ভুল সংশোধনে নবিজির বুদ্ধিমত্তা

ভুল সংশোধনে নবিজির বুদ্ধিমত্তা

  • সাব্বির জাদিদ

উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ঐশী দায়িত্ব নিয়ে নবিজি পৃথিবীতে এসেছিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এই দায়িত্ব তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছেন। উম্মতের ভুল সংশোধন ছিল তাঁর এই দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তবে ভুল সংশোধন করতে গিয়ে তিনি মাথামোটা মানুষের মতো (নাউজুবিল্লাহ) গোঁয়ার্তুমি করেননি কখনো। তাঁর সারাজীবনের সাধনা ছিল মানুষের হৃদয়ের গভীরতম জায়গায় আলতো করে ভালোবাসার টোকা মারা। যেন সে জেগে উঠতে পারে। যেন সে ফিরে আসতে পারে ভুলের চোরাবালি থেকে। নতুন এই অধ্যায়ে আমরা সাহাবিদের ভুল সংশোধনে নবিজির বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল নিয়ে আলোচনা করব।

এক

সেকালে লোকেরা যখন সফরে বের হতো, সঙ্গে অনিবার্যভাবেই খাদেম রাখত। খাদেম ছাড়া মরুভূমির সফর ছিল অকল্পনীয়। একবার নবিজি সাহাবিদের নিয়ে কোনো এক সফরে বের হলেন। এই সফরে আবু বকর ও উমর (রা.)-ও শরিক ছিলেন। তাঁরা দুজন খাদেম হিসেবে এক ছেলেকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর কাফেলা যখন যাত্রাবিরতি করল, আবু বকর ও উমর তাঁবুর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁদের আশা ছিল, ঘুম ভেঙে প্রস্তুতকৃত খাবার খেয়ে নব উদ্যমে যাত্রা করবেন। কিন্তু ঘুম ভেঙে তাঁরা দেখলেন, তাঁদের খাদেম শুধু রুটি বানিয়েছে। তরকারি প্রস্তুত না করে সে ঘুমিয়ে আছে। খাদেমের ওপর বিরক্ত হলেন দুজনই। বিরক্তি নিয়ে তাঁরা বললেন,

ঘুমকাতুরে ছেলে। তাঁদের বলার ভঙ্গিটা যে গিবতের মতো হয়ে গেল, বিরক্তির কারণে তাঁরা বুঝে উঠতে পারলেন না। তাঁরা খাদেমকে জাগিয়ে তুলে বকাঝকা করে নবিজির তাঁবুতে পাঠালেন। উদ্দেশ্য-খাদেম যেন নবিজির কাছ থেকে উদ্বৃত্ত তরকারি চেয়ে আনে।

বৃত্তান্ত শুনে আবু বকর ও উমর দুজনই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। নবিজি অহেতুক কোনো কথা বলার পাত্র নন। তিনি কীভাবে বললেন, রুটি-তরকারি তাঁরা খেয়ে নিয়েছে!

খাদেম নবিজির তাঁবুর সামনে এসে সালাম দিয়ে বলল, আমার মনিবদ্বয় আপনার কাছে পাঠিয়েছেন তরকারির জন্য।

নবিজি বললেন, তাঁরা তরকারি কী করবে। ইতোমধ্যে তো তাঁরা রুটি-তরকারি খেয়ে নিয়েছে। নবিজির কথার মর্মার্থ ধরতে পারল না খাদেম। এতক্ষণ সে ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের ভেতর কী হয়েছে, সে জানে না। নবিজির উত্তর নিয়ে সে চলে এলো মনিবের তাঁবুতে। বৃত্তান্ত শুনে আবু বকর ও উমর দুজনই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। নবিজি অহেতুক কোনো কথা বলার পাত্র নন। তিনি কীভাবে বললেন, রুটি-তরকারি তাঁরা খেয়ে নিয়েছে!

দুজনই ছুটে গেলেন নবিজির কাছে। বললেন, আমরা তো কিছু খাইনি। তারপরও আপনি কীভাবে বললেন আমরা খেয়েছি?

নবিজি ভর্ৎসনা করে বললেন, তোমাদের ভাইয়ের মাংস দ্বারা তোমরা রুটি খেয়েছ। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের দাঁতে তার মাংসের আঁশ দেখতে পাচ্ছি।

আবু বকর, উমর নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। তাঁরা অনুতপ্ত হলেন। ক্ষমা চাইলেন নবিজির কাছে।

গিবত কতটা ভয়ংকর পাপ, বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই পাপে যখন ফেঁসে গেলেন নবিজির প্রিয় দুই শাগরেদ, স্বভাবতই তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি তাঁদের তিরস্কার করলেন, ভুল ধরিয়ে দিলেন। তবে সরাসরি তিনি পাপের প্রসঙ্গ তোলেননি; বরং শৈল্পিক ঢঙে, সংকেতের আশ্রয় নিয়ে প্রিয় শাগরেদদ্বয়কে তিরস্কার করেছেন। এখানেই নবিজির অনন্যতা।

দুই

আমরা যখন কারও মধ্যে কোনো ভুল দেখতে পাই, তার সবটাকেই ভর্ৎসনা করি। ভর্ৎসনার মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য করি না। একটা মন্দ করা মানে তার সবটাই মিছমার হয়ে যাওয়া। কিন্তু এটা নববি আদর্শ ছিল না। তিনি খারাপটুকুর খারাপ বলতেন, ভালোটুকুর ভালো। একটা খারাপের জন্য অন্যান্য ভালোর অবদানকে তিনি অস্বীকার করতেন না।

নবিজির উপস্থিতি গায়িকাদের ভেতরও দারুণ চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল।

রুবাই বিনতে মুয়াব্বিজের জন্য বাসর সাজানো হলে নবিজি খুব উৎসাহ নিয়ে মেয়েটির বাসরঘর দেখতে গেলেন। কিশোরীরা তখন দফ বাজাচ্ছিল। বদর যুদ্ধে শহিদ হওয়া যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা গাচ্ছিল। নবিজি খুব উপভোগ করছিলেন কিশোরীদের গান। তিনি রুবাইয়ের বিছানায় বসে ছিলেন, যে বিছানায় একটু পরেই বাসর হবে মেয়েটির। নবিজির উপস্থিতি গায়িকাদের ভেতরও দারুণ চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। এই উদ্দীপনার কারণেই গাইতে গাইতে এক কিশোরী বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবি আছেন, যিনি জানেন আগামীকাল কী হবে। ভবিষ্যতের অধিকার যে একমাত্র আল্লাহর-এটা সম্ভবত জানত না মেয়েটি। কিংবা আপ্লুত হয়ে অন্যায্য কথাটি সে মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। তাই বলে মেয়েটিকে ধমক মারলেন না নবিজি। থামিয়েও দিলেন না তার বদরের বীরত্বের গান। তিনি শুধু বললেন, তুমি এই কথাটি ছেড়ে আগে যা বলছিলে তা-ই বলো।

তিন

আবু জোবায়ের (রা.) নবিজির কাছে এলেন। নবিজি কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন, আবু জোবায়ের অজুর সঠিক নিয়ম জানে না। তাইতো সামনে পেয়েই তাঁকে অজু করতে বললেন। সাহাবি অজু শুরু করলেন মুখ থেকে। নবিজি বললেন, হে আবু জোবায়ের! তুমি মুখ থেকে অজু শুরু করবে না। কারণ, মুখ থেকে অজু শুরু করে কাফিররা। এরপর তিনি এক সাহাবিকে পানি আনতে বললেন। এরপর নিজেই অজু করে দেখালেন।

লক্ষণীয়, কাফিররা সম্ভবত হাত না ধুয়েই পাত্রে হাত ডুবিয়ে মুখ ধৌত করত, যা পরিচ্ছন্নতার পরিপন্থি। নবিজি তাই ভুল সংশোধনের শুরুতেই বললেন, মুখ থেকে অজু করে কাফিররা। অতএব, তুমি মুখ থেকে অজু করবে না। কাজটার প্রতি ঘৃণা তৈরি করার জন্য এবং ভবিষ্যতে যেন কোনোভাবেই এই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, তাই তিনি কাফিরদের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

লেখক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *