খাদ্য নিরাপত্তায় পুষ্টিমান

খাদ্য নিরাপত্তায় পুষ্টিমান

হালচাল। জিনাত আরা আহমেদ

খাদ্য নিরাপত্তায় পুষ্টিমান

স্বাস্থ্যের সাথে পুষ্টি যেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তেমনি পুষ্টির সাথে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নও অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনমুখী ও কর্মক্ষম জীবন যাপনের জন্য নিরাপদ তথা পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে সেটাই খাদ্য নিরাপত্তা। তবে সেক্ষেত্রে শুধু সরবরাহ থাকলেই হবে না, সচেতনতাও থাকতে হবে। মূলত খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও খাদ্য তৈরির প্রতিটি ধাপে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

সুস্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে ইজিডিপিতে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সূচকের হ্রাসবৃদ্ধি হয়ে থাকে। কারণ পরিবার হিসেবে রোগব্যধিতে যখন চিকিৎসাব্যয় বেড়ে যায় তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। আর এক্ষেত্রে পরিবারে নারী ও শিশুদের যদি পুষ্টির অভাব থাকে সেটা বড়ো ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। একটা শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের সময় হলো ৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এ সময়ে যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার না দেয়া হয় তবে পুষ্টি ঘাটতির ফলে তারা কম মেধা নিয়ে বেড়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে আমাদের পরিবার এবং জাতীয় পর্যায়ে তার অবদান রাখার ক্ষমতা কমে যায়।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, দেশের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ এবং ৭৫ ভাগ মহিলা আয়রন স্বল্পতায় ভুগছে। সঠিক পুষ্টিজ্ঞানের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অসংখ্য মানুষ। পুষ্টিহীনতার কারণ যদি খুঁজে দেখি তাহলে সমস্যাটা হল আমাদের খাদ্যগ্রহণ অভ্যাসের সাথে আছে আমাদের পুষ্টি সচেতনতার অভাব।

এবার জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল “খাদ্যের কথা ভাবলে পুষ্টির কথা ভাবুন”। এছাড়া টেকসই উন্নয়নের দ্বিতীয় লক্ষ্যমাত্রায় শিশুদের জন্য সারাবছর নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। এতে রয়েছে ২০২৫ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সের শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের অন্তরায় দূর করার লক্ষ্যমাত্রা। এ সব কিছুর লক্ষ্য হল বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েদের, গর্ভবতী মায়েদের, দুগ্ধদানকারী মায়েদের এবং সকল বয়স্ক মানুষের পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে সঠিকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে সকল প্রকার অপুষ্টি দূরকরা।

খাদ্যে যথাযথ পুষ্টিমান বজায় থাকলে তা নিরাপদ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কৃষিতে বিপ্লব ঘটেছে। বিভিন্ন ধরনের ফল-শাক সবজি সারাবছরই বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু এই শাকসবজি ও ফল কতটা স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ তার ওপর নির্ভর করে সুস্থ থাকা। আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাবার ভেজালের কারণে হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। মাছ, মাংস, ফলে নানা রকম রাসায়নিক ও ফরমালিনের বিষাক্ত অপদ্রব্যে সৃষ্টি হচ্ছে প্রাণঘাতী রোগ। চাল ও মুড়িতে ইউরিয়া, ভাজা খাবারে লুব্রিকেন্ট, বিস্কুট, আইসক্রিম ও নুডুলসে টেক্সটাইল ও লিকার রং, গুঁড়া মসলায় ভূষি, ইটের গুঁড়া এসব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের অনেকেই বাচ্চারা পছন্দ করে বলে ওদের নুডুলস, চিপস-কিংবা বাজারের জুস কিনে খাওয়াই। কিন্তু বুঝিনা যে এতে খাদ্যমান নেই বললেই চলে। বরং এসব খাবারে শিশুর ক্ষুধা কমে যায়। এসবের প্রতিক্রিয়ায় ওরা ক্ষীণকায় কিংবা অস্বাভাবিকভাবে মুটিয়ে যেতে পারে। আজকাল কিশোর-কিশোরীদের মাঝে ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এ প্রবণতা চলতে থাকলে তা শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আজকের কিশোরী আগামী দিনের মা। শরীরে প্রয়োজনীয় আয়রন এবং ক্যালসিয়ামের মাধ্যমে কিশোরীদের হাঁড় মজবুত হয় এবং উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। মায়ের সুস¦াস্থ্য অর্থাৎ শারীরিক পুষ্টিমানের ওপরই গড়ে ওঠে শিশুর সুষম বিকাশ। তাই মা অর্থাৎ নারীর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। মায়ের শরীরের ভিটামিন, খনিজ লবণ শিশুর মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে। এছাড়া শর্করা, আমিষ, ¯েœহ জাতীয় খাবার শরীরের বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মূল্যবান ভূমিকা রাখে।

সারাজীবন সুস্থথাকার বিষয়টা নির্ভর করে শিশু বয়সে পুষ্টির ওপর। এ সময় হাঁড়ের গঠন দেহের উচ্চতার ওপরও প্রভাব ফেলে। পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম খাবার শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মাধ্যমে শিশুর মেধাবিকাশও তরান্বিত হয়। কিন্তু এসব বিষয়কে বিবেচনায় না রেখে আমরা রসনা তৃপ্তিকারী বিভিন্ন্ কেনা খাবার যখন শিশুকে দেই তাতে এক পর্যায়ে ওদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়, যা থেকে স্বাভাবিক খাবারে অভ্যস্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পরিবারের কথা ভেবে বিশেষত শিশুর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এমনভাবে খাদ্য নির্বাচন করতে হবে যাতে খাবার ভেজালমুক্ত হয় এবং যথাযথ পুষ্টিমানসমৃদ্ধ হয়। শৈশব থেকেই যদি ঘরে তৈরি খাবারে অভ্যস্থ করে তোলা হয় তাহলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যেমন যথাযথ হয় তেমনি রোগব্যধি থেকেও নিরাপদ থাকা যায়।

কৈশোরে ডাল এবং বাদাম জাতীয় খাবার বেশি দিতে হবে। এতে মেধাবিকাশ হয় ও অস্থিসন্ধি মজবুত হয় যা শিশুদের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ঘরের বাইরে হোটেল রেস্তোরায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাইরে তেলে ভাজা খাবার একেবারেই বাদ দিতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন নাস্তা ঘরে তৈরি করে দিতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন চাল, ডাল, আলু, সবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি খাবার অভ্যাস করতে হবে। পরিবারে সবার পুষ্টি জোগাতে এ ধরনের সুষম খাবারের তুলনা নেই। দুধ-ডিম নিয়মিত থাকা চাই। বিভিন্ন ধরনের শাক এক সাথে রান্না করে খাওয়ালে সব ভিটামিন একসাথে পাওয়া যায়। খাদ্যতালিকা করে শৈশব থেকে যত্ন নিলে পরিবারিক সুস্থতা এবং সবার মাঝে সচেতনতাবোধ গড়ে তোলা যায়।

বর্তমান সরকারের সময়োচিত সঠিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিবছর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়। সেইসাথে মানুষের মধ্যে পুষ্টিসচেতনতা বৃদ্ধিসহ পুষ্টি সমৃদ্ধ সুষম খাদ্যগ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে সরকার বহুমূখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বারটান) কার্যক্রম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে কৃষিজাত শস্য ও ফল। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্প, মুজিবনগর সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, বছরব্যাপি ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, ইন্টেগ্রেটেড এগ্রিকালচার প্রডাক্টিভিটি প্রকল্প, সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প ইত্যাদি। তবে জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা তথা খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকারি উদ্যোগের সাথে সাথে জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি খাদ্য প্রস্তুত ও খাবার সংরক্ষণে আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *