জলবায়ু পরিবর্তন; মুখরোচক বুলি বনাম ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

জলবায়ু পরিবর্তন; মুখরোচক বুলি বনাম ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

  • রিয়াজ মুহাম্মাদ

পরিবেশ প্রথম তো এমন ছিল না। মানুষ আগমনের বহু আগ থেকেই রাব্বুল আলামিন তাঁর অপার নেয়ামতে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভরপুর করে রেখেছেন। আকাশ, বাতাস, ভূমি, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত ঘেরা গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালিতে সমৃদ্ধ অপূর্ব সুন্দর পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার পর তাতে মানব জাতিকে প্রেরণ করেছেন। সব মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য সব কিছুই পরিমাণ মতোই সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরুপে সৃষ্টি করেছি (সুরা কমার আয়াতঃ ৪৯)

জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বে আতংকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব দেশ সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল একসময় গাছপালা ও বনাঞ্চলে পূর্ণ ছিল। ব্যাপক হারে গাছ নিধন করে নির্বিচারে বন-জঙ্গল উজাড় করছে মানুষই। সেসব জায়গায় গড়ে উঠছে বিভিন্ন কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে। কার্বনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের প্রভাব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বে আতংকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব দেশ সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর প্রভাব কি হবে সেই বিষয় আলোচনা করা যাক।

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ খুবই ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ হচ্ছে নদী মাতৃক দেশ, এখানে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী। তাছাড়া বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভূমি নিচু এবং সমতল। এখানে ৮০ ভাগ এলাকায় বন্যা হয়। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে যেসব প্রভাব পরবে। সেগুলো হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন-ঘন সাইক্লোন,বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত।

আমরা যদি একটু প্রথমে আলোচনা করি যে, এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রধান ভিক্টিম হয় সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোও হয়। যে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ভিক্টিম হয়।

কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলো কিংবা থার্ড ওয়ার্ল্ড, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হয়। আর ধনী দেশগুলো যে পরিমাণ পরিবেশ দূষণ করে তারা তাদের ভোগবাদী মানসিকতা বা উজির ক্রম স্ফীত করণ এর মধ্য দিয়ে তারা যে সাম্রাজ্য কায়েম করে সেখান থেকে তাদের ফিরে আসার মানসিকতা বা ভোগবাদী কিংবা পুঁজিবাদী মানসিকতা বর্জন করে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ব্যবস্থা ফিরে আসতে নারাজ।

এদের সদিচ্ছার অভাব আছে। এর কারণ হচ্ছে পশ্চিমারা আদর্শগতভাবে বা দার্শনিকভাবে এই বিষয়গুলো যেভাবে ট্রিট করে এর মৌলিক কিছু কমতি আছে। তাদের ধারণা যেটা সবচেয়ে বেশি ডমিন্যান্ট তা হলো প্রকৃতি ও মানুষ।

এই দুয়ের মাঝে কর্তৃত্বের ব্যালেন্স থাকবে। অর্থাৎ, এককভাবে কাউকে কর্তৃত্ব দেওয়া যাবেনা। মানুষ প্রকৃতির ড্রাইভার না। চালকের আসনে মানুষ বসবে না। অর্থাৎ, সকলের অংশীদারিত্ব, সবাই সমান অধিকার পাবে। মানুষের যেভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। প্রকৃতির, প্রাণবৈচিত্রেরও সমান অধিকার আছে। আপাতত এই বয়ানটা খুবই মুখরোচক।

 প্রাথমিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখার উত্তম মতবাদ। আমরা যদি বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখি তাহলে এটার যে অন্তঃসারশূন্য এটা টের পাব। আপনি যদি বলেন সবার অধিকার সমান তাহলে হবে কি কারোর ঘাড়ের উপর আল্টিমেটলি দায় চাপাতে পারবেন না। কাউকে আপনি দায়িত্ব নিতে বলছেন না এবং কাউকে আপনি কর্তৃত্বও দিচ্ছেন না। সেই কারণেই মূলত বিপর্যয়গুলো দেখা দিচ্ছে। আপনি মানুষকে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারছেন না। আপনার এই দর্শন দিয়ে মানুষেকে প্রশ্নের সম্মুখীন জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে পারছেন না।

সেই কারণে মানুষ নিজের ভিতরে অনুভবই করে না যে, প্রকৃতির উপর আমাদের একটা দায়বদ্ধতা আছে। যেরকম মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে।

এখানে মূল বোঝানোর বিষয় হল, আমরা প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে একে অপরের প্রতি সামজিক ভাবে যে দায়বদ্ধতা বা দায়িত্বপরায়ণতা অনুভব করি। অনুরূপভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিসহ অন্য সব কিছুর মধ্যেও যে দায়িত্বপরায়ণতার প্রয়োজন আছে এই বিষয়টাকে আমরা গুরুতর মনেই করি না।

পক্ষান্তরে আমরা যদি দেখি ইসলাম এই বিষয়ে কি পদক্ষেপ নিয়েছে। তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, ইসলাম এই পশ্চিমাদের থেকে আরো বেশী পরিবেশবান্ধব, আরো বেশী প্রকৃতিবান্ধব একটি আদর্শ আমাদের সামনে হাজির করছে।

আল্লাহ তাআ’লা কোরআনে বলেন, আমি আসমান এবং জমিনের উপর এই আমানত তাদের সামনে উপস্থাপন করেছি ফলে তারা এটাকে কবুল করতে অস্বীকার করলো এবং অক্ষমতা প্রকাশ করলো পরিশেষে মানুষ তাকে বহন করলো। (সূরা আহযাব আয়াতঃ৭২)

তাহলে এই যে আমানত এটা কিন্তু একটা ম্যাটাফরিক বিষয় আসমানকে দেওয়া হলো জমিনকে দেওয়া হলো তারা সবাই অস্বীকার করলো কিন্তু এই আমানত বহন করলো মানুষ। এর মানে কিন্তু এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, মানুষের একটা দায়িত্ব আছে। ঘাড়ে একটা আমানত আছে। যে আমানতটা আমাদের পালন করতে হবে। এখন কেউ বলতে পারে এটাতো স্পষ্ট না।

এর চাইতে আরো স্পষ্ট আয়াত কোরআনে রয়েছে যা পরিবেশের উপর আমাদের দায়িত্বকে আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে।

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, জলে এবং স্থলে যত যায়গায় ফেতনা ছড়িয়েছে এই সব কিছু মানুষ তার দুই হাত দ্বারা কামাই করে নিয়েছে।

তখন এই পশুগুলো বলবে, হে আল্লাহ! এরা গুনাহ করেছে আপনি আমাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। এদের কারণে আমরা মরেছি। অতএব, আপনি এখন তাদের শাস্তি দিন। আমি অবোলা পশু হিসেবে আপনার কাছে এর বিচার চাইতে এসেছি।

বিভিন্ন মুফাসসিরগণ এই আয়াতের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন যে, যখন মানুষের গুনাহসমূহ বেড়ে যায়। মানুষ যখন তার দু‘হাত দ্বারা গুনাহ কামাই করে তখন আল্লাহ তাআ’লা এর বিপরীতে তাকে শাস্তি দেন। এই শাস্তি জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে হতে পারে।

আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন। তাঁকে ভয় করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদেরকে কিছু আদেশ করেছেন। কিছু নিষেধ করেছেন। তো দেখা যায়, মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়। এর বিপরীতে সে জুলুমে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মানুষ গুনাহ করে আল্লাহর আযাবকে সে ডেকে নিয়ে আসে।

ইবনে আব্বাস রাঃ এই আয়াতের তাফসিরে বলছেন, যখন মানুষের গুনাহসমূহ বেড়ে যায় তখন আল্লাহ তাআ’লা আশরাফুল মাখলুকাতকে বাঁচানোর জন্য শাস্তি দেন নিরীহ অবলা পশুদেরকে, যারা মানুষের গুনাহের ভারটা বহন করে। তো এটাও কিয়ামতের দিন এই মানুষের জন্য আযাব হিসেবে দাঁড়াবে।

তখন এই পশুগুলো বলবে, হে আল্লাহ! এরা গুনাহ করেছে আপনি আমাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। এদের কারণে আমরা মরেছি। অতএব, আপনি এখন তাদের শাস্তি দিন। আমি অবোলা পশু হিসেবে আপনার কাছে এর বিচার চাইতে এসেছি।

পরিশেষে বলব পশ্চিমারা যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেয়। এবং তারা যে বুলি আওড়ায়, এই বুলি আওড়ানোর মাধ্যমে আর যাই হোক পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো সমাধান হবে না।

এর জন্য অবশ্যই কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। যদি আমাদের একাউন্টিবলি না থাকে তাহলে কোথাও কোন জিনিসের বিধান শৃংখলা সম্ভব না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হচ্ছে যে, ইসলাম পরিবেশ সম্পর্কে পদক্ষেপের যে পথ দেখিয়েছে, অপরাপর পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবেশ সম্পর্কে পদ্ধতি শিখিয়েছে তা অনন্য। এবং ইসলাম যে বলে হককুল্লাহর কথা (আল্লাহর হক) এটাও কিন্তু পরিবেশের সাথেই আছে।

লক্ষ্য করলে পরিলক্ষিত হয় যে, পরিবেশের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা কেনো হবে? কেনো আমি পরিবেশকে বাঁচাতে যাব? আল্লাহর হকটা আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন আমি পালন করছি। এখন এই হককুল্লাহর কনসেপ্ট যদি মিসিং থাকে তাহলে আমার পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা মিসিং থাকবে।

পরিশেষে দেখি যে, পশ্চিমাদের হককুল্লাহ বলতে কোন জিনিস নাই। তাদের কাছে হককুল ইবাদের আইন আছে। মানুষের অধিকার খন্ডন করলে মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করলে আইন আছে। কিন্তু হককুল্লাহর কনসেপ্ট না থাকার কারণে আল্টিমেটলি পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো সমাধান হবে না।

তাই আমাদের একটাই কামনা প্রগতিশীল মানুষিকতার সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্যও উন্নত কর্মধারা শুরু হোক।

লেখক, তরুণ আলেম, শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *