পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করপোরেট কর নিয়ে ব্যবসায়িদের ঘুম হারাম। তারা বরাবরই দাবি জানিয়ে আসছেন আসন্ন বাজেটে করপোরেট করহার কমানো হোক। তাদের দাবির যৌক্তিকতা আছে। এ কথা সত্য, বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে আমাদের করপোরেট করহার বেশি। ভারত ও চীন করপোরেট করহার কমিয়ে আনছে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। তবে করপোরেট কর কমালে বেশি বেশি বিনিয়োগ হবে, এমনটাও নিশ্চিত নয়। কারণ বিনিয়োগ করার জন্য ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকতে হবে, টেকনোলজি থাকতে হবে, দক্ষ জনবল থাকতে হবে, বাজার থাকতে হবে, সর্বোপরি উদ্যোগ থাকতে হবে।
আবার করহার কমালেই কর আদায় বেশি হবে, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ বলেছেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ শুধু করহারের ওপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে অনেক চলকের ওপর। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অবকাঠামো, আইনি কাঠামো ও দুর্নীতি। দেশে অবকাঠামো সমস্যার সমাধান হচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক, বন্দর ইত্যাদি সমস্যার মোটামুটি সমাধান হতে আরো কয়েক বছর লাগবে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা সহায়ক কর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এতে তারা আরো ভরসা পাবেন নতুন নতুন বিনিয়োগে এবং এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে। সরকারের উচিত কর প্রদানকারীদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি না করে যারা কর ফাঁকি দেন, তাদের করের আওতায় আনা। যৌক্তিক করপোরেট করহার বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। উপরন্তু, উচ্চ করহার বিনিয়োগকারীদের কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বাড়ায়। সরকারের রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য আনা গেলে দেশের অর্থনীতিই উপকৃত হবে।
শুধু করপোরেট করহার কমানোই নয়, আরো অনেকভাবে বিনিয়োগকে উৎসাহ দেয়া যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কর অবকাশ এবং দ্রুতগতিতে মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর অবচয় ভাতা দেয়া। আমাদের কর আইনে এ দুটি ব্যবস্থা রয়েছে, তা পুনর্বিন্যাসের সুযোগও আছে যথেষ্ট। যেসব শিল্প স্থাপন জরুরি, যেমন খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া, পাট, কুটির ও হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদিতে এ সুবিধা বাড়ানো যায়।
গবেষণা উৎসাহিত করে কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে গবেষণা কাজে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত দেয়া যায়। আমাদের প্রচুর পরিমাণে ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, বাস, ট্রাক, গাড়ি আমদানি করতে হয়। এসব শিল্প টার্গেট করে এ সুবিধাগুলো আরো বাড়িয়ে দিলে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। করপোরেট কর কমানো নয়; আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি কমিয়ে কর অবকাশসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে শিল্পায়ন ও সেবা খাতকে ত্বরান্বিত করতে হবে। কর্মসংস্থানমুখী করপোরেট করের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যাংকের করপোরেট করহার কমানো হয়েছিল গেলবার। অথচ দরকার ছিল কর্মসংস্থানমুখী করপোরেট কর কমানোর। অবশ্য এতে ব্যাংক মালিকরা লাভবান হয়েছেন, অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। এ উদ্যোগ দেশে কর্মসংস্থান তৈরি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখেনি। আমরা মনে করি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে করপোরেট করহার কমানো হলে দেশ উপকৃত হবে।


