চলে গেছেন আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম :: পৃথিবীর লাখো লাখো ভক্তকুলকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী। আল্লামা হবিগঞ্জী আজ ৫ জানুয়ারি ২০২০ রোববার অসুস্থবোধ করলে তাকে একজন ডাক্তারসহ হবিগঞ্জ থেকে সিলেটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। শেরপুরে পৌঁছালেই আল্লামা হবিগঞ্জী ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নালিল্লাহি রাজিউন।
নিচে তার জীবনী তুলে ধরা হলো-
নাম : শাইখ আল্লামা তাফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী রহ । তবে তিনি নিজ এলাকায় ‘মুহাদ্দিস সাহেব হুযুর’ নামে ছোট-বড় সকলের নিকট পরিচিত। মাঝারি গড়নের। জ্যোতির্ময় চেহারার অধিকারী। যেন নূরের আভা টিকরে পড়ছে। খুব সহজেই মানুষরে দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। প্রায় আশি বছর বয়স। আল্লাহ পাক হযরতকে দীর্ঘায়ু দান করুন।
পিতা : মাওলানা শাইখ আব্দুন-নূর রহ.(মৃত: ১৯৯৮ইং)
জন্ম : ১৩৫৯হি. মোতাবেক ১৯৩৮ই.।
জন্মস্থান : হবিগঞ্জ শহরের অদূরে ‘কাটাখালী’ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মলাভ করেন। তাঁর পিতা শাইখ আব্দুন-নূর রহ.ছিলেন বিজ্ঞ আলিম ও সমাজ সংস্কারক। শাইখ তাফাজ্জুল হক দা.বা.এর নানা হলেন, আল্লামা আসাদুল্লাহ রহ.। তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির একজন মুজাহিদ ছিলেন। হবিগঞ্জ এলাকার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও সমাজ সংস্কারকও ছিলেন।
পরিবার : শাইখ তাফাজ্জুল হক দা.বা. তাঁর পাঁচ ভাইদের মাঝে তিনিই বড়। তাঁর অন্যান্য ভাইও নিজ নিজ ময়দানে সফল ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
পড়াশোনা : অন্যদের মত তাঁরও পড়াশোনার হাতেখড়ি পিতা-মাতার কাছেই। পিতা শাইখ আব্দুন-নূর রহ. ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলিম ও সফল শিক্ষক। এরপর তিনি হবিগঞ্জের অদূরে রায়ধর গ্রামের ঐতিহাসিক মাদরাসা ‘জামিয়া সা’দিয়্যায়’ ভর্তি হন। সেখানে তিনি তাঁর মামা আল্লামা মুখলিসুর রহমান রহ.(মৃত ১৪২২হি.) এর নিকট আরবী ব্যাকরণ ও আরবিভাষা রপ্ত করেন। তাঁর মামা ছিলেন শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.এর ছাত্র। এ এলাকার এক সময়ের সফল চেয়ারম্যানও ছিলেন। এ কারণে তিনি নিজ এলাকায় ‘চেয়ারম্যান সাহেব’ নামেও পরিচিত। তাঁর নানার মত তাঁর মামাও বড় মুজাহিদ ছিলেন। বাতিলের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। সমাজ সংস্কারে তাঁরও অসামান্য ভূমিকা রয়েছে।
পড়ালেখার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম গমন : প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া আহলিয়্যা মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা’ চট্টগ্রামে গমন করেন। সেখানে তিনি ফিক্হ, উসূলে ফিক্হ, তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীস ও উসূলে হাদীস, মানতেক-ফালসাফাসহ ইসলামের বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেন। এখানে তিনি মুফতী আযম মুফতী ফায়যুল্লাহ রহ. এর বিশেষ সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। ছাত্র হিসাবে তিনি প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। উস্তাযদের প্রিয় পাত্র ছিলেন। ছাত্র যামানায় সর্বদা পড়াশোনাকে প্রাধান্য দিতেন। সময় নষ্ট করা থেকে সযত্নে থাকতেন। ক্লাসের বাইরে লাইব্রেরীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অধ্যয়নে মগ্ন থাকতেন।
অবশেষে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে ১৯৬০-৬১ইং সনে ‘দাওরায়ে হাদীস’ সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান গমন : জ্ঞান আহরণের সুতীব্র আকাঙ্খায় কিশোর তাফাজ্জুল ছুটে এসেছেন বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সবশেষ পাড়ি জমিয়েছেন তৎকালীন সূদুর পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে ঐতিহাসিক ইসলামী বিদ্যাপিঠ ‘জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর’-এ আরো গভীরভাবে হাদীস অধ্যয়নের জন্য দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদীস ক্লাসে ভর্তি হন। সময়টা ছিল-৬১-৬২ ঈসায়ী।
লাহোরে থাকাকালীন তিনি ‘খানকায়ে রায়পুরের’ (সাহারানপুর) প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ও আল্লাহর ওলী শাইখ আব্দুল ক্বাদের রায়পুরী রহ. (মৃত. ১৩৮২হি.) এর ইসলাহী মজলিসে উপস্থিত হতেন। তাঁর খানকায় এক সপ্তাহ অবস্থানও করেছেন। তাঁর জানাযায়ও উপস্থিত হয়েছিলেন।
এরপর তিনি খানপুরে গমন করেন। সেখানে উপমহাদেশের বিখ্যাত তাফসীরবিদ ও হাদীস বিশারদ হাফিযুল হাদীস আব্দুল্লাহ দরখাস্তী (মৃত.১৪১৫হি.) রহ.এর নিকট তাফসীরের বিশেষ পাঠ গ্রহণ করেন।
এরপর ‘জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া করাচী’ মাদরাসায় বিশ্ববিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ইউসূফ বিনূরী রহ. (মৃত.১৩৯৭হি.) এর নিকট গমন করেন। তাঁর কাছে তিনি তিনটি বিষয় ও কিতাবের বিশেষ দরস গ্রহণ করেন। যথা-ক.বিষয়: হাদীস শাস্ত্র। কিতাব: সহীহুল বুখারী। খ. বিষয়: শরীয়তের বিধানের বিভিন্ন রহস্য ও ভেদ। কিতাব: হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা। গ.বিষয়: তাফসীরুল কুরআনিল কারীম। এভাবে তিনি পূর্বোক্ত আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তী রহ. ও আল্লামা বিনূরী রহ.এর কাছে দরস গ্রহণের মাধ্যমে তাফসীর শাস্ত্রে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করেন। এখানে তিনি কয়েক মাসের মত ছিলেন।


