদেশি চ্যানেলের ওপর করারোপের প্রস্তাব করেছে। এ প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে বিদেশে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো কী পরিমাণ চার্জ বা ফি প্রদান করে তা জানা প্রয়োজন। সেজন্য বছরে কত কোটি টাকা বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো বিদেশে ফি হিসেবে দেয়, তা এনবিআরকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী এনবিআর বাংলাদেশে সম্প্রচার স্বত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি চ্যানেলের ওপর নূন্যতম ফি নির্ধারণ করবে।

এর আগে ১২ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী এনবিআরকে চিঠি দেন। তাতে বলা হয়, ভারতে বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলকে প্রচার করার সুযোগ পেতে একটা মোটা ফি দিতে হয়। এ ফিস কী পরিমাণ তা এনবিআরকে জানতে হবে। এছাড়া ভারতীয় চ্যানেলগুলো অতি সামান্য ফি দিয়ে বাংলাদেশে সম্প্রচার করে। বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল ভারতে সম্প্রচারের জন্য যে ফি দেয় তা থেকে কোনো মতেই কম হবে না। এ ফি-সহ বিদেশি চ্যানেল থেকে কীভাবে রাজস্ব আদায় করা যায়, তার তথ্য দিতে বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

অ্যাটকোর প্রস্তাবনায় বলা হয়, দেশে প্রায় পাঁচ কোটি টিভি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিলে প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারের আদায় হওয়ার কথা। এই টাকার একটি বড় অংশ বিদেশি চ্যানেলগুলোর কাছ থেকে আসার কথা। কিন্তু সরকার তা পায় না। বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য বছরে মাত্র দেড় লাখ টাকা প্রদান করা হয়। ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা দিতে হয়। এছাড়া প্রতিটি অতিরিক্ত চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য আড়াই কোটি রুপি ন্যূনতম নেট মূল্য থাকতে হয়। প্রতি মাসে দেশীয় টিভি চ্যানেলের কাছ থেকে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় হয়। কিন্তু বিদেশি টিভি চ্যানেলের কাছ থেকে ভ্যাট বাবদ কোনো অর্থ আদায় হয় না। এছাড়া বিজ্ঞাপনের টাকা বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথে ১০ গুণ বেশি পাচার হচ্ছে। বিদেশি কোনো চ্যানেল বাংলাদেশে ডাউনলিংক করতে পাঁচ কোটি টাকা এককালীন ফি ও প্রতিবছর আড়াই কোটি টাকা নবায়ন ফি করার প্রস্তাব করা হয়।

অ্যাটকোর সহ-সভাপতি মোজাম্মেল বাবু বলেন, আমাদের দেশে বিদেশি চ্যানেল প্রচারে কোন ধরনের ফি দিতে হয় না। আমাদের চ্যানেল অন্য দেশে প্রচার করলেই সংশ্লিষ্ট দেশকে ল্যান্ডিং, ক্যারেজ ফিসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা দিতে হয়। বিজ্ঞান, শিক্ষা ও নিউজ-সংক্রান্ত চ্যানেল বাদে সব চ্যানেলের ফি পাঁচ কোটি করার সুপারিশ করে তিনি বলেন, প্রায় শতাধিক চ্যানেল রয়েছে যা থেকে সরকার এ ফি আদায় করতে পারবে। ফ্রি ডাউনলোডের আড়ালে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন চলে যায়। এ টাকা পাচার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বিজ্ঞাপনের ওপর মূসক আরোপসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দেশে বিদেশি চ্যানেলগুলোর দাপট বেশি। এসব চ্যানেলের প্রভাবে দেশি চ্যানেল বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছে। এটাকে একটা নিয়মে আনা জরুরি। এদের দাপট কমাতে কেব্ল অপারেটরদের সম্পর্কে জানতে চেয়ে বিষয়টি রাজস্ব কর্মকর্তাদের নজরে আনার পরামর্শ দেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল অনেক কম খরচে দেখা যায়। আর বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে অনেক দাম দিয়ে দেখতে হয়। এটা কোটি আর লাখের মতো। আগামী বাজেটে এটি সমান করা হবে। বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো যাতে ভারতে দেখা যায়, সেজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চেষ্টা করা হবে। আগামী অর্থবছরই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে দেখা যায় এমন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা ২৭২টির বেশি। টিভি চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ১২ লাখ। দর্শকদের মধ্যে ২৯ দশমিক দুই শূন্য শতাংশ বাংলাদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠান, ১৮ দশমিক সাত চার শতাংশ হিন্দি চ্যানেল, সাত দশমিক পাঁচ দুই শতাংশ ভারতীয় বাংলা, চার দশমিক পাঁচ চার শতাংশ ইংরেজি চ্যানেল ও বাকি ৪০ শতাংশ অন্যান্য চ্যানেল দেখে। বাংলাদেশের টিভি দর্শকরা ১০০ মিনিটের মধ্যে ৭০ মিনিটই দেশের বাইরের চ্যানেল দেখে।

সূত্র আরও জানায়, ২০১৪ সালে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণে দুটি সুপারিশ করে তথ্য, বাণিজ্য ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসিকে চিঠি দেন। তাতে ভারতের চ্যানেল বাংলাদেশে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফি ২০ কোটি টাকা আদায় ও বাংলাদেশে প্রচারিত ৪০টি চ্যানেলের পর ভারতের টিভি চ্যানেল রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। প্রস্তাবটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *