নিজস্ব প্রতিবেদক : বছর শেষে নিজ শহরে জয়ের মাধ্যমে কদর বেড়েছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। সারা বছর নানা বিষয়ে মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকলেও শেষটা ভালোভাবেই কেটেছে তার। বছরের অধিকাংশ সময় একদিকে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন; অন্যদিকে সেই সরকারের যাবতীয় কাজের সহায়ক হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি জোটে কদর বাড়াতে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে যেমন কাজ করেছেন, আবার অন্য পক্ষকে খুশি রাখতে সরকারের কমবেশি সমালোচনাও করেছেন। এমন দ্বিমুখী চরিত্রে সফল অভিনয় করে এরশাদ এখন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন। বছরজুড়ে বিএনপি এরশাদের সমালোচনা করে গেলেও সম্প্রতি রংপুর বিজয়ের পর সেই কদরটা আরো একধাপ বাড়ল দেশের জোট রাজনীতির অঙ্গনে।
চলতি বছরের অধিকাংশ সময় বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার চেষ্টা করেও নিজেকে আওয়ামী লীগের থেকে আলাদা প্রমাণ করতে পারেননি এরশাদ। সরকারে থাকা জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের বের করে আনার চেষ্টাও করেন। কার্যত স্ত্রী রওশন এরাশাদের বিরোধিতায় বেশিদূর এগোতে পারেননি তিনি। সরকারের সুবিধাভোগী নেতারা জাতীয় পার্টিকে যেমন সরকার থেকে বের হতে দেননি, আবার এরশাদ নিজেও দল ভাঙার ভয়ে এমন সিন্ধান্ত নিয়ে বেশিদূর যেতেও চাননি। নিজ দল এবং জাতীয় রাজনীতিতে এমন ‘দ্বিমুখী খেলা’ খেললেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন রংপুর বিজয়ে। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীকে লক্ষাধিক ভোটে পরাজিত করে রীতিমতো চমক দেখিছেন তিনি। সেই চমকের পর এখন এরশাদের কদর বেড়েছে বহুগুণ। তাই আত্মবিশ্বাসী এরশাদ এখন বড় বেশি ফুরফুরে মেজাজে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে এরাশাদ বলেন, জাতীয় পার্টি বর্তমানে কতটা শক্তিশালী রংপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। আগামী দিনের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি যে বড় ফ্যাক্টর তা প্রমাণিত হয়েছে। জাতীয় পার্টিকে উপেক্ষা করার শক্তি কারো নেই।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে আগামীতে বিএনপির জোট করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এরশাদের শেষ কথা শোনার সময় এখনো আসেনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি বড় ফ্যাক্টর। দুই প্রধান দলের যেটিই ক্ষমতায় যেতে চায়, সেই দলের জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বড় ব্যবধানের জয়ে উজ্জীবিত জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের আশা, এ জয়ের প্রভাব পড়বে জাতীয় নির্বাচনেও। এই জয় রাজনীতির পুরোনো হিসাব-নিকাশও বদলে দেবে। ইতোমধ্যে এর আলামতও শুরু হয়ে গেছে।
দলটির নেতাকর্মীদের মতে, বছরের শেষ ভাগে এসে জাতীয় পার্টির সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। আর এমন ভাবনা থেকেই পিরোজপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। সংসদ সদস্যও হন জাতীয় পার্টি থেকে। পরে যোগ দেন বিএনপিতে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হন ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী। আগামী নির্বাচনের আগেই তিনি ফিরে এলেন জাতীয় পার্টিতে।
সূত্র জানায়, সাবেক এবং বর্তমান আরো একাধিক সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী নেতা জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি ছেড়ে গেছেন এ রকম অনেকেই দলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে আপাতত জাতীয় পার্টির লক্ষ্যÑরংপুর সিটি করপোরশেন নির্বাচনে যে জয়ের ধারা সূচিত হয়েছে, তা ধরে রাখা। এর অংশ হিসেবে গাইবান্ধা-১ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনের ফলাফলও নিজেদের ঘরে আনার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামার কথা ভাবছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীও চূড়ান্ত করে রেখেছে জাতীয় পার্টি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘ ২৭ বছর ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দেশ শাসন করে আসছে, যার কারণে ডাক্তার, আইনজীবী, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এই দুই বলয়ের মাঝখানে এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি একাধিকবার নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে নব্বইয়ের পর থেকে মুক্তভাবে রাজনীতি করতে পারেননি এরশাদ, যা বিভিন্ন বক্তব্যে এরশাদ নিজেও স্বীকার করেছেন।
জানা যায়, জাতীয় পার্টি বরাবরই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটা বড় ফ্যাক্টর। জাপা নেতাকর্মীরা বলছেন, ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত মিলে জোট গঠিত হয়। ভুল বোঝাবুঝির কারণে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এরশাদ ওই জোট ত্যাগ করে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেন।
জোটের রাজনীতির সুফল বুঝতে পেরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করে এবং সরকার গঠনে সক্ষম হয়। একইভাবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত বর্জন করলেও জাতীয় পার্টি অংশ নেওয়ার কারণে তা বৈধতা পায়।
এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ফলে আলোচনার সামনে চলে এসেছেন এরশাদ। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে পাশে পেতে চাচ্ছে। বিএনপি থেকেও দেওয়া হচ্ছে নানা টোপ। আর এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থানে যেতে পেরে এরশাদও খুশি।


