সফিউল আযম : সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ব্যবস্থা। এতে জনগণকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে থাকে। সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের চুক্তি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড়োবড়ো স্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা নির্মাণ এ পদ্ধতিতে হয়েছে।
বর্তমান সরকারের ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) নামের মডেল ঘোষণা করা হয়। প্রথমবার বরাদ্দ দেওয়া হয় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতি বাজেটেই পিপিপিতে বরাদ্দ বাড়তে থাকে। বর্তমানে এই প্রাইভেট বা পাবলিক পার্টনারশিপ-পিপিপি’র মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। বাংলাদেশে যে এমডিজি অর্জিত হয়েছে, তার পেছনে সরকার এবং সরকার বর্হিভূত ‘অ্যাক্টর’-দের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। এসডিজি অর্জনেও কিন্তু একটা বড়ো ধরনের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একথা অনস্বীকার্য যে, এসডিজির ১৬৯টা লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সরকারের একার পক্ষে করা কঠিন, পার্টনারশিপ লাগবে।
সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমাতে বর্তমান সরকার বিকল্প অর্থায়নে বাজেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্পে বিশেষ জোর দিয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তত ত্রিশ ভাগ পিপিপিতে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার হিসাব মতে, সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১-এর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে দেশের ভৌত অবকাঠামো ও সেবাখাতে প্রতিবছর বিনিয়োগ প্রয়োজন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশর সমান অর্থ। অর্থাৎ প্রতিবছর কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। যেখানে পিপিপির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবছর পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগ হতে হবে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার, যা অবকাঠামো ও সেবাখাতের মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ। এজন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ পিপিপি’র মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কাজে আসবে। পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে পিপিপি আইন, প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন এবং পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালা ২০১৭ প্রণীত হয়েছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের পানি, বিমানবন্দর, মহাসড়ক, মেট্রোরেল, শিক্ষা, হাসপাতাল এবং আবাসনখাতে পিপিপি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত ৮ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। পিপিপি উদ্যোগে অনেক দেশেই কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে। দিন দিন এ উদ্যোগে সফল দেশের সংখ্যা বাড়ছে। তবে যে দেশগুলো সফল হয়েছে তারা যুগোপযোগী পিপিপি মডেল গ্রহণের মাধ্যমে সেই সাফল্য পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামোর ভিত্তিতেই তারা ওই মডেল গ্রহণ করেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে গতিশীল হচ্ছে পিপিপি। এর আওতায় ৪৫টি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ‘নব উদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’ নামে সরকারের এই প্রকল্পে সড়ক, আইসিটি, গৃহায়ণ, নৌ-পরিবহণ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, রেলপথ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটন উন্নয়নসহ মোট ৯টি খাত চিহ্নিত করেছে সরকার। এসব খাতে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। পিপিপিতে আগ্রহ দেখিয়ে বিনিয়োগ করেছে ওরিয়ন গ্রুপ, ট্রপিক্যাল হোমস ও পাওয়ার প্যাকসহ আর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে চীন, জাপান, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভারত এবং কোরিয়ার মতো দেশের উদ্যোক্তারা পিপিপিতে বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিনিয়োগকারীরা যাতে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ পেতে পারেন, সেজন্য বিশেষ কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে পিপিপি প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার বিপরীতে অর্থায়ন, আর্থিক সামর্থ্য ঘাটতির বিপরীতে অর্থায়ন, প্রকল্প কোম্পানিতে ইক্যুইটি ক্রয় বা ঋণের বিপরীতে অর্থায়ন সুবিধা প্রদান, পিপিপি প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কম্পোনেন্ট বাস্তবায়নের বিপরীতে অর্থায়ন, পিপিপি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের বিপরীতে অর্থায়ন এবং মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি প্রদান প্রভৃতি।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার জন্য পিপিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ও প্রতি বাজেটে বরাদ্দের ধারাবাহিকতা থাকলে পিপিপি গতিশীলতা পাবে। পিপিপিতে নেয়া ৪৫ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে রূপকল্প ২১ বাস্তবায়নের পাশাপাশি উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণ করা সম্ভব।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) আরো শক্তিশালী করা দরকার। পিপিপি’র সফলতা নির্ভর করছে এর সফল অর্থায়নের ওপর। এক্ষেত্রে বিদেশি অর্থায়ন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে। সরকার সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একত্রিত করে একটি উইন-উইন (win-win) পরিস্থিতি তৈরি করতে পিপিপি করেছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষণ ও সুশাসন দরকার। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন এ খাতে বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করবে। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে সবচেয়ে কমখরচ হয় পানি ও বিদ্যুতে, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল শ্রমবাজার। এখানে রয়েছে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ, উর্বরভূমি ও পর্যাপ্ত ফসলি জমি। যেখানে বিনিয়োগের একটি বিশাল সম্ভাবনার খাত রয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগকারীদের জন্য রয়েছে ওয়ানস্টপ সুবিধা। শিল্প সহায়ক পরিবেশ রয়েছে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে। এছাড়াও বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ২১০০ সালে ডেলটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার স্বপ্ন অভিযাত্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাই বিনিয়োগের জন্য অবধারিতভাবে বাংলাদেশই হচ্ছে সর্বোত্তম স্থান।


