কোরআনের কণ্ঠস্বর যুবায়ের আহমাদ আনসারী | মাওলানা আমিনুল ইসলাম
আমার দেখা ওয়াজের ময়দানের শীর্ষ একজন ওয়ায়েজ ছিলেন যুবায়ের আহমাদ আনসারী সাহেব। ঐ রকম প্রতিভাবান আলেম এবং ওয়ায়েজের দেখা এই বাংলাদেশের জমিনে পাওয়া যাবে কিনা আমার জানা নেই।
যেরকম তাফসীরের জ্ঞান, বর্ননা শৈলী, উপস্হাপনা আবার সেই সাথে মনমুগদ্ধকর সুর। বর্তমানের ময়দানের গতানুগতিক বক্তাদের মত মুখস্হ বিদ্যা নিয়ে তিনি কখনো ওয়াজ করেননি। গভীর লেখা-পড়া করেই ওয়াজের ষ্টেজে শ্রোতাদের মাঝে তিনি হাজির হতেন।
কোন আজগুবি কেচ্ছা কাহিনী বর্ণনাকারী ছিলেন না আনসারী সাহেব। কোরআন হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের উপর তাঁর হৃদয় ছোঁয়া বয়ান ছিল। তাঁর কোরআন তেলাওয়াত যেন মন কেড়ে নিত।
ইউটিউব চ্যানেল বা মোবাইলে ওয়াজ ছেড়ে তিনি জনতার মন কাড়েন নি। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, মাঠে-ময়দানে তাফসীর করে মানুষের ভালবাসা কুড়িয়ে ছিলেন আনসারী সাহেব। সু মিষ্ট ভাষীতা আর উপস্হাপনা মানুষকে পাগল করে নিয়েছিল।
এক সময় ওয়াজের ময়দানে স্রোতাদের হার্ট কাঁপানো ব্যক্তি তিনি। একচেটিয়া ভাবে ময়দানে তাঁর আধিপত্য ছিল। আহলে হক ওলামায়ে কেরামের নয়নমণি ছিলেন তিনি।
সর্ব প্রথম যুবায়ের আহমাদ আনসারীর দেখা মিলেছিল, ঢাকার বসুন্ধরাতে। তখন ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.) জীবিত। আন্তর্জাতিক ইসলামী মহা সন্মেলন সংস্হার মিটিংএ তিনি হাজির ছিলেন। একদম নিরহংকার মানুষ। সদালাপী। হাসি খুশীতে ভরা।
এরপর আনসারী সাহেবের বয়ান শুনলাম আমাদের ফরিদপুরের আন্তর্জাতিক ইসলামী মহা সন্মেলনে। যেখানে পাকিস্তান থেকে আগত আব্দুল মজিদ নদীম ( রহ) তাশরীফ এনে ছিলেন। আরো ছিলেন আন্তর্জাতিক সন্মেলন সংস্হার সভাপতি মুফতী আব্দুর রহমান সাহেব।
যুবায়ের আহমাদ আনসারীর বয়ানে সেদিন ফরিদপুরবাসী মেতে উঠেছিল। কি এক অসাধারণ উপস্হাপনা। কোকিল কন্ঠস্বর। পাগল করা কোরআনের তেলাওয়াতে মুগদ্ধ হয়েছিল সবাই।
আন্তর্জাতিক সন্মেলন সংস্হার অধিনে দেশ ব্যাপি যত প্রোগ্রাম হয়েছিল, সকল প্রোগ্রামের মধ্যমণি থাকতেন তিনি। দেশের সব জায়গাতে সুনাম অর্জন করেছিলেন।
আহলে হক ওলামায়ে কেরামের তরজুমান ছিলেন তিনি। ওয়াজের ময়দানে দেওবন্দী আলেমদের মুখপাত্র ছিলেন। কোন অশিক্ষিত মুর্খ ওয়ায়েজ ছিলেন না তিনি বা কোন দলের ক্যানভাসার হিসেবে ময়দান গরম করেননি। তরজুমানে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত ছিলেন যুবায়ের আনসারী।
ওয়াজের ময়দানে কোন সমালোচনা ছিলনা তাঁর। কোন মানুষ তাঁকে নিয়ে কোন কটু বাক্য ব্যবহার করতে দেখিনি। হাল জমানায় বক্তাদের নিয়ে কত ধরনের মন্তব্য পাবলিকের। কিন্তু এ ব্যাপারে যুবায়ের আনসারী সাহেব নিরাপদ। কেননা, তাঁর চাল-চলন, বয়ান -বক্তৃতা মার্জিত ছিল। লেন-দেন, কথা-বার্তা মাপমত ছিল।
মোট কথা, একজন বে-মেছাল ওয়ায়েজ ছিলেন আনসারী সাহেব। যেমন আলেম, তেমন তিনি একজন সাড়া জাগানো ওয়ায়েজ। তাঁর তুলনা আর হয়না।
বিদায় নিলেন তিনি। ওয়াজের ময়দানে ইতি টানলেন। দীর্ঘদিন অসুস্হ ছিলেন। এর আগেও কয়েকবার খবর এসেছিল তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তবে সে খবর সঠিক ছিলনা। তবে এবার আর বেঠিক নয়। সত্যি তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।
সেই মহান আলেমের জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে সুুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


