শীলনবাংলা রিপোর্ট ● বছরের শেষে এসে বিএনপি নেতাদের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা। বেগম জিয়ার দুর্নীতির দুটি মামলা বিচারের শেষপর্যায়ে, এখন রায় হওয়ার পালা। এ মামলা দুটির রায় কী হবে—তা-ই এখন দলটির আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। মামলা দুটিতে সাজা হতে পারে খালেদার-এমন শঙ্কা নিয়েই বছর শেষ করতে যাচ্ছে বিএনপি। এছাড়া বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে রাজপথে বিএনপির কিছুটা সরব উপস্থিতি নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুললেও খালেদার পরিণতি কী হবেÑতা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়া আগামী নির্বাচনে দলের অবস্থান কী হবে, ঘুরেফিরে এ সবই ছিল বিএনপির আলোচনার অন্যতম বিষয়। এর বাইরে কয়েক দফা খালেদার পরোয়ানা ও সড়কপথে কক্সবাজার যাত্রা, সোহরাওয়ার্দীতে জনসভা ও লন্ডন সফর নিয়ে সরব ছিল বিএনপির রাজনীতি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জানান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দুদকের করা মামলা। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হত্যা, নাশকতা ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়াসহ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ। তিনি জানান, খালেদার বিরুদ্ধে সব মামলাই এখন বিচারাধীন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলাগুলোর মধ্যে চারটি সেনাসমর্থিত ২০০৭ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা। বাকি দুর্নীতির মামলাসহ অন্যগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা। দুদকের করা মামলাগুলো হলো—জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলা ও নাইকো দুর্নীতি মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় দুটি, খুলনা সদর থানায় একটি এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি মামলা উল্লেখযোগ্য। তবে গুলশান, কুমিল্লা ও খুলনার মামলাগুলো তদন্তাধীন। যাত্রাবাড়ী থানার মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে চারটি পিটিশন মামলা রয়েছে। এসব মামলাও তদন্তাধীন আছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে বিচারকার্য শেষপর্যায়ে আছে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে বছরের অধিকাংশ সময় আদালতে যাতায়াতের মধ্যেই ব্যস্ত ছিলেন চেয়ারপারসন। এ দুটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। অন্যদিকে দুদকের আইজীবীরা সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন। কিন্তু খালেদার পক্ষে আইনজীবীরা বলছেন, মামলা দুটির কোনো ভিত্তি নেই। এগুলো খালেদার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য করা হয়েছে। খালেদার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুুর রেজ্জাক খান বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় যত ডকুমেন্ট এসেছে তার সবই ‘ওভাররাইটিং-ঘষামাজা’। সব সাক্ষীই বলেছেন, তারা জানে না এগুলো (ওভাররাইটিং-ঘষামাজা) কে করেছে। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার একটি রাজনৈতিক জীবন রয়েছে। সেখানে কলঙ্ক দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা অপপ্রয়াস মাত্র, এটা কোনোদিনই সফল হবে না। সার্বিকভাবে এটি একটি যুক্তিহীন মামলা।
চলতি বছর বিএনপির রাজনীতিতে অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়েছিল খালেদার লন্ডন সফর। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পায়ের গোড়ালি ও চোখের চিকিৎসা করাতে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সফরে লন্ডন গিয়েছিলেন বিএনপিপ্রধান। লন্ডনে তিনি তার বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করেন প্রায় তিন মাস। খালেদার এ সফর নিয়ে বিএনপিতে ব্যাপক উৎসাহের জন্ম দেয়। তারা আশা করেছিলেন, খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পরই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি সেই রূপরেখা এখনো দেয়নি। তা ছাড়া লন্ডন থেকে আসার পরপরই সারা দেশের কমিটি ঘোষণা ও স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণ করার কথা ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কার্যত কোনো ফল দেখা যায়নি। তবে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন পর মা ও ছেলের সাক্ষাতে দলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন চেয়ারপারসন। যেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবেন খালেদা জিয়া। শোনা যায়, এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে বিএনপির প্রার্থিতার বিষয়টি।
খালেদা লন্ডন অবস্থান করে জামায়াত, পাকিস্তানের আইএসআই-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালীদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং-সিটিং করেছেন বলে সরকারে বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তাই সরকার লন্ডনে খালেদার গতিবিধির ওপর কড়া নজরের কথাও জানায়। সরকার এমন প্রচারণায় তীব্র প্রতিবাদও জানায় বিএনপি। সে সময় বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন, খালেদার লন্ডন সফর নিয়ে সরকার নানা কল্পকাহিনি প্রচার করছে। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে কোনো আইএসআই বা জামায়াত নেতার সাক্ষাৎ হয়নি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং দুরভিসন্ধিমূলক একটি চক্রান্ত। সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ জনগণের আশু দাবিগুলো পাশ কাটানোর জন্যই এ ধরনের কল্পকাহিনির প্রচার করা হচ্ছে।’
খালেদার লন্ডন সফরের পর ঢাকায় ফেরার পথে রাজধানীর বিমানবন্দরের ‘শো-ডাউন’ ছিল চলতি বছরে বিএনপির বড় গণজমায়েত। আদালতের হুলিয়া মাথায় নিয়ে দেশের ফেরার সময় অনেকের ধারণা ছিল, বিমানবন্দর থেকে আটক হতে পারেন খালেদা। এমন চিন্তা থেকেই বিএনপিও বিমানবন্দর সড়কে বছরের সবচেয়ে বড় জমায়েত ঘটায়। লন্ডন থেকে ফেরার পরই বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মোড় নিতে থাকে। এরপর ৭ নভেম্বরকে উদ্দেশ্য করে চলতি বছরে আরো একটি বড় জনসভার আয়োজন করে। অপরদিকে, খালেদা জিয়ার লন্ডন থাকা অবস্থায় মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জাতিগত নিধনের মুখে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেও সড়কপথে কক্সবাজারের উখিয়ায় যান। সে সময় ঢাকা থেকে কক্সবাজারের পথে পথে নেতাকর্মীদের বিশাল গণজমায়েতও বিএনপিকে ব্যাপক উজ্জীবিত করে।
কিন্তু সড়কপথে যাওয়া ও আসার সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দলের মহাসচিবের ওপর কক্সবাজার যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের আক্রমণও দেশব্যাপী সমালোচনার বিষয় ছিল। এছাড়া ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় প্রধান বিচারপতির রায়কে যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। আইন অঙ্গনে বছরের সেরা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করেছিল বিএনপি। কিন্তু সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে সেটির ফলও ঘরে তুলতে পারেনি দলটি।
এ ছাড়া গত বছরকে বিএনপি সাংগঠনিক বছর ঘোষণা করলেও তৃণমূল কমিটির সব কাজ শেষ করতে পারেনি। সংগঠন তৎপর না করতে পারার সেই ব্যর্থতা নিয়ে চলতি বছরকেও সংগঠন গোছানোর বছর বলেছিল বিএনপি। সারা দেশের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলাকে ঢেলে সাজাতে এ বছরও ব্যর্থ হয়েছে দলটি। তবে, বিএনপি সূত্র জানায়, এখন মাত্র ৩০টি জেলার কাজ বাকি আছে। তবে, ১৮টি জেলার কাজ প্রায় ঘোষণায় বাকি। এ ছাড়া বিএনপির সহযোগী ও অঙ্গ দলগুলোর কমিটি গঠনের কাজও চরমভাবে ব্যর্থ হয়। অভিযোগ আছে, দলগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। দলের একটি পক্ষ বলছে সংগঠন সংগঠন করেও, বিএনপি শক্তিশালী হতে পারেনি। আর এমন ব্যর্থতা ক্রমাগত চলতে থাকলে রাজপথে থেকে দাবি আদায় বিএনপির জন্য সদূরপরাহত।


